ভোক্তা-অধিকার ও প্রতিকার লাভের উপায়

বাংলাদেশ একটি উন্নয়নশীল দেশ। আমাদের দেশে শিক্ষার হার খুব একটা বেশি নয়। সাধারণ ভোক্তা তো বটেই, শিক্ষিত অনেক ভোক্তার মধ্যেও তাদের আইনি অধিকার নিয়ে সচেতনতার অভাব রয়েছে। জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ২০০৯ সালের আইন বলে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯-এ বলা হয়েছে, জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের অন্যতম কাজ হবে, দেশের সব শ্রেণি-পেশার ভোক্তাকে তাদের আইনি অধিকার সম্পর্কে সচেতন করে তোলা। অধিদপ্তরের উদ্যোগে ভোক্তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করে তোলার জন্য চেষ্টা করা হচ্ছে, যদিও বিষয়টি অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং।

আমাদের দেশের জনসংখ্যা হচ্ছে প্রায় ১৭ কোটি। এই বিপুলসংখ্যক মানুষকে তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করে তোলা এবং অধিকার লঙ্ঘিত হলে কীভাবে আইনি প্রতিকার পাওয়া যাবে, সে সম্পর্কে অবহিত করা খুবই দুরূহ কাজ। নানাভাবে প্রচার-প্রচারণার মাধ্যমে মানুষকে সচেতন করে তোলার চেষ্টা করা হচ্ছে। আমাদের অধিদপ্তরের একটি অফিশিয়াল ফেসবুক পেজ ও একটি ইউটিউব চ্যানেল রয়েছে। বাজার মনিটরিংসহ আমাদের বিভিন্ন কার্যক্রমসংক্রান্ত ছবি, ভিডিওসহ বিভিন্ন কনটেন্