সামাজিক অস্থিরতা যে কারণে বৃদ্ধি পায়

গত কয়েক মাস ধরিয়া ব্যক্তিগত, পারিবারিক, ব্যাবসায়িক, সামাজিক প্রভৃতি কারণে দেশে খুনখারাবি বৃদ্ধি পাইয়াছে। পত্রিকান্তরে প্রকাশিত এক দিনের বিভিন্ন রিপোর্টের উপর দৃষ্টিপাত করিলে বিষয়টি কিছুটা উপলব্ধি করা যায়। যেমন—পারিবারিক শত্রুতার জের ধরিয়া রাজধানীর দক্ষিণখানের ফায়দাবাদ এলাকায় মাত্র এক বত্সরের শিশুকে ছুরিকাঘাত করিয়া হত্যা করা হইয়াছে! শিশুটির পেটে ছুরি দিয়া আঘাত করিয়া দুর্বৃত্তরা দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করিয়াছে। ইহার পর শিশুটি নিজ বিছানায় ছটফট করিতেছিল। হাসপাতালে নেওয়ার পথে তাহার মৃত্যু হইয়াছে। ইহা ছাড়া টঙ্গীতে শ্বাসরোধ করিয়া স্ত্রীকে হত্যা, লক্ষ্মীপুরে জমিসংক্রান্ত বিরোধের জেরে এক বৃদ্ধকে পিটাইয়া হত্যা, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় গরু চুরির অভিযোগে এক যুবককে পিটাইয়া হত্যা ইত্যাদি অসংখ্য সংবাদ পড়িয়া শিহরিত হইয়া উঠিতে হয়। ইহা কীসের লক্ষণ?

এক পরিসংখ্যানে জানা গিয়াছে, চলতি বত্সরের জানুয়ারি হইতে জুন পর্যন্ত এই ছয় মাসে কেবল রাজধানীতে ৮৪টি লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হইয়াছে। গত দেড় বত্সরে রাজধানীতে চার শতাধিক ব্যক্তি ছিনতাইকারীর হামলার শিকার হইয়াছেন। ইহাতে অন্তত ৩০ জন ছিনতাইকারীদের ধারালো অস্ত্রের আঘাতে খুন হইয়াছেন। ব্যক্তিগত বিরোধ, পারিবারিক কলহ, আর্থিক লেনদেন, মাদক, সামাজিক আধিপত্য বিস্তার লইয়া বিরোধ, জমিজমা দখল ইত্যাদি কারণে এই সকল খুনখারাবি বাড়িতেছে। সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, পারিবারিক বন্ধন ছিন্ন হওয়া, অর্থনৈতিক বৈষম্য, অতিরিক্ত ভোগবাদিতা, মাদকের প্রসার, কর্মহীনতা, নৈতিকতার অভাব ইত্যাদি কারণে আমাদের দেশে বাড়িতেছে সামাজিক অস্থিরতা। মানুষের প্রতি মানুষের শ্রদ্ধাবোধ কমিয়া যাওয়ার কারণেও তুচ্ছ ঘটনায় ঘটিতেছে নৃশংস হত্যাকাণ্ড। এই রূপ অনেক আলোচিত ও চাঞ্চল্যকর হত্যা-নির্যাতনের ঘটনা বিচারহীন থাকিবার কারণে কিংবা অপরাধীরা নানাভাবে প্রভাব খাটাইয়া লঘুদণ্ডে পার পাইয়া যাইবার কারণে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটিয়া চলিয়াছে। আবার যখন রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা দেয়, তখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মনোযোগ সেইদিকে অধিক করিয়া নিবদ্ধ হয়। এই সুযোগে সমাজে ঘাপটি মারিয়া থাকা অপরাধীরা মাথাচাড়া দিয়া উঠে। পূর্বের দ্বন্দ্ব বা শত্রুতার জেরে সমাজে বাড়িয়া যায় খুনখারাবি। ছিঁচকে চোর, ছিনতাইকারী, সংঘবদ্ধ ডাকাত দল—তাহারাও এই সুযোগে নানাভাবে তত্পর হইয়া উঠে। ভবিষ্যতে জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করিয়া রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়িলে এই প্রকারের সামাজিক অপরাধমূলক কর্মাকাণ্ড বাড়িবে বলিয়া আশঙ্কা করা হইতেছে।

বর্তমানে শুধু বৈশ্বিক উষ্ণতাই বাড়িতেছে না, মানব মনের অস্থিরতাও বাড়িতেছে। মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি বা বাজারের অস্থিরতাও আমাদের মন-মেজাজকে বিগড়াইয়া দিতেছে। ইহাও উসকাইয়া দিতেছে সামাজিক অস্থিরতার পারদ। সমাজে জন্ম নিতেছে নানান অসহিষ্ণুতার বিষবৃক্ষ। ইহাই যখন সিনড্রোম আকারে প্রকাশিত হয়, তখন এই রোগ সমাজকে কুরিয়া কুরিয়া ধ্বংস করিয়া ফেলিতে পারে। ইহার কারণেই ভাইয়ের হাতে ভাই, সন্তানের হাতে বাবা-মা, বাবা-মায়ের হাতে সন্তান হত্যার শিকার হইতেছে। করোনাকালের মতোই এখন আবার অস্বাভাবিক মৃত্যু বাড়িতেছে। অসহিষ্ণুতার কারণে বাড়িতেছে গণপিটুনির প্রবণতাও।

এই পরিস্থিতিতে আমাদের করণীয় কী? প্রথমত রাজনীতিবিদেরা রাজনৈতিক অস্থিরতা নিরসনের চেষ্টা করিবেন বলিয়া আমরা আশা করি। রাজনৈতিক অঙ্গনে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহনশীলতা বাড়াইতে হইবে। দ্বিতীয়ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সামাজিক অপরাধ বন্ধেও সজাগ থাকিতে হইবে। আলোচিত ও বড় ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড সংঘটিত হইবার পর দ্রুত অপরাধীকে গ্রেফতার করিয়া আইনের হস্তে সোপর্দ করিতে হইবে। আইনি প্রক্রিয়া শুরুর পর মাঝপথে থামিয়া গেলে বা তদন্তকার্যেই গলদ ধরা পড়িলে সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা বৃদ্ধি পায়। আইনের শাসন ও সুশাসনের উপাদানগুলির প্রয়োগ যথাযথ না হইলে আমাদের এইরূপ উদ্বেগ দূর হইবে না। সর্বোপরি সামাজিক অস্থিরতা বন্ধে নাগরিকদের মধ্যে আইন মান্য করিবার মন-মানসিকতাও গড়িয়া তুলিতে হইবে।