ভারতে তিন পত্রিকা গ্রুপের বিজ্ঞাপন বন্ধ করেছে সরকার

ভারতে অন্তত তিনটি বড় সংবাদপত্র গ্রুপের বিজ্ঞাপন বন্ধ কিংবা হ্রাস করেছে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকার। গ্রুপগুলোর নির্বাহী ও বিরোধী দলগুলো বলছে, সরকারবিরোধী প্রতিবেদন প্রকাশের প্রতিশোধ হিসেবে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যদিও ক্ষমতাসীন দল বিজেপি এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

সমালোচকদের মতে, ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতায় আসার পর থেকেই ভারতে স্বাধীন সংবাদপত্রের উপর আক্রমণ শুরু হয়েছে। সরকারের সমালোচনামূলক প্রতিবেদন প্রকাশের কারণে সংবাদিকদের ভীতি প্রদর্শন করা হচ্ছে বলে অভিযোগ আছে। এই তিনটি সংবাদপত্র গ্রুপের মাসিক পাঠক সংখ্যা ২৬ মিলিয়ন বা ২ কোটি ৬০ লাখের উপরে। এসব গ্রুপকে সরকারি বিজ্ঞাপন দেওয়া বন্ধ করা হয়েছে গত মাসে বিপুল বিজয়ের মধ্য দিয়ে দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় আসার পূর্ব থেকেই। টাইমস অব ইন্ডিয়া, ইকোনোমিক টাইমসহ বেশ কয়েকটি   পত্রিকার মালিক বেনেট, কোলম্যান এন্ড কোম্পানি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কোম্পানিটির এক নির্বাহী বলেন, বিজ্ঞাপন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। হয়তো কিছু রিপোর্টে সরকার খুশি হতে পারেনি। তিনি জানান, টাইমস গ্রুপের ১৫ ভাগ বিজ্ঞাপন আসতো সরকারের কাছ থেকে।

দ্য এবিপি গ্রুপ প্রকাশ করে দ্য টেলিগ্রাফ পত্রিকা। পত্রিকাটি নিরাপত্তা থেকে বেকারত্বসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সরকারের কাজ নিয়ে সমালোচনা করে থাকে। কোম্পানির দুই কর্মকর্তা জানিয়েছেন, গত ছয় মাসে তাদের বিজ্ঞাপনও ১৫ ভাগ কমে গেছে। এবিপির এক কর্মকর্তা বলেন, যদি আপনার সম্পাদকীয় কাভারেজ সরকারি নিয়মের অধীনে না থাকে এবং আপনি যদি সরকারের বিরুদ্ধে কিছু লেখেন তাহলে অবশ্যই আপনাকে শাস্তি দিতে তাদের একমাত্র উপায় হলো বিজ্ঞাপন সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া। দ্বিতীয় আরেক নির্বাহী বলেন, বিজ্ঞাপন বন্ধ করে দেওয়ার ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় সরকার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সেই বিষয়ে কোনো কিছুই তাদেরকে জানানো হয়নি। তারা অন্য ক্ষেত্র থেকে বিজ্ঞাপন এনে ঘাটতি পূরণের চেষ্টা করছেন। তিনি বলেন, এক্ষেত্রে সংবাদপত্রের স্বাধীনতাকে অবশ্যই অক্ষুন্ন রাখতে হবে। দুই কর্মকর্তাই নাম প্রকাশ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।

দ্য হিন্দু পত্রিকায়ও সাম্প্রতিক সময়ে সরকারি বিজ্ঞাপন কমে গেছে বলে এর কর্তৃপক্ষ দেখতে পেয়েছেন। এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তারা ভারত ও ফ্রান্সের মধ্যে রাফায়েল বিমান ক্রয় নিয়ে যে চুক্তি হয়েছে তাতে অনিয়মের অভিযোগ নিয়ে ফেব্রুয়ারিতে একটি রিপোর্ট প্রকাশ করেন। এরপর থেকেই তাদের বিজ্ঞাপন কমা শুরু হয়েছে। তবে সরকার এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

কেন্দ্রীয় সরকারের বিজ্ঞাপন বিষয়ক এজেন্সি ব্যুরো অব আউটরিচ অ্যান্ড কমিউনিকেশন এর মহাপরিচালক সত্যেন্দ্র প্রকাশের সঙ্গে এ বিষয়ে ই-মেইল ও ফোনে কথা বলার চেষ্টা করেও মতামত জানতে পারেনি বার্তা সংস্থা রয়টার্স। এমনকি মন্তব্য জানতে তিনটি সংবাদপত্র গ্রুপের কোনো প্রধান নির্বাহীর কেউ রয়টার্সের ই-মেইলের জবাব দেননি। সম্প্রতি লোকসভায় কংগ্রেস নেতা অধীর রঞ্জন চৌধুরী বলেন, সরকার থেকে বিজ্ঞাপন বন্ধ করে দেওয়ার অগণতান্ত্রিক ও জোর যার মুল্লুক তার স্টাইল হলো মিডিয়ার প্রতি এই সরকারের একটি বার্তা। তাহলো, তাদের নিয়ন্ত্রণে বা তাদের নীতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হবে। তবে অভিযোগ অস্বীকার করে বিজেপির মুখপাত্র নালিন কোহলি বলেছেন, প্রায়ই সংবাদমাধ্যমগুলো সরকারের সমালোচনা করে থাকে। তবুও তাদের ওপর কোনো হস্তক্ষেপ করা হয়নি। ভারতে মিডিয়া সম্পূর্ণ স্বাধীন। বিজেপির বিরুদ্ধে সংবাদমাধ্যমে হস্তক্ষেপের অভিযোগ হাস্যকর বলে মনে করেন কোহলি। উল্লেখ্য, বিশ্ব স্বাধীন গণমাধ্যম সূচকে ১৮০টি দেশের মধ্যে ২০১৯ সালে ভারতের অবস্থান ছিলো ১৪০তম যা আফগানিস্তান, মিয়ানমার ও ফিলিপাইনের মতো দেশগুলোরও পেছনে।