‘আমি আগে এমন ইলেকট্রিক যন্ত্রগুলো শুধু চোখে দেখতাম , কোনোদিন ভাবিনি এই যন্ত্রগুলো নিজের হাতে চালাব। আজ ১০ দিনের প্রশিক্ষণে আমি ওয়াশিং মেশিন, ওভেন, ব্লেন্ডার,আইরনসহ রান্নাঘরের যন্ত্রপাতি ব্যবহার করতে পারি—এ কারণে আমার কাজের জায়গায় আমার যেমন বেতন বেড়েছে, তেমন আগের চেয়ে আমার সম্মানও বেড়েছে।’ কথাগুলো বলছিলেন মিরপুর এলাকায় গৃহশ্রমিক মাহফুজা আক্তার।
মাহফুজা রাজধানীর ‘ইউসেপ’ থেকে গৃহশ্রমিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছেন। সম্প্রতি ‘ইউসেপ’ প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ঘুরে দেখা যায় অনেক গৃহকর্মী ‘সুনীতি’ প্রকল্পের অধীনে দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। তাদের সঙ্গে কথা বললেই বোঝা যাবে তাদের আত্মবিশ্বাস বেড়েছে অনেক। তারা নিজেরাই এখন গৃহকর্ত্রীর সঙ্গে পারিশ্রমিক নিয়ে দরকষাকষি করেন, আবার অনেক সময় নিশ্চিতে গুরুত্বপূর্ণ কাজ করাতে পারেন বলে নিজে থেকেই পারিশ্রমিক বাড়িয়ে দেন গৃহকর্ত্রী। আর দক্ষ আর প্রশিক্ষিত হওয়ায় তাদের জীবনমানের উন্নয়ন হয়, স্বপ্ন দেখেন সন্তানদের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের।
কী প্রশিক্ষণ নেন তারা
মোহাম্মদপুর এলাকার নিপা জানান, এখানে এসে সে ‘মপ’ দিয়ে ঘর মুছতে শিখেছেন, ওভেনে রান্না, কাপড় আয়রন করা, কফি মেকারে কফি বানানো সবই তার এখন জানা। এখন সে মিক্সড ভেজিটেবল, লুচি, সবজি, ডাল ভুনা, চিকেন কারি, গরুর কালো ভুনা আর ঝরঝরে পোলাউ রান্না করতে পারেন।
কীভাবে এখানে প্রশিক্ষণ নিতে এলেন প্রশ্ন করলে পদ্মফুল দলের নেতা রওশন আরা জানান, তিনি ভাসানটেকের ধামলপুর আদর্শ রোডে বাস করেন। এখানেই এই প্রকল্প থেকে ইভা আপা আসেন। তিনি তাদের বোঝান তারা যে বাসাবাড়িতে কাজ করেন, যা বেতন পান প্রশিক্ষণ নিলে আরও বেশি বেতন পাবেন, কিন্তু তাদের কোনো টাকা-পয়সা দিতে হবে না। এমন কথা শুনে অনেকেই তাদের সঙ্গে যোগ দেন। প্রথমে একটা উঠান বৈঠক হয়, সেখানে ২০ জনের দল গঠন করা হয়। দলের একজন নেতাও করা হয়। তারা স্থানীয় ভাবে প্রথম চার দিনের প্রশিক্ষণ পান। সেখানে তারা কথা বলা, প্রাথমিক চিকিৎসা, কোনো নির্যাতনের শিকার হলে ৯৯৯-এর ফোন করার মতো মৌলিক শিক্ষা পান। পরে আসেন ইউসেপ প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে।
প্রতিষ্ঠানের স্কিলড ডেভেলপমেন্ট সিনিয়র স্পেশালিস্ট মো. আয়ুব আলী সরকার জানান, তাদের স্থানীয় সহযোগী সংগঠনগুলো স্থানীয় পর্যায়ে গৃহশ্রমিকদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন স্থানীয়ভাবে চার দিন প্রশিক্ষণ দিয়ে কেন্দ্রীয় প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে পাঠান, এখানে ১০ দিনের প্রশিক্ষণ দেন। প্রতিদিন সকাল ৯ টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত তাদের দক্ষতা বৃদ্ধির প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।
বদলে যাচ্ছে জীবন
নেতা রওশন আরা বলেন, তার স্বামী আগে তাকে শারীরিক নির্যাতন করতেন। তাকে এক দিন উঠান বৈঠকে নেওয়া হলে, তিনি তার ভুল বুঝতে পারেন। তিনি এখন আর তাকে মারধর করেন না। এমন ঘটনা এখানে অনেকের ক্ষেত্রেই ঘটেছে। এছাড়া তারা বাল্যবিবাহের ক্ষতির দিক ও ৯৯৯-এ ফোন করে বাল্যবিবাহ বন্ধ করা সম্পর্কে জানতে পারেন। এরপর তারা বেশ কয়েকটি বাল্যবিবাহও বন্ধ করে দেন। বাল্যবিবাহ বন্ধ হওয়া মেয়েগুলো এখন আবার স্কুলে যাচ্ছে বলে জানান রওশন আরা। তার ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার কথাও জানান তিনি।
প্রকল্প নিয়ে কিছু কথা
দুস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রের (ডিএসকে) যুগ্ম-প্রকল্প পরিচালক- ফজিলা খানম জানান, গৃহকর্মীদের জীবন-দক্ষতা ও কারিগরি-দক্ষতা বৃদ্ধিতে পরিচালিত ‘সুনীতি’ প্রকল্প ২০১৯ সালে শুরু হয়, প্রকল্প চলবে ২০২৫ সাল পর্যন্ত। ১৬ হাজার গৃহশ্রমিক নিয়ে কাজ করছে চারটি সংগঠন। যা বাস্তবায়ন হচ্ছে ‘ইউসেপ’ প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে।
ইউসেপ বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ড. মো. আবদুল করিম বলেন, আমাদের জীবনকে সুন্দর করতে গৃহশ্রমিক অক্লান্ত পরিশ্রম করেন। অনেক সময় তারা অত্যাচারের শিকার হন। উন্নত দেশে নিজের কাজ নিজে করতে হয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, এক দিনে গৃহশ্রমিকের চাহিদা শেষ হবে না। তারা আমাদের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তাই তাদের প্রতি আমাদের দায়িত্ব কর্তব্য পালন করতে হবে। তারা প্রশিক্ষিত হলে অবস্থার কিছুটা পরিবর্তন হবে।