উন্নয়নশীল দেশের প্রধান একটি সমস্যা হইল, এই সকল দেশের প্রশাসনে যাহারা দায়িত্ব পালন করেন, তাহারা রুলস-রেগুলেশনের মধ্যে না থাকিয়া অনেক সময় সরকারি দলের সেবাদাসে পরিণত হন। যখন যে সরকার ক্ষমতায় আসে, তখন তাহারা তাহাদের লোক হইয়া পড়েন। প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা-কর্মচারী আর থাকেন না। আমলাতন্ত্রের যে মহান লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যকে সম্মুখে রাখিয়া তাহার গোড়াপত্তন হইয়াছে, ইহা তাহার পরিপন্থি। কেননা প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পদ-পদবি স্থায়ী, তাহারা সরকারের ধারাবাহিকতার রক্ষক এবং সরকারি সম্পদ বা বরাদ্দের অতন্দ্র প্রহরী; কিন্তু তাহারা যদি সরকারদলীয় নেতাকর্মীর মতো আচরণ করেন, তাহাদের অন্যায় ও অবৈধ হুকুম মতো চলেন, কিংবা সরকারি দল ও প্রশাসন মিলিয়া-মিশিয়া একাকার হইয়া যায়, তাহা হইলে সেই সকল দেশে শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা করা কঠিন। এই করুণ পরিস্থিতি হইতে উন্নয়নশীল দেশগুলি বাহির হইয়া আসিবে কবে? ইহা হইতে বাহির হইয়া আসিতে না পারিলে আজকে যাহারা সরকারি দলের হইয়া অন্যায়ভাবে গ্রেফতার বা লাঠিপিটা করিতেছেন, ক্ষমতার কখনো পটপরিবর্তনে দেখা যাইবে তাহারাই আবার তাহাদের মারধর করিতেছেন যাহাদের হুকুমমতো একদা তাহারা উঠাবসা করিতেন।
লক্ষ করিলে দেখা যায়, এই সকল দেশে অনেক সময় সরকারবিরোধী সমাবেশে যত লোকের সমাগম হয়, তাহার তুলনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংখ্যাই থাকে অধিক। এই সকল দেশে গত সাত-আট দশকেও সরকার ও বিরোধী দলের রাজনৈতিক কৌশলের তেমন হেরফের হয় নাই। সরকারের দমনপীড়নমূলক একই কৌশল ও একই ভাষা। আবার বিরোধী দলগুলির জ্বালাও-পোড়াও, হরতাল, অবরোধসহ একই ধরনের ধ্বংসাত্মক কর্মসূচি। ইহা হইতে বাহির হইয়া আসা দুরূহ কাজ হইলেও অসাধ্য নহে। জনগণের শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষায় কাহাকে না কাহাকে এই ক্ষেত্রে ফুলস্টপ দিতে হইবে। শুধু রাজধানী বা মেট্রোপলিটন শহরগুলিতেই নহে, মফস্সল শহর ও প্রত্যন্ত গ্রামগঞ্জেও একই দৃশ্য বিদ্যমান। সেইখানে ক্ষমতাসীন দলের নেতা-পাতিনেতাদের কথামতোই চলে প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিচার বিভাগের এক শ্রেণির লোকও। এই সকল সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়োগ, বদলি ইত্যাদি ক্ষেত্রে তাহাদের প্রভাব বিস্তার করিতে দেখা যায়। এই সকল দেশে নির্বাচন হইতে শুরু করিয়া বিভিন্ন জনগুরুত্বপূর্ণ কাজে আস্থাহীনতার জন্য এই পরিস্থিতিই দায়ী। এই সকল দেশে সুষ্ঠু, অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন এবং শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতার হস্তান্তর হয় না বলিলেই চলে। জাতীয় নির্বাচন যখন সন্নিকটবর্তী হয়, তখন এমন সংঘাতময় পরিস্থিতি তৈরি হয় যে, নির্বাচন আদৌ হইবে কি না, বা হইলেও তাহাতে তাহারা নিজেদের পছন্দমতো প্রার্থীকে নির্বিঘ্নে ও নিরাপদে ভোট দিতে পারিবে কি না—তাহা লইয়া দেখা দেয় সন্দেহ-সংশয়। নির্বাচন আসিলেই তাহারা ভীত ও সন্ত্রস্ত হইয়া পড়ে। এমনকি প্রধান নির্বাচন কমিশনার পর্যন্ত মন্তব্য করিতে বাধ্য হন—নির্বাচনের পরিবেশ নাই। এই পরিবেশ কীভাবে নিশ্চিত হইবে? বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধিবে কে? যেই সকল দেশ যুদ্ধবিগ্রহের মাধ্যমে অস্বাভাবিক পন্থায় স্বাধীন হইয়াছে, সেই সকল দেশে সংকট আরো অধিক। সেই সকল দেশে অনেক সময় আনফিনিশড রেভ্যুলেশন বা অসমাপ্ত বিপ্লবের মতো পরিস্থিতি বিরাজ করে বিধায় সংঘাত, সংঘর্ষ ও হানাহানি-মারামারি ইত্যাদি নিয়তি হইয়া দাঁড়ায়।
তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিতে সেই পঞ্চাশ-ষাট দশক হইতে অদ্যাবধি প্রশাসনিক সংস্কার তেমন একটা হয় নাই। বিশেষ করিয়া, জনগণের পক্ষে উল্লেখযোগ্য ও গুণগত পরিবর্তন আসে নাই। নাগরিক স্বাধীনতার অনুকূলে ঔপনিবেশিক কালাকানুনের তেমন রদবদল হয় নাই। সেই জন্যই এই সকল দেশ বসবাসের অযোগ্য হইয়া পড়িয়াছে। মানচিত্রের দিকে তাকাইলে বুঝা যায়—কোথায় যুদ্ধ নাই, নাই জবরদস্তি। যাহারা মনে করেন, এই ধারা চলিতেই থাকিবে আমরা তাহাদের দীর্ঘজীবন কামনা করি, যাহাতে তাহারা শেষ পর্যন্ত পরিবর্তন দেখিয়া যাইতে পারেন। এই পরিবর্তন আসিতে বাধ্য। তবে সেই পরিবর্তন ভালো না মন্দ হইবে তাহা আমরা জানি না। হয়তো নৈরাজ্য হইবে। কেননা সংবাদপত্রের পাতায় চোখ বুলাইলেই দেখা যায় খুনাখুনি ও হানাহানি। এই সকল আসলে কীসের আলামত?