ড. শরীফ এনামুল কবির
একটি দেশের সার্বিক উন্নয়নে শিক্ষার মানোন্নয়ন অতীব জরুরি। শিক্ষার মান সংরক্ষণ ও মানোন্নয়নে বর্তমান সরকার শিক্ষাব্যবস্থায় বেশ কিছু সংস্কার এনেছে। দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত মেয়েদের শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা, সারা দেশে অসংখ্য নতুন প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা এবং পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন শিক্ষার ব্যাপক প্রসারে কার্যকরী ভূমিকা রাখছে। উচ্চশিক্ষার প্রসারে প্রতিটি বিভাগে কয়েকটি নতুন বিশ্ববিদ্যালয়, নতুন মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোলে শিক্ষার লক্ষ্য পূরণে বাংলাদেশের সাফল্য এরই মধ্যে বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত। তবে এটি অস্বীকার করার উপায় নেই, বিশ্বের অন্যান্য উন্নত দেশের তুলনায় আমাদের দেশে শিক্ষাক্ষেত্রে বরাদ্দ তুলনামূলক কম। শিক্ষাব্যবস্থাতেও রয়েছে পুরোনো পদ্ধতি। শিক্ষকদের সময়ের সঙ্গে সর্বশেষ তথ্যপ্রযুক্তির জ্ঞানের অভাব, পুরোনো ধ্যানধারণা, পাঠ্যক্রম, যোগ্য শিক্ষকের অভাব, বিভিন্ন জায়গায় প্রভাবশালীদের চাপে শিক্ষক নিয়োগে জটিলতা, এমনকি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কমিটি গঠন নিয়ে আইনের জটিলতা প্রভৃতি বিষয় সুষ্ঠু শিক্ষা পদ্ধতির অন্তরায়। এরপর রয়েছে এ খাতে অতীতের দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, অনিয়ম, বিশৃঙ্খলা। সবগুলো কাটিয়ে একটি দক্ষ, গতিশীল, সময়োপযোগী ও দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ভিশন-২১ পরিকল্পনার আওতায় উচ্চতর প্রবৃদ্ধি অর্জন, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন ও প্রাক্কলিত রাজস্ব আহরণে জোর দেওয়া হয়েছে। আর এসব ক্ষেত্রে সাফল্য আনতে মানবসম্পদ উন্নয়নে সবচেয়ে জোর দেওয়া হচ্ছে। পরিপ্রেক্ষিত পরিকল্পনার লক্ষ্যানুযায়ী জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হলে বিনিয়োগ ও বিনিয়োগের উত্পাদনশীলতা ও দক্ষতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। প্রতিযোগিতামূলক বিশ্ববাণিজ্যে টিকে থাকতে ও উত্পাদন-সক্ষমতা বাড়াতে তথ্যপ্রযুক্তি খাতের উন্নয়নের পাশাপাশি প্রয়োজন দক্ষ মানবসম্পদ। বর্তমান সরকার মানবসম্পদের উন্নয়নের মহাপরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে। সম্প্রতি মানবসম্পদের উন্নয়নের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা বিশ্বব্যাংকের নতুন মানবসম্পদ সূচকে বাংলাদেশ ভারতের ওপরে অবস্থান করছে। মানবসম্পদের সঠিক ব্যবহার ও বিকাশের পাশাপাশি স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে সরকারের বিনিয়োগের ওপর ভিত্তি করে এই সূচকে বিভিন্ন দেশের অবস্থান নির্ণয় করা হয়ে থাকে। সীমিত সম্পদ ও বিপুল জনসংখ্যার চাপকে উপেক্ষা করে উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখতে দক্ষ জনবল তৈরির লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে শেখ হাসিনার সরকার। দেশি-বিদেশি অভিজ্ঞ প্রশিক্ষকদের দ্বারা দেশের ৬৪ জেলার বিভিন্ন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ-তরুণীদের বিশ্বমানের আইটি প্রশিক্ষণ দিচ্ছে সরকার। এছাড়াও দেশব্যাপী অব্যাহত রয়েছে নানা প্রশিক্ষণ কার্যক্রম। ‘লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং ডেভেলপমেন্ট’ প্রকল্পের মাধ্যমে ৫৫ হাজার নতুন ফ্রিল্যান্সার তৈরির কার্যক্রম চলমান রয়েছে। বর্তমানে বিশ্বে আউটসোর্সিং তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান তৃতীয়। এই সেক্টরে দেশে প্রায় সাড়ে ৫ লাখ ফ্রিল্যান্সার রয়েছেন। আউটসোর্সিং এখন দারুণ সম্ভাবনাময় ক্যারিয়ার হিসেবে তরুণ প্রজন্মের