ম্যাচের পরিস্থিতি যাই হোক, খেলতে হবে আক্রমণাত্মক। শরীরীভাষায় পেছনে ফিরে তাকানোর কোনও প্রকাশ থাকবে না। মারমুখী ভঙ্গিতে চলবে ব্যাটিং আর ফিল্ডিংয়ে আগ্রাসী মনোভাব- ইংল্যান্ডে এই দর্শনের ক্রিকেটকে বলা হচ্ছে ‘বাজবল’। বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয়ে ভারতের বিশ্বকাপে নেমে নাকানিচুবানি খাওয়া ইংলিশরা কি এই ক্রিকেট-দর্শনেই ধরা খেলো?
‘বাজবল’ শব্দটা ক্রিকেটে আর নতুন নয়। ২২ গজের খেলাটির খোঁজখবর রাখলে শব্দটার সঙ্গে আপনার পরিচয় আছে। নিউজিল্যান্ডের সাবেক অধিনায়ক ব্রেন্ডন ম্যাককালাম ইংল্যান্ডের টেস্ট দলের কোচ হয়ে আসার পর নতুন দর্শনের ক্রিকেট খেলাচ্ছেন। টেস্ট ম্যাচ পাঁচ দিনের খেলা বলে এখানে সাধারণত উইকেট বাঁচিয়ে রান বাড়ানোর চেষ্টা করা হয়। রক্ষণাত্মক ভঙ্গিই এই সংস্করণের জন্য বেশি খাটে। ম্যাককালাম এই ধারণা পাল্টে দিয়েছেন।
তার দর্শন হলো, যতই পাঁচ দিনের ম্যাচ হোক, খেলা হবে আগ্রাসী মনোভাবে। প্রথম বল থেকে প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করা। সেটা ব্যাটিংয়ে হলে প্রথম বল থেকে মেরে খেলা। ম্যাককালামকে তার কিউই সতীর্থরা ডাকতেন ‘বাজ’ বলে। সেখান থেকেই ব্রিটিশ মিডিয়া ইংল্যান্ডের নতুন দর্শনের টেস্ট ক্রিকেটের নাম দিয়েছে ‘বাজবল’। দিনকয়েক আগে তো কলিন্স ডিকশনারিতেও যুক্ত করা হয়েছে ‘বাজবল’ শব্দটি।
তো এই ‘বাজবল’ নিয়ে আলোচনা যেমন আছে, তেমনি হয়েছে সমালোচনা। গত অ্যাশেজে অস্ট্রেলিয়ার কাছে প্রথম দুই টেস্ট হারের পর ব্যাপক সমালোচনা হয়েছিল। পরে আবার প্রশংসাও কুড়িয়েছে ঘুরে দাঁড়িয়ে অ্যাশেজ ২-২-এ ড্র করায়। ইংল্যান্ডের ওয়ানডে কোচ অবশ্য ম্যাককালাম নন, সীমিত ওভারের ক্রিকেটে ইংলিশদের দায়িত্বে ম্যাথু মট। টেস্টের সঙ্গে তাই সীমিত ওভারের পরিকল্পনার কোনও সম্পর্ক থাকার কথা নয়।
কিন্তু যে ‘বাজবল’ টেস্ট ক্রিকেটে সফলতা এনে দিয়েছে, সেটি তো সীমিত ওভারের ক্রিকেটে আরও ভালোমতো কাজ করার কথা। আগ্রাসী বা আক্রমণাত্মক মনোভাব একদিনের ক্রিকেটের জন্য বেশি উপযোগী। তাই ম্যাথু মট বা ইংল্যান্ডের টিম ম্যানেজমেন্টের ‘বাজবল’ মনোভাবের ক্রিকেটের পক্ষে থাকাই স্বাভাবিক।
কিন্তু বিশ্বকাপে এসে এই দর্শনের ক্রিকেট চললো না। ভারতের বিশ্বকাপ শুরুর আগে ইংল্যান্ডকে ধরা হয়েছিল হট ফেভারিট। ইংলিশদের সেমিফাইনালে ধরে বাকি তিন দল নিয়ে হয়েছিল আলোচনা। অথচ ৭ ম্যাচ শেষে মাত্র ২ পয়েন্ট নিয়ে সবার নিচে জস বাটলারের দল। সেমিফাইনালে খেলার শেষ আশাটাও শেষ হয়ে গেছে অস্ট্রেলিয়ার কাছে হেরে।
ইংল্যান্ডের একমাত্র জয় বাংলাদেশের বিপক্ষে। নিজেদের দ্বিতীয় ম্যাচে। বিশ্বকাপ শুরুর হয়েছিল তাদের বিশাল ব্যবধানের হার দিয়ে। যাদের হারিয়ে ২০১৯ সালে শিরোপা তুলেছিল ইংলিশরা, সেই নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ২৮২ রান করলেও হারতে হয় ৯ উইকেটে। কিউইরা জিতেছিল মাত্র ৩৬.২ ওভারে।
বাংলাদেশের বিপক্ষে জিতে স্বরূপে ফেরার ইঙ্গিত দেয় ইংল্যান্ড। কিন্তু পরের ম্যাচেই আফগানিস্তানের কাছে লজ্জার হার। ৬৯ রানের বড় পরাজয়ের পরও আসলে টের পাওয়া যায়নি আরও কত লজ্জা অপেক্ষা করছে সামনে। দক্ষিণ আফ্রিকার দেওয়া ৪০০ রানের বিশাল লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে ১৭০ রানে গুটিয়ে যাওয়া, শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে মাত্র ১৫৬ রানে অলআউট হয়ে ৮ উইকেটের হার, ভারতের ২২৯ রানের জবাবে মাত্র ১০০ রানে অলআউট হওয়ার লজ্জা, আর সবশেষ চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ৩৩ রানের হার- ইংলিশ-ক্রিকেট সাম্রাজ্য ভেঙে খানখান!
বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন থেকে তলানির দলে পরিণত হওয়ার বড় কারণ হিসেবে অনেকেই ‘বাজবল’ ক্রিকেটকে দায়ী করছেন। তাদেরই একজন সাবেক পাকিস্তানি পেসার শোয়েব আখতার। তার মতে, বিশ্বকাপে ইংল্যান্ড খেলছে পরিকল্পনাহীন ক্রিকেট। ‘বাজবল’ই ধ্বংস করেছে বাটলারদের।
নিজের ইউটিউব চ্যানেলে শোয়েব বলেছেন, ‘ইংল্যান্ড এত বাজেভাবে হারছে কারণ তারা টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটটা ওয়ানডেতে নিয়ে এসেছে। কে ইনিংস গড়ে তুলবে, কে বলে বলে রান তুলবে, কে নতুন করে ইনিংস গড়ার কাজ করবে, কে স্লগ ওভারগুলোতে খেলবে- এর কোনোটারই পরিকল্পনা নেই তাদের।’
এরপরই পাকিস্তানি সাবেক পেসার এনেছেন ‘বাজবল’ প্রসঙ্গ, ‘বিশ্বকাপে এমন ইংল্যান্ডকে দেখে খুব খারাপ লাগছে। টেস্টে বাজবল ঠিক আছে, কিন্তু ওয়ানডেকে ওয়ানডের মতো খেলতে হবে।’
শোয়েবের কথায় যুক্তি আছে। ইংল্যান্ডের ব্যাটিংয়ে পরিকল্পনার কোনও ছাপ পাওয়া যাচ্ছে না। বোলিংও ছন্নছাড়া। ফল, বিশ্বকাপের আগে ‘বাজবল’ ক্রিকেটে উড়তে থাকা ইংলিশরা এখন লজ্জার সাগরে নিমজ্জিত। অতিআগ্রাসী ক্রিকেটীয় মনোভাবই কি এর কারণ? বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের বাজে পারফরম্যান্সে ‘বাজবল’ তত্ত্বকে চাইলে কাঠগড়ায় তুলতেই পারেন!