শুভশক্তির সম্মিলনে কল্যাণ হউক জগতের

সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব অসুরবিনাশী দেবী দুর্গার বোধন হইয়াছিল গত শুক্রবার ষষ্ঠীপূজার মধ্য দিয়া। আজ মঙ্গলবার মহাদশমী, যাহাকে বলা হয় বিজয়া দশমী। এই দিনে দেবী দুর্গা অসুর বিনাশ করিয়া জগতের দুর্গতি দূর করেন। পুরাণমতে, অসুর শক্তির নিকট পরাভূত দেবতারা স্বর্গলোকচ্যুত হইয়াছিলেন। এই অশুভ শক্তিকে বিনাশ করিতে একত্রিত হন সকল দেবতা। অসুর শক্তির বিনাশে দেবতাদের সামগ্রিক শক্তির মহাসম্মিলনে এক নারীশক্তির আবির্ভাব ঘটানো হয়। দেবতাদের তেজরশ্মি হইতেই আবির্ভূত হন অসুরবিনাশী দেবী দুর্গা।

বাংলাদেশ পূজা উদ্যাপন পরিষদের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, এই বত্সর সমগ্র দেশে ৩২ হাজার ৪০৮টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হইবে। গত বত্সরের তুলনায় ২৪০টি বেশি। এই পরিসংখ্যান নিঃসন্দেহে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের উত্সাহ-উদ্দীপনার অভিজ্ঞান। শরতের এই উত্সবের নেপথ্যে রহিয়াছে দশরথপুত্র শ্রীরামচন্দ্রের অবদান। বলা যায়, যুদ্ধে জয়লাভ করিবার অভিলাষ হইতেই দেবীর এই অকালবোধন বা আবির্ভাব। কথিত আছে, বনবাসী রামচন্দ্র স্বর্ণালংকার রাক্ষসরাজ রাবণের নিকট হইতে প্রিয়তমা স্ত্রী সীতাকে উদ্ধার করিবার বাসনায় শরত্কালে দেবীকে অকালবোধন করেন এবং এইভাবে প্রচলন ঘটে শারদীয় দুর্গাপূজার। দেবী দুর্গাকে বলা হয় মাতৃশক্তির প্রতীক। দেখা যায়, দেবী দুর্গার সংহারমূর্তি আর মাতৃমূর্তির মধ্যে কোনো ভিন্নতা নাই। অসুর দমনের সময়ও তিনি সন্তানসন্ততি, এমনকি পতিকেও সঙ্গে রাখিয়াছেন। আবার ধরাধামে মানবমঙ্গলের জন্য আসিয়াও তিনি শত্রু অসুরকে সঙ্গে আনিতে ভোলেন নাই। রামের সেই যুদ্ধ যেমন অশুভ শক্তির প্রতিভূ অসুরের বিরুদ্ধে, ঠিক তেমনি দুর্গত দেবতাদের সপক্ষেও। ব্যক্তি মানুষের মধ্যে, সমাজের মধ্যে অসুররূপী যে পশুত্ব রহিয়াছে, তাহা হইতে মনুষত্বে উত্তরণের যে চিন্তা সমাজজীবনে প্রবহমান, সেই চিন্তারও প্রতিফলন ঘটিতে দেখা যায় দুর্গাপূজার মধ্যে। দুর্গাপূজার একটি কৌতূহলের বিষয় হইল, দেবীর আগমন ও গমন। হিন্দু শাস্ত্রানুসারে দেবী দুর্গার বাহন সিংহ। তবে দেবী দুর্গা স্বর্গ থেকে মর্ত্যে আসেন বিশেষ কোনো একটি বাহনে এবং ফিরিয়া যান আর একটি বাহনে। এই প্রতিটি বাহনে যাত্রার ফল বা পরিণাম জ্যোতিষ গণনায় নির্ধারিত রহিয়াছে। বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত পঞ্জিকামতে, দেবী দুর্গা এবার ঘোটকে চড়িয়া মর্ত্যলোকে (পৃথিবী) আসিবেন। বিদায়ও লইবেন ঘোটক তথা ঘোড়ায় চড়িয়া। ঘোটকে আগমন ও গমন ফলফল—‘ছত্রভঙ্গস্তুরঙ্গমে’। ঘোটক বা ঘোড়া যেমন ছটফটে, তেমনি ঘোটকে আগমন ও গমনে সামাজিক বিশৃঙ্খলা, অরাজকতা, গৃহযুদ্ধ, রাজনৈতিক উত্থান-পতন ও সাংসারিক ক্ষেত্রেও অস্থিরতা, দুর্ঘটনা, অপমৃত্যু নির্দেশ করে। একমাত্র গজ ছাড়া দেবী দুর্গার অন্য তিন বাহনের ফলই ধ্বংসাত্মক।

দেবী দুর্গা মর্ত্যে আসিয়া অশুভ শক্তি বিনাশের মাধ্যমে শুভশক্তিকে প্রতিস্থাপন করেন বলিয়া মনে করেন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা। জীবের দুর্গতি নাশ করেন বলিয়াও তাহাকে দুর্গা বলা হয়। দিকে দিকে সুর-অসুরের যে যুদ্ধ চলিতেছে, সনাতন ধর্মাবলম্বীরা তাহারই প্রতীকী বিজয়ের প্রকাশ দেখিতে পান এই দুর্গোত্সবে। এইখানে একটি বিষয় বিশেষ লক্ষণীয় যে, দেবতারা যখন অসুরদের দ্বারা স্বর্গ হইতে বিতাড়িত হইয়াছেন, তখন তাহারা সবাই একত্রিত হইয়া সম্মিলিত শক্তির মাধ্যমে নির্মাণ করেন অসুরবিনাশী দেবীশক্তি। সনাতন ধর্মের এই পৌরাণিক কাহিনি আমাদের এই বার্তা দেয় যে, পার্থিব জগতের অশুভ শক্তিকে বিনাশ করিতে হইলেও সকল শুভশক্তিকে একত্রিত হইতে হয়। বিশ্বে এখন যুদ্ধাবস্থা চলিতেছে। দিকে দিকে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়িতেছে। এই অবস্থা হইতে উত্তরণের জন্য আমাদের মধ্যকার সব শুভশক্তিকে একত্রিত হইতে হইবে। একতার মধ্যেই অজেয় শক্তি লুক্কায়িত। সকল শুভশক্তির সম্মিলনে কল্যাণ হউক এই জগতের। বিজয়া দশমীতে সকল সনাতন ধর্মাবলম্বীকে জানাই শারদীয় দুর্গোত্সবের শুভেচ্ছা।