প্রথমবারের মতো জাতীয় নির্বাচনে ভোট দেবেন বিলুপ্ত ছিটমহলবাসী

বাংলাদেশের মূল ভূখণ্ডে যুক্ত হওয়ার পর প্রথমবারের মতো একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে যাচ্ছে বিলুপ্ত ছিটহলের অধিবাসীরা। এর আগে তারা স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ভোটধিকার প্রয়োগ করেছিল। এবার প্রথম তারা জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। এ উপলক্ষে এ এলাকার নাগরিকদের মাঝে দেখা দিয়েছে ব্যাপক উৎসাহ উদ্দীপনা।

যে প্রার্থী ছিটমহলের জীবন-মান উন্নয়নের অগ্রণী ভূমিকা রাখবেন তাকেই তারা ভোট দিতে চায়। তারা নাগরিকত্ব পাওয়ার পর থেকে বর্তমান সরকার ব্যাপক উন্নয়ন করেছে। তাদের জীবনমান উন্নয়নে স্কুল, কলেজ,মাদ্রাসা, যোগাযোগ, কালভার্ট, ব্রিজ, বিদ্যুৎ, কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, মৎস্য, সমবায় ও একটি বাড়ি একটি খামার, আত্মনির্ভরশীল করতে যুব প্রশিক্ষণ প্রদান করেছে। 

কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার বিলুপ্ত ছিটমহল দাশিয়ারছড়ায় গিয়ে দেখা গেছে, সেখানে চায়ের দোকানে ও বাজারের অড্ডায় আসন্ন সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে চলছে নাগরিকদের মাঝে নানা জল্পনা-কল্পনা। চায়ের কাপের চুমুকের ফাঁকে ভোটারদে দৃষ্টি সংবাদ মাধ্যমের খবরে। কারো চোখ পত্রিকায়, আবার কারো বা চোখ টেলিভিশনে প্রচারিত নির্বাচনী খবরে। আবার কেউ বা আলাপ-আলোচনায় ব্যস্ত সময় পার করছেন।

উপজেলা নির্বাচন অফিসার হাওলাদার মোহাম্মদ কামরুল হাসান জানান, দাসিয়ারছড়াসহ উপজেলার মোট ভোটার সংখ্যা ১ লাখ ২৬ হাজার ৪১১ জন। পুরুষ ভোটার ৬২ হাজার ৩০১ জন ও মহিলা ভোটার ৬৪ হাজার ১১০ জন। এদের মধ্যে বিলুপ্ত দাসিয়ারছড়ায় মোট ভোটার সংখ্যা ৩ হাজার ১৭২ জন। পুরুষ ভোটার ১ হাজার ৫৯০ জন ও মহিলা ভোটার ১ হাজার ৮২ জন। উপজেলায় মোট ভোট কেন্দ্র ৫০ টি।

বিলুপ্ত দাসিয়ারছড়াবাসীরা পাঁচটি ভোট কেন্দ্রে ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। এসব ভোট কেন্দ্রগুলো হলো ফুলবাড়ী ইউনিয়নের পশ্চিম কুটি-চন্দ্রখানা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, পূর্ব চন্দ্রখান উচ্চ বিদ্যালয়, চন্দ্রখানা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, ভাঙ্গামোড় ইউনিয়নের আটিয়াবাড়ী ১ নং সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় ও কাশিপুর উইনিয়নের ছড়ারপাড় সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়।

দাসিয়ারছড়ার সমন্বয়পাড়া গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল মান্নান শেখ ও সাবেক চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম জানান, 'জীবনে এই প্রথম বাংলাদেশী নাগরিক হয়ে আসন্ন জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচনে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবো। তাই খুশি লাগছে। আমরা দীর্ঘ ৬৮ বছর থেকে পাশের লোকজনদের ভোট দিতে যাওয়া দেখেছি। কিন্তু আমরা ভোট দিতে পারিনি। এবার আমাদের আশা পূরণ হবে। পরিবারের অন্য ভোটারদের সঙ্গে নিয়ে ভোট কেন্দ্র যাবো। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমাদের আলো দেখিয়েছেন এবং এই দাসিয়ারছড়ায় ব্যাপক উন্নয়ন করেছেন। এখন আমাদের ছেলে-মেয়েরা স্বাধীনভাবে স্কুল-কলেজে পড়ছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চিরকাল বিলুপ্ত দাসিয়ারছড়া বাসিন্দাদের মা জননী হয়ে থাকবেন। এই মা জননী যেন আবারো দেশের প্রধানমন্ত্রী হয় সেই কামনা করছি।' 

দাসিয়ারছড়ার কামালপুর গ্রামের তরুন ভোটার রাধা কান্ত রায়, আমিনুল ইসলাম, শরীফউদ্দিন, আব্দুল হাই ও মনিরুজ্জামান জানান, 'আমরা দীর্ঘদিন অন্ধকারে আলোর পথে ফিরে এসেছি। এটা শুধু সম্ভব হয়েছে বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমান ও তার কন্যা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী  শেখ হাসিনার কারনে। তাই আগামী ৩০ ডিসেম্বর জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মনোনিত প্রার্থীকে ভোট দিয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত করবো এবং আবারো প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকার প্রধান হয়ে সারা দেশের মতো বিলুপ্ত ছিটমহলের উন্নয়নের ধারা অব্যাহত থাকুক এই কামনা করছি।'

ছিটমহল আন্দোলনের নেতা মইনুল হক ও গোলাম মোস্তফা খাঁন জানান, 'আমরা অত্যান্ত আনন্দিত এবং গর্ববোধ করছি। আমাদের গত ৬৮ বছর কোন নাগরিত্ব ছিল না। জননেত্রী শেখ হাসিনা ছিটমহল বিনিময় বিলটি বাংলাদেশের সংসদে পাশ করে এবং একইভাবে ভারতের সংসদেও বিলটি পাশ হওয়ায় আমরা আজ স্বাধীন বাংলাদেশের নাগরিক। এটি আমাদের গর্ব ও অহংকার। তাই জননেত্রী শেখ হাসিনাকে কৃত্যজ্ঞতা জানাই। যে সংসদের মাধ্যমে আমরা র্দীঘ ৬৮ বছর পর মুক্তি পেয়েছি। সেই সংসদ নির্বাচনে ভোট দিতে পারছি বলেই আজ অনেক আনন্দ লাগছে। তবে নৌকায় মার্কায় ভোট দিতে পারলে আরও বেশি আনন্দ লাগতো। যেহেতু কুড়িগ্রাম-২ আসনে নৌকার প্রার্থী না থাকায় আমরা মাননীয় প্রধনমন্ত্রী শেখ হাসিনার মহাজোটের মনোনিত প্রার্থীকে আনন্দের সংঙ্গে ভোট প্রদান করবো।'

উল্লেখ্য, গত ২০১৫ সালের ১লা আগস্টে বাংলাদেশের মানচিত্রে ভারতীয় ১১১ ছিটমহল নতুনভাবে যোগ হয়। ফলে ২০১৫ সালের ৬ থেকে ১৬ জুলাই দুই দেশের যৌথ গণনায় মোট জনসংখ্যা ৩৭ হাজার ৫৩৫ জনের মধ্যে বিলুপ্ত ছিটমহল দাসিয়ারছড়ায় ৬ হাজার ৮ শত ৮৯ জন লোকের বসবাস রয়েছে।

ইত্তেফাক/নূহু