ধৈর্যের সহিত অপেক্ষা করিতে হইবে

উন্নয়নশীল বিশ্বের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে সর্বদাই বলা হইয়া থাকে, এই সমস্ত দেশে স্থিতিশীল রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামো গড়িয়া উঠে না। রাজনৈতিক অস্থিরতার সহিত আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থার সন্নিবেশ ঘটিয়া উহা দেশসমূহের অর্থনৈতিক উন্নয়নের গতি ব্যাহত করে। তবে শিক্ষার প্রসারের ফলে এই সমস্যা ক্রমশ হ্রাস পায়। উল্লিখিত লাইনগুলির মধ্যে চারটি শব্দ বিশেষভাবে দৃষ্টিপাতযোগ্য—রাজনীতি, আমলাতন্ত্র, অস্থিরতা এবং শিক্ষা। অর্থাত্, উন্নয়নশীল বিশ্ব চক্কর কাটিতে থাকে এই চারটি বৃত্তের গণ্ডিতে আটকা পড়িয়া! উন্নয়নশীল ব্যবস্থায় বিশেষত রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং ক্ষেত্রবিশেষে রাজনীতি ও আমলাতন্ত্রের মোলাকাত—ইহাই দেশগুলিকে ক্রমাগত টানিয়া লইয়া যায় পিছনের দিকে। অনিবার্য পরিণতি হিসাবে দেশ নিশ্চল হইয়া পড়ে একটি সময়ে আসিয়া। অস্থিতিশীলতার বাড়বাড়ন্তে অর্থনীতি ক্রমশ ধসিয়া পড়িয়া অবতারণা ঘটে সংকট বা সংকটাবস্থার। অর্থাত্, ‘ডেভেলপিং’ শব্দের পাঠে প্রযোজ্য উক্তিটি হইল, ‘রোম ওয়াজ নট বিল্ট ইন আ ডে’ তথা ‘রোম শহর রাতারাতি গড়িয়া উঠে নাই।’ আমরা যখন ফলফলাদির সুমিষ্ট স্বাদ আস্বাদন করি, তখন কি কখনো ভাবিয়া দেখি ইহার পিছনের গল্প? বীজ বপন, অঙ্কুরোদ্গম, চারা গজানো, গাছের সঠিক বৃদ্ধি ও পরিচর্যা, যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ—ইহার পর একটি পর্যায়ে আসিয়া পাওয়া যায় ফল। সুতরাং, উন্নয়নশীল বিশ্বকে যদি একটি বৃক্ষ হিসাবে বিবেচনা করা হয় এবং সুমিষ্ট ফলের অভিলাষ থাকে, তাহা হইলে ইহার প্রতিটি পর্যায়ে সতর্ক দৃষ্টি তথা যথার্থ পরিচর্যা থাকিতে হইবে। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান যেন সঠিক ও স্বাভাবিক পরিবেশ ধরিয়া রাখিতে পারে, তাহার প্রতি মনোযোগ দিতে হইবে।

উন্নয়নশীল বিশ্বের বাস্তবতা হইল, এইখানকার পটভূমি উপলব্ধি না করিয়াই রাতারাতি অনেক কিছু পাইবার আশা করা হয়। সকল কিছু প্রত্যাশা করা হয় ‘পিওর অ্যান্ড পারফেক্ট’ হিসাবে। আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কথাই যদি ধরা হয়, দৃশ্যপট কী বলিতেছে? বিভিন্ন পক্ষের পালটাপালটি বক্তব্য, বিবৃতিই শুধু শুনিতে পাওয়া যায়; কিন্তু সমস্যার গভীরে কি দৃষ্টি দেওয়া হইতেছে? বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীকে যেইভাবে ধরপাকড় করা হইতেছে, এক শ্রেণি তাহাদের ‘হিটার বাহিনী’ ‘পেটোয়া বাহিনী’ ব্যবহার করিয়া নির্যাতন চালাইতেছে। অবশ্য ইহার পিছনে কারণ রহিয়াছে বইকি। ক্ষমতাসীন দলে অনুপ্রবেশকারী একশ্রেণির পাতিনেতা-উঠতি নেতা তথা হাইব্রিড লিডারের অপতত্পরতায় এই ধরনের কর্মকাণ্ড পরিচালিত হইতেছে। ইহাদের সহিত যোগ দিয়াছে কতিপয় অসাধু আমলা। অর্থাত্, পুলিশ-প্রশাসনসহ বিভিন্ন স্পর্শকাতর সরকারি প্রতিষ্ঠানকে ‘ম্যানেজ’ করিয়া নির্বাচনের মাঠকে অস্থির, অস্থিতিশীল করিয়া তুলিতেছে অবৈধ উপায়ে টাকা কামাইয়া আঙুল ফুলিয়া কলাগাছ হওয়া একশ্রেণির নামধারী নেতা। উন্নয়নশীল বিশ্বের বড় দুঃখ হইল, নির্বাচনের প্রাক্কালে সরকার, রাজনৈতিক দল এবং জনসাধারণকে সলাপরামর্শ দিতে দেখা যায় এমন সকল লোকজনকে, যাহাদের না আছে পর্যাপ্ত রাজনৈতিক জ্ঞান, না অভিজ্ঞতা। যাহাদের অন্তত ওয়ার্ড বা ইউনিয়ন পর্যায়েও নির্বাচন করার অভিজ্ঞতা নাই, তাহারাই উন্নয়নশীল বিশ্বে নির্বাচনের সবকদাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। অবশ্য এইখানে জনগণের বড় দায় রহিয়াছে। উন্নয়নশীল দেশের জনগণ প্রকৃত শিক্ষাসচেতন নহে। অশিক্ষিত, অর্ধশিক্ষিত ব্যক্তি রাজনৈতিক সচেতনতার অভাবে নিজের ভোটের কদর বুঝিতে না পারিয়া উহা অপাত্রে বিকাইয়া দেন নামকাওয়াস্তে অর্থমূল্যে। রাজনীতি, অর্থনীতিই যাহারা বুঝিতে পারেন না সঠিকভাবে, নির্বাচন তথা নেতা নির্বাচনের ন্যায় কঠিন বিষয় তাহারা বুঝিবেন কী করিয়া? এইখানে যতটা না দায় সরকারের, তাহার চেয়ে অধিক জনগণের।

প্রশ্ন হইল, উন্নয়নশীল বিশ্বের এই দুঃসহ পরিস্থিতি কাটিবে কী করিয়া? নির্বাচনকালীন সহিংসতা, হানাহানি এবং গোলকধাঁধার অবসানই-বা ঘটিবে কীভাবে? সম্ভবত ইহার জন্য দীর্ঘ অপেক্ষার প্রয়োজন। আমরা যদি অর্ধশতাব্দী পূর্বের কথা স্মরণ করি, তাহা হইলে আজিকার দিনের সহিত তখনকার পরিস্থিতির বিস্তর পার্থক্য লক্ষ করিব। একইভাবে, বর্তমানে যেই অবস্থা চলিতেছে, তাহাও রহিবে না একটি সময়ে আসিয়া। পারফেকশন রাতারাতি অর্জন হয় না। সুতরাং, ধৈর্য ধরিয়া অপেক্ষার প্রহর গুনিতে হইবে। মহান সৃষ্টিকর্তা সুরা যুমার ১০ নম্বর আয়াতে বলিয়াছেন একই কথা—‘ধৈর্যশীলদেরকে অপরিমিত পুরস্কার দেওয়া হ