দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলবাসীর আরেকটি স্বপ্নপূরণ

পদ্মার বুকে যুক্ত হইল সাফল্যের আরেকটি পালক। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলবাসীর পূরণ হইল আরেকটি স্বপ্ন। গত বত্সরের ২৫ জুন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বহু কাঙ্ক্ষিত এবং দেশের আত্মমর্যাদা ও গৌরবের প্রতীক পদ্মা সেতু উদ্বোধন করেন। ইহার এক বত্সর সাড়ে তিন মাসের মাথায় এইবার তিনি উদ্বোধন করিলেন পদ্মা সেতু রেল-সংযোগ প্রকল্প। যদিও এই প্রকল্পটি আংশিকভাবে তথা ঢাকা-ভাঙ্গা অংশ উদ্বোধন করা হইল, তথাপি ইহার জাতীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক গুরুত্ব সমধিক। এই প্রকল্পটি দেশের দক্ষিণ-পশ্চািমাঞ্চলের ৯টি জেলা, যেমন—ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, শরীয়তপুর, মাদারীপুর, ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ, নড়াইল ও যশোরকে সংযুক্ত করিতেছে। প্রথম ধাপের কাজ শেষ হওয়ায় এই রেল-সংযোগের মাধ্যমে মুন্সীগঞ্জ, শরীয়তপুর ও মাদারীপুর রেলওয়ে নেটওয়ার্কের আওতায় আসিল। এতদিন এখানকার মানুষ সাশ্রয়ী, নিরাপদ ও আরামদায়ক রেল পরিষেবা হইতে বঞ্চিত ছিল।

উল্লেখ্য, ১৮৬২ সালে চুয়াডাঙ্গার দর্শনা হইতে কুষ্টিয়ার জগতি পর্যন্ত রেলপথ স্থাপনের মাধ্যমে রেলযুগে প্রবেশ করে বাংলাদেশ; কিন্তু এতদিনেও দেশের দক্ষিণাঞ্চলের অবহেলিত অনেক জনপদে রেলপথের অস্তিত্ব না থাকাটা খুবই দুঃখজনক। বর্তমান সরকার ২০৩৫ সালের মধ্যেই ৬৪ জেলায় রেলপথ সম্প্রসারণের মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করিয়াছে। দেশের ৪৩টি জেলায় রেলপথ ছিল। এখন মুন্সীগঞ্জ, শরীয়তপুর, মাদারীপুর ও নড়াইল যুক্ত হওয়ায় জেলার সংখ্যা দাঁড়াইল ৪৭টি। এখনো বরিশাল বিভাগের পুরাটাই রেল যোগাযোগের আওতার বাহিরে রহিয়াছে। তবে আশার খবর হইল, পদ্মা সেতু রেল-সংযোগ প্রকল্পটি ভাঙ্গা পর্যন্ত আংশিকভাবে উদ্বোধন করা হইলেও ইহা যশোর পর্যন্ত সংযোগ স্থাপন করিবে। তাহার পর যশোর হইতে মোংলা বন্দর পর্যন্ত সংযুক্ত হইবে। শুধু এইখানেই শেষ নহে, এমনকি বরিশাল ও পটুয়াখালী হইতে পায়রা বন্দর পর্যন্ত এই রেললাইনকে সংযুক্ত করিবার পরিকল্পনা রহিয়াছে সরকারের। এতদঞ্চলের মাটি নরম থাকায় কিছু প্রতিবন্ধকতা রহিয়া গিয়াছে। এখন এই ব্যাপারে সম্ভাব্যতা যাচাই সমীক্ষা চলিতেছে। পদ্মা সেতু রেল-সংযোগের কারণে একসময় দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১টি জেলার ৩ কোটি মানুষ সহজে ও সাশ্রয়ী খরচে রাজধানী ঢাকার সহিত যোগাযোগ রক্ষা করিতে পারিবে বলিয়া আশা করা যায়। এই প্রকল্পটি দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে নিঃসন্দেহে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনিবে। এখানে পর্যটনসহ ক্ষুদ্র, মাঝারি ও বৃহত্ বিভিন্ন শিল্পের বিকাশ ত্বরান্বিত হইবে।

মূলত ট্রান্স-এশিয়ান রেলওয়ের সহিত বাংলাদেশকে সংযুক্ত করাটাও এই প্রকল্পের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। ইহার মাধ্যমে এশিয়ার ২৮টি দেশের সহিত রেল যোগাযোগব্যবস্থা চালু হইবে। এই সেতু দিয়াই একদিন সিঙ্গাপুর হইতে মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, মিয়ানমার, বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, ইরান, তুরস্ক হইয়া ইউরোপে যাইবে ট্রেন। ইহাতে ভারত, নেপাল ও ভুটানে সরাসরি পণ্য ও যাত্রী পরিবহনের দুয়ার খুলিবে। আমরা জানি, এই প্রকল্পটি বাংলাদেশ ও চীন সরকারের যৌথ অর্থায়নে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়িত হইতেছে। ১৭২ কিলোমিটার প্রকল্পের ৮২ কিলোমিটার রেলপথের উদ্বোধনের পর অবশিষ্ট কাজ আগামী বত্সরের জুন নাগাদ শেষ হইবে বলিয়া আশা করা যায়। এই রেল-সংযোগের কারণে ঢাকা-যশোর ১৮৫, ঢাকা-খুলনা ২১২ ও ঢাকা-দর্শনা ৪৪ কিলোমিটার দূরত্ব কমিবে। ঢাকা-কলকাতা দূরত্বও কমিবে। এখন হার্ডিঞ্জ সেতু ব্যবহার না করিয়া পদ্মা সেতু ব্যবহার করিবে অনেক ট্রেন। ইহাতে খুলনায় মাত্র সাড়ে তিন ঘণ্টায় এবং যশোরে তিন ঘণ্টায় যাওয়া যাইবে। দেশের প্রধান স্থলবন্দর বেনাপোল হইতে অতি সহজে পণ্য আনা-নেওয়া করা যাইবে। সর্বোপরি পদ্মা রেলসেতু এমনভাবে তৈরি করা হইয়াছে যাহাতে যে কোনো পরিমাণ ভারী মালামাল বহন করা যায়। তাই অদূর ভবিষ্যতে দ্বিতল মালবাহী ট্রেনও চলাচল করিতে পারিবে বলিয়া জানা যায়।

অতএব, জাতীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক রেল নেটওয়ার্কে সংযোগ স্থাপনকারী পদ্মা সেতু রেল-সংযোগ প্রকল্পের উদ্বোধনে আমরা গর্বিত ও আনন্দিত। এই জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট সকলকে জানাই আন্তরিক ধন্যবাদ ও অভিনন্দন।