নারীদের হরমোনজনিত রোগ ‘পলিসিস্টিক ওভারিয়ান সিনড্রোম’, সংক্ষেপে যাকে ‘পিসিওএস’ বলে। সন্তান জন্মদানের বয়সে অনেক নারীর এ রোগ হয়ে থাকে। যে সব রোগের কারণে নারীরা সন্তান ধারণের ক্ষেত্রে জটিলতা বা দীর্ঘসূত্রতায় ভুগে থাকেন, তার একটি হলো পলিস্টিক ওভারিয়ান সিন্ড্রোম (পিসিওএস)। ১৫ থেকে ৪৪ বছর বয়সী প্রতি ১০ জন নারীর একজন এই রোগে ভুগছেন। এই বয়সের ৮ থেকে ১৩ শতাংশ নারী পিসিওএস রোগে আক্রান্ত হয়ে থাকেন।
তবে এই রোগের চিকিৎসায় এখনো রোগীরা উদাসীন বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা। তারা বলছেন, এই রোগে আক্রান্ত রোগীদের ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স, লাইফস্টাইলসহ জেনেটিক্স প্রধান ভূমিকা রাখে। এই রোগে অনিয়মিত মাসিক, মাসিকের সময় অতিরিক্ত রক্তপাত, চুল পড়ে যাওয়া, ব্রণ, শরীরের বিভিন্ন স্থানে ও ত্বকে অতিরিক্ত লোম গজানোর মতো সমস্যা দেখা দেয়। এছাড়া ঘাড়ে পুরু কালো দাগ হওয়া, ওজন বৃদ্ধি পাওয়া, প্রজননজনিত সমস্যা ইত্যাদি এই রোগের লক্ষণ বা উপসর্গ। পিসিওএস রোগীদের বন্ধ্যাত্ব, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, ব্রেইন স্ট্রোক, রক্তে উচ্চমাত্রার কোলেস্টেরল, ডায়াবেটিস, জরায়ুর ক্যানসার, স্থূলতাসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্য সমস্যাজনিত ঝুঁকি থাকে যা রোগীর ওপর শারীরিক ও মানসিক প্রভাব ফেলে বলে জানান চিকিৎসকরা।
এই রোগের বিষয়ে মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য বাংলাদেশে বিভিন্ন সংস্থা কাজ করে যাচ্ছে। শিফা ওয়েলনেস-পিসিওএস অ্যান্ড ফার্টিলিটি সাপোর্ট তেমন একটি সংস্থা। ২০২২ সাল থেকে ডা. তাসফিনা হক নিজের প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন পিসিওএস নিয়ে। তিনি নিজেই একজন পিসিওএস রোগী। হেলদি ফার্টিলিটি, হরমোনবান্ধব লাইফস্টাইল প্রচারের মাধ্যমে তিনি পিসিওএস ও বন্ধ্যাত্ব সমস্যা মোকাবিলা এবং সচেতনতা বাড়াতে কাজ করছেন।
শিফার প্রতিষ্ঠাতা ডা. তাসফিনা হক বলেন বাংলাদেশে এখন পিসিওএস রোগে অনেক নারী আক্রান্ত। পিসিওএস এর মূল চিকিৎসা হচ্ছে হেলদি লাইফস্টাইল মেনে চলা। এই রোগ সংক্রান্ত জ্ঞানের অভাবে দীর্ঘমেয়াদে নানা সমস্যায় ভুগছেন নারীরা। আবার অনেকে মনে করেন পিসিওএস মানেই বন্ধ্যাত্ব। যে কারণে পিসিওএস আক্রান্ত নারীদের ঘরে বাইরে প্রচুর সমালোচনার শিকার হতে হয়। অথচ চিকিৎসা ও হেলদি লাইফস্টাইলের মাধ্যমে পিসিওএস এ আক্রান্ত অধিকাংশ নারী মা হতে পারেন।
পিসিওএস রোগে আক্রান্ত নওরিন প্রিয়া তার নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলেন, শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার জন্য পিসিওএস নিয়ে জানতে হবে, নিয়মিত ব্যায়াম করতে হবে, স্বাস্থ্যকর খাবার পর্যাপ্ত পরিমাণে খেতে হবে, ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে এবং বিভিন্ন সৃজনশীল কাজের মাধ্যমে মন ভালো রাখতে হবে। তিনি বলেন, এই রোগের বিষয়ে নারীদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে, পরিবার ও সমাজকে পিসিওএস রোগীদের মানসিক সমর্থন দিতে হবে।
হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট মেডিক্যাল কলেজ হসপিটালের অবস্টেট্রিক্স অ্যান্ড গাইনিকোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. রুমানা নাজনীন বলেন, নারীদের বন্ধ্যাত্ব সমস্যার মধ্যে ৩০ শতাংশ রোগীর পিসিওএস রোগ থাকে। এই রোগীদের ডিম্বাশয়ে যে ডিম থাকে, সেগুলো পরিপক্ক হয় না। এই রোগীদের মাসিক অনিয়মিত হতে পারে বা অনেকের মাসিক হয় না। ডিম্বাশয়ে একাধিক সিস্ট থাকে, যা কেবল আলট্রাসনোগ্রাফি করলে বুঝা যায়। ওষুধ খেয়ে যাদের মাসিক নিয়মিত হয় না তাদের বিভিন্ন পরীক্ষা করতে হয়। অনেকে গর্ভধারণ করতে পারলেও বিভিন্ন জটিলতার সম্মুখীন হন। যেমন গর্ভপাত হয়ে যাওয়া, ডেলিভারির নির্ধারিত সময়ের পূর্বে বাচ্চা প্রসব হওয়া ইত্যাদি। এ ধরনের রোগীদের হেলদি লাইফস্টাইল মেনে চলা দরকার, প্রজনন স্বাস্থ্য ভালো রাখার জন্য। তাদের পুষ্টিকর খাবার খেতে হবে, অতিরিক্ত ফ্যাট ও শর্করাযুক্ত খাবার খাওয়া যাবে না, দুশ্চিন্তা পরিহার করতে হবে, হরমোনের ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য পর্যাপ্ত ঘুম এবং বিশ্রামের প্রয়োজন।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. মারুফা মোস্তারী বলেন, পিসিওএস রোগে শরীরের বিভিন্ন হরমোনের তারতম্য হয়। ইনসুলিন হরমোন রেজিস্ট্যান্স পিসিওএস রোগের অন্যতম প্রধান কারণ এবং এটি অন্যান্য হরমোনের সমস্যা করে। থাইরয়েড হরমোনের মাত্রা অনেকের কমে যায়। আবার অনেকের শরীরে টেস্টোস্টেরন হরমোনের মাত্রা বৃদ্ধি পায় যা ডিম্বাণু পরিপক্ব হতে বাধা দেয়। এই হরমোনের প্রভাবে মুখে অতিরিক্ত লোম হয়, চুল পড়ে যায়। এই রোগে ডায়বেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, মেটাবলিক সিনড্রোম, হৃদরোগসহ বিভিন্ন জটিলতা দেখা দেয়। হেলদি লাইফস্টাইল শরীরে হরমোনের ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে। রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখলে প্রজনন স্বাস্থ্য, শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য ভালো থাকবে।