খুনি নয়ন, রিফাত অধরা আলোচনায় গ্রুপ ‘০০৭’

বরগুনা শহরে প্রকাশ্য রাস্তায় রিফাত শরীফকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় এখন অধরা খুনিরা। এর মধ্যেই আলোচনায় এসেছে খুনিদের ফেসবুক মেসেঞ্জারে ‘বন্ড ০০৭’ নামে একটি গ্রুপের কথোপকথন। ঐ ফেসবুক গ্রুপেই রিফাতকে হত্যার পরিকল্পনা সাজানো হয়। এ গ্রুপের নামকরণ হয়েছে জেমস বন্ডের কোড নম্বর ‘জিরো জিরো সেভেন’ এর সঙ্গে মিল রেখে। আর এ গ্রুপের নেতা হলেন রিফাত হত্যার হোতা নয়ন বন্ড, যাকে পুলিশ তিন দিনেও গ্রেফতার করতে পারেনি। এমনকি অন্যতম খুনি রিফাত ও রিশানকেও ধরতে পারেনি। গতকাল শনিবার পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ‘অভিযান চলছে, যে কোনো সময় রেজাল্ট।’ এর মধ্যে পটুয়াখালী থেকে আরো একজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। সে এজাহারভুক্ত আসামি।

পরিবারের দেওয়া নাম সাব্বির আহম্মেদ, ডাকনাম নয়ন। নিজেকে জেমস বন্ড ভাবতে ভালোবাসেন বলে ২৫ বছর বয়সি ঐ যুবক নিজের নাম নিয়েছেন নয়ন বন্ড। ঐ নামেই তিনি বরগুনা শহরে পরিচিত। তার মোটরসাইকেলে, বাড়ির দেয়ালে, নানা জায়গায় লেখা রয়েছে বন্ডের সেই ০০৭ কোড নামটি।

বরগুনা সদর থানার ওসি আবির মোহাম্মদ হোসেন জানান, পৌর শহরের বিকেবি রোডের ধানসিঁড়ি এলাকার আবু বক্কর সিদ্দিকীর ছেলে নয়নের বিরুদ্ধে মাদক কেনাবেচা, চুরি, ছিনতাই, হামলা, সন্ত্রাস সৃষ্টিসহ নানা অভিযোগে অন্তত আটটি মামলা রয়েছে। এর আগেও সে পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়েছে। পরে ছাড়া পায়।

নয়নের গড়ে তোলা গ্যাং ০০৭ শহরের কলেজ রোড, ডিকেপি, দীঘির পাড়, কেজিস্কুল ও ধানসিঁড়ি এলাকায় নানা ধরনের অপরাধ চালিয়ে আসছিল বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। তারা বলছেন, ঐ গ্রুপে নয়নের প্রধান সহযোগী হলেন জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান দেলোয়ার হোসেনের ভায়রা দুলাল ফরাজীর ছেলে রিফাত ফরাজী। রিফাত ফরাজীর পাশাপাশি তার ভাই রিশান ফরাজীও এই গ্রুপে যুক্ত বলে পুলিশ জানিয়েছে।

ঐ মেসেঞ্জার গ্রুপের কথোপকথনের স্ক্রিনশটে দেখা যায়, রিফাত নামে একজন লিখেছেন- ‘০০৭ এর সবাইরে কলেজে দেখতে চাই’। সাগর নামের একটি আইডি থেকে ঐ পোস্ট কপি করে ‘ভিক্টরি’ ইমোটিকন দেখানো হয়। রিফাত ফরাজীকে ট্যাগ করে মোহাম্মদ নামের একটি আইডি থেকে জানতে চাওয়া হয়, কখন কলেজে থাকতে হবে। রিফাত উত্তর দেন, ৯টার দিকে। পরে রিফাত একটি রামদায়ের ছবি পোস্ট করে সেটি নিয়ে আসতে বলেন। উত্তরে মোহাম্মদ সেটি নিয়ে আসবেন বলে জানান। পরে হকিস্টিক আনা এবং কালো শার্ট পরে কলেজে যাওয়ার বিষয়েও কথা হয় সেখানে।  ফেসবুক মেসেঞ্জারের ঐ কথোপকথনের বিষয়ে প্রশ্ন করলে বরগুনার পুলিশ সুপার মারুফ হোসেন বলেন, ‘মেসেঞ্জারের বিষয়টা ঠিক আছে। তবে এ বিষয়ে এখনই আমরা কিছু বলতে চাচ্ছি না। আসামিদের গ্রেফতারের কোনো অগ্রগতি হয়েছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা অপারেশনে আছি।’ 

গত বুধবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে জেলা শহরের কলেজ রোডে রিফাত শরীফকে (২৩) স্ত্রীর সামনেই কুপিয়ে জখম করে একদল যুবক। বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে রিফাতের মৃত্যু হয়।

রিফাতের ওপর হামলার ভিডিও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়লে দেশ জুড়ে শুরু হয় আলোচনা। সেখানে দেখা যায়, দুই যুবক রামদা হাতে রিফাতকে একের পর এক আঘাত করে চলেছে। আর তার স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নি স্বামীকে বাঁচানোর জন্য হামলাকারীদের ঠেকানোর চেষ্টা করছেন। বরগুনার সরকারি কলেজের ডিগ্রি প্রথম বর্ষের ছাত্রী মিন্নি হামলাকারী সবাইকে চিনতে না পারার কথা জানালেও নয়ন, রিফাত ও রিশানের নাম বলেছেন।

দুই মাস আগে রিফাতকে বিয়ে করা মিন্নি বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের বলেন, বিয়ের আগে থেকেই তাকে উত্ত্যক্ত করত, হুমকি দিত নয়ন। বিভিন্ন সময় পথেঘাটে হেনস্তাও করেছে। ক্রোক এলাকার একজন বাসিন্দা জানান, গত বছর শেষের দিকে দীঘির পাড়ের একটি মেসে হামলা করে মোবাইল ফোন ও ল্যাপটপ ছিনতাই করে নয়নের বন্ড বাহিনী। পরে ঐ মেসের বাসিন্দা ১৫ জন ছাত্র ভয়ে মেস ছেড়ে চলে যায়। কেজি স্কুল এলাকার বাসিন্দা আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘চুরি, ছিনতাই, লুটপাটসহ এমন কোনো অপরাধ নাই যা নয়নের দল করেনি।’

রিফাত হত্যার ঘটনায় তার বাবা দুলাল শরীফ বৃহস্পতিবার সকালে ১২ জনকে আসামি করে বরগুনা থানায় একটি মামলা করেন। অভিযানে নেমে পুলিশ এজাহারভুক্ত আসামি চন্দন, হাসান এবং সন্দেহভাজন নাজমুল হাসানকে গ্রেফতার করে। শুক্রবার তাদের আদালতে হাজির করা হলে বিচারক ৭ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

বিচার দাবিতে মানববন্ধন : আমাদের বরগুনা (উত্তর) প্রতিনিধি জানান : রিফাত হত্যার বিচার দাবিতে বরগুনায় মানববন্ধন কর্মসূচি পালিত হয়েছে। এতে সর্বস্তরের মানুষ অংশ নেন। শনিবার সকাল ১০টা থেকে ১১টা পর্যন্ত বরগুনা প্রেসক্লাবের সামনে সর্বস্তরের জনগণের ব্যানারে এ কর্মসূচি পালন করা হয়।

কর্মসূচি চলাকালে বক্তব্য রাখেন নিহত রিফাত শরীফের বাবা আবদুল হালিম দুলাল শরীফ, জেলা যুবলীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট কামরুল আহসান মহারাজ, বুড়িরচর ইউপি চেয়ারম্যান মো. সিদ্দিকুর রহমান, শাহাবুদ্দিন সাবু, সুনাম দেবনাথ ও জুবায়ের আদনান অনিক। বক্তারা আসামিদের গ্রেফতার করে সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করেছেন।

একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে শোকে পাগলপ্রায় হয়েছেন রিফাতের বাবা আবদুল হালিম দুলাল শরীফ। রিফাতের মা শয্যাশায়ী, গত ১৮ বছর ধরে তিনি প্যারালাইজ হয়ে বিছানায় পড়ে আছেন। রিফাতের বাবা তার ছেলের হত্যাকারীদের বিচার দাবি করেছেন।