কাছে সুপরিচিতি পেয়েছে। সরকারের তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের লার্নিং অ্যান্ড আর্নিংসহ নানা উদ্যোগে বিভিন্ন ধরনের দক্ষতা উন্নয়নের প্রশিক্ষণের ফলে এই খাতে সফল তরুণদের সংখ্যাও দিন দিন বাড়ছে। বর্তমানে বিশ্বে আউটসোর্সিং এর প্রায় ৪ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের বাজার রয়েছে। অথচ এই খাত থেকে বাংলাদেশ আয় করছে মাত্র ৮০ কোটি ডলার। আমাদের তরুণরা এই খাতে নিজেদের দক্ষ হিসেবে গড়ে তুলতে পারলে আত্মকর্মসংস্থানের পাশাপশি বিপুল পরিমাণে বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব।
মানসম্মত গবেষণা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে ওঠে। একটি জাতির উত্কর্ষ, সৃজনশীলতা ও অনুসন্ধিত্সা বৃদ্ধি পায় যুগোপযোগী গবেষণার মাধ্যমে। এর মাধ্যমে মানুষের সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ ঘটে। গবেষণার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত ল্যাবরেটরি হলো বিশ্ববিদ্যালয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের, সরকারি হোক কিংবা বেসরকারি, গবেষণা একটি বড়ো কাজ। শুধু পাঠদানই বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্দেশ্য নয়—জ্ঞানচর্চা, নতুন নতুন জ্ঞানের উদ্ভাবন ও তার প্রসার ঘটানোও বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরিহার্য উদ্দেশ্য। আর এজন্যেই প্রয়োজন উপযুক্ত গবেষণার। চীন সরকার সম্প্রতি গবেষণা খাতে ব্যাপক বিনিয়োগ করছে। একেবারে ঢালাওভাবেই বিনিয়োগ করছে। এর ফলে খুব অল্প দিনের মধ্যেই বিশ্বসেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় চীনের সরব উপস্থিতি নিশ্চিত করতে পেরেছে তারা। এমনকি জাপানকেও পেছনে ফেলেছে তারা। আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণার সুষ্ঠু অবকাঠামো নেই বললেই চলে। প্রথম সারির শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেও উন্নত মানের গবেষণাগার ও মানসম্মত গবেষণাপত্রের খুবই অভাব। যোগ্য মানবসম্পদ সৃষ্টি, শিক্ষা ও গবেষণা কার্যক্রমের গতিবৃদ্ধি ও মান-উন্নয়ন এবং সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির জন্য প্রত্যেকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি করে সেন্টার অব এক্সিলেন্স প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন। চিন্তা-চেতনায়, কর্মে ও মননে একটি সমৃদ্ধ জাতিগঠনের লক্ষ্যে শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ অপরিহার্য। আত্মনির্ভরশীল প্রজন্মের মাধ্যমে উন্নত ও জ্ঞানভিত্তিক সমাজ ও জাতিগঠনে এ বিনিয়োগ কেবল দরকারিই নয়, আবশ্যিকও। নোবেলজয়ী ভারতীয় পণ্ডিত কৈলাস সতীর্থের কথায় এরই প্রতিধ্বনি উচ্চারিত হয়েছে। তাঁর মতে, শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ করলে এর প্রতিদান মেলে নয় গুণ।
আধুনিক উন্নত বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিজেকে দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট ও চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় অধিকহারে তরুণদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে নতুন খাত সৃষ্টি এবং সম্ভাবনাময় খাতসমূহের ক্রমবিকাশের কোনো বিকল্প নেই। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা, আইএলওর তথ্যমতে, বর্তমানে বাংলাদেশে বেকারের সংখ্যা প্রায় ৩ কোটি। বেকারত্বের এই ধারা অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশে দুএক বছরের মধ্যে মোট বেকারের সংখ্যা ৬ কোটিতে দাঁড়াবে। তাই দেশে কর্মমুখী শিক্ষা প্রসারের মাধ্যমে বিপুল সংখ্যক বেকার জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান সৃষ্টির উদ্যোগ সরকারকেই নিতে হবে।
বাংলাদেশের জন্য একটি সুখবর হলো, বর্তমানে আমরা ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বা জনসংখ্যাতাত্ত্বিক বোনাসকালের সুবিধা ভোগ করছি। বিশ্বের উন্নত দেশগুলো যখন কর্মক্ষম জনসংখ্যার অভাবে ভুগছে, তখন বাংলাদেশের জন্য সম্ভাবনার দরজা খুলে গেছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এ সুযোগ গ্রহণ করে ইতিমধ্যে সমৃদ্ধ হয়েছে। থাইল্যান্ড, ভারত, মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশ বিভিন্ন সময় ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড প্রবেশ করছে। অনেকেই এর সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করেছে। ভারত তথ্যপ্রযুক্তিতে বিপুল জনশক্তির কর্মসংস্থান নিশ্চিত করেছে। বিশ্ব শ্রমবাজারে কোন্ কোন্ বিষয়ে শ্রমিকদের চাহিদা আছে সেটি যাচাই করে মানবসম্পদ তৈরি করেছে আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত। এক্ষেত্রে চীন ও ভারতের পলিসি থেকে আমরা শিক্ষা নিতে পারি। ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড অবস্থার সুযোগ কাজে লাগানোর জন্য প্রশিক্ষিত ও দক্ষ কর্মশক্তির বিকল্প নেই। বিপুল জনসংখ্যাকে জনসম্পদে পরিণত করার জন্য সবার আগে যা দরকার তা হলো সবার জন্য কর্মমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করা। কারণ আমাদের দেশের বিদ্যমান শিক্ষা ব্যবস্থা বেকারত্ব ঘোচাতে পারছে না। শিক্ষা খাতে কেবল বরাদ্দ বাড়ালেই হবে না, কর্মমুখী শিক্ষার প্রতি জোর দিতে হবে। বিশেষ করে আইটি ও কারিগরি শিক্ষার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। বিশ্ববাজারের চাহিদার ভিত্তিতে বাংলাদেশে বিপুল কর্মক্ষম মানুষকে বিভিন্ন প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ করে গড়ে তুলতে হবে। বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। তাদের কোন ধরনের শ্রমশক্তি প্রয়োজন তা জানতে হবে। তাদের চাহিদা বুঝে শ্রমিকদের প্রস্তুত করতে হবে। শুধু প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করলে হবে না। বিশ্ব শ্রমবাজারে টিকে থাকার জন্য দক্ষ লোক তৈরি করতে হবে। বিশ্ব অর্থনীতিতে পরাশক্তির দেশ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে বিশ্ব অর্থনীতিতে পরাশক্তির দেশ জাপান ‘জব মার্কেট অরিয়েন্টেড’ শিক্ষার ওপর জোর দেয়। এমনকি বর্তমান উদীয়মান শক্তি ভারতও এখন কারিগরি শিক্ষার দিকে যাচ্ছে। এমতাবস্থায় আমরা বন্ধুপ্রতীম দেশ জাপান ও ভারতের গৃহীত পলিসি বা ব্যবস্থাগুলো অনুসরণ করতে পারি।
বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আমাদের প্রায় ১ কোটির মতো প্রবাসী রয়েছে। সম্প্রতি দেখা গেছে তাদের আয় ১৫ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। বিপরীতে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত মাত্র ১ কোটি ৩০ লাখের মতো জনগোষ্ঠী পাঠিয়ে ৬৮ বিলিয়ন ডলার আয় করছে। একমাত্র অদক্ষতার কারণেই আমরা তাদের সঙ্গে কুলিয়ে উঠতে পারছি না। সরকার উদ্যোগ নিয়ে এদেরকে দক্ষ করতে পারলে আমাদের প্রবাসী আয় আরো তিনগুণ বৃদ্ধি পাবে। সেই সঙ্গে বিদেশের শ্রমবাজারে আমাদের শ্রমিকদের চাহিদাও বাড়বে।
বর্তমানে তৈরি পোশাক খাতে ৪০ লাখেরও বেশি নারী পোশাক কর্মী কাজ করছে। তাদের আয় ১৭ বিলিয়ন ডলারের মতো। আমাদের তৈরি পোশাক খাতে ম্যানেজারিয়াল ও টেকনিক্যাল বিভাগে ২ লাখ বিদেশি নাগরিক কাজ করছেন। তাদের আয় ৭ বিলিয়ন ডলার। ফলে আমরা যে পরিমাণ রেমিটেন্স আনি, তা আবার দিয়ে দিতে হয়। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য এমতাবস্থায় সরকারকে পরিকল্পিতভাবে দক্ষ জনশক্তি তৈরির কোনো বিকল্প নেই।
n লেখক : সদস্য, বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশন
সাবেক উপাচার্য, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়