‘ইহা যেন নরকের আগুন’

গ্রীষ্মের ইউরোপে তাপপ্রবাহ নূতন কিছু নহে। প্রতিবত্সরই সাহারা মরুভূমি হইতে ধেয়ে আসা প্রবল গরম হাওয়ায় উত্তপ্ত হয় ইউরোপ। কিন্তু এই বত্সর গ্রীষ্মের একেবারে শুরুতেই ইউরোপের অবস্থা ত্রাহি মধুসূদন। এমনিতেই ইউরোপ শীতপ্রধান মহাদেশ। কিন্তু গ্রীষ্মের দাবদাহ যেন তাহাদের জনজীবনকে হাঁপাইয়া তুলিয়াছে। আর শীতপ্রধান হইবার কারণেই এই সময়ের অতি উষ্ণ আবহাওয়া মানাইয়া লইতে কষ্ট হইতেছে ইউরোপবাসীর। স্পেন হইতে ফ্রান্সের মধ্যে এমন কোনো জায়গা নাই, যেখানকার তাপমাত্রা ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে।

পরিস্থিতি দেখিয়া স্পেনের এক আবহাওয়াবিদ বলিয়াছেন—‘ইহা যেন নরকের আগুন!’ আবহাওয়ার তথ্য-উপাত্ত অনুযায়ী সাম্প্রতিক অতীতে জুনের গরম এতখানি তীব্র হয় নাই কখনো। শেষবার ইউরোপে এমন পরিস্থিতি দেখা দিয়াছিল ২০০৩ সালে। সেই সময় ইউরোপ জুড়িয়া প্রাণ গিয়াছিল ৩০ হাজারেরও বেশি মানুষের। শুধুমাত্র ফ্রান্সেই মৃত্যু হইয়াছিল ১৫ হাজার মানুষের। এইদিকে গত পরশু দক্ষিণ ফ্রান্সের গ্রাম গাইয়ারগ্যে ল্যে মত্যেঁও-এর তাপমাত্রা ৪৫.৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছুঁইয়াছে—যাহা ফ্রান্সের সর্বকালের রেকর্ড! বিশেষজ্ঞদের মতে, গ্রীষ্মের একেবারে শুরুতেই এতখানি প্রবল গরম পড়িলে মানুষের স্বাস্থ্যের উপর তাহার বিরূপ প্রতিক্রিয়া পড়িতে বাধ্য। অর্থাত্ এই গরম আরো বেশি বিপজ্জনক। জার্মানি স্পেন ছাড়াও অতিমাত্রায় শীতপ্রধান স্ক্যান্ডিনেভিয়ানের দেশগুলিও গরমের আঁচ হইতে ছাড় পাইতেছে না। ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমান্যুয়েল ম্যাক্রোঁ এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী করিয়াছেন বিশ্বের উষ্ণায়নকেই। জলবায়ুর পরিবর্তনের কারণেই সাহারা আরো বেশি উষ্ণ হইতেছে এবং সাহারার লু হাওয়া ছড়ি ঘুরাইতেছে ইউরোপ জুড়িয়া। যেই কারণে প্যারিসে হাজারেরও বেশি ঝরনা লাগানো হইয়াছে। জার্মানির বহু জায়গায় প্রবল গরমে রাস্তার পিচ গলিতে শুরু করিয়াছে।

প্রবাদ আছে যে, নগর পুড়িলে দেবালয়ও সেই অগ্নি হইতে রক্ষা পায় না। উষ্ণায়নের কারণে সমুদ্র উপকূলবর্তী বিশ্বের অধিকাংশ ভূখণ্ডই প্রবল ঝুঁকির মধ্যে রহিয়াছে। উষ্ণায়নের জন্য দায়ী গ্রিনহাউজ গ্যাসের অন্যতম প্রস্তুতকারী শিল্পসমৃদ্ধ দেশসমূহের বড়ো একটি অংশ ইউরোপেই রহিয়াছে। ইহা ঠিক যে, পৃথিবীতে জলবায়ুর পরিবর্তন অবশ্য কোনো নূতন বিষয় নহে। বিজ্ঞানীদের মতে, এখন অবধি পৃথিবী মোট ১৩ বার প্রায় ধ্বংসের সম্মুখীন হইয়াছে। প্রাণের মহাবিলোপ ঘটিয়াছে কমপক্ষে পাঁচবার। প্রতিটি মহাবিলোপের পর পুনরায় ধীরে ধীরে জীববৈচিত্র্যে ভরিয়া উঠিয়াছে এই পৃথিবী। আর এই সকল ধ্বংসের ঘটনা ঘটিয়াছে প্রাকৃতিক কারণেই। তবে শিল্পবিপ্লবের পর হইতে জলবায়ু পরিবর্তনের নেপথ্যে সরাসরি অবদান রাখিতেছে মানুষ। ইহা ঠিক যে, পৃথিবীর জলবায়ুর পরিবর্তন কত ব্যাপক মাত্রায় হইতেছে—তাহা এখনো সুনির্দিষ্টভাবে স্পষ্ট নহে। তবে পরিবর্তন যে ঘটিতেছে, তাহাতে কাহারো দ্বিমত নাই। মাত্র কয়েক দিন পূর্বে কুয়েতে সর্বকালের রেকর্ড ভাঙিয়া ৬৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা ছুঁইয়া গিয়াছে। মনে রাখিতে হইবে, এই পৃথিবীতে দুর্যোগ কাহারো একার জন্য আসিবে না। একটিই ছাদ এই ধরিত্রীর। সুতরাং এই বিপদ হইতে রক্ষা পাইতে যাহা করণীয়, তাহা করিতে হইবে সম্মিলিতভাবে। এমনটাই বলিয়াছেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁও। নচেত্ নরকের আগুন ফি বত্সর আরো বেশি বেশি করিয়া উত্তাপ ছড়াইবে বিশ্ব জুড়িয়া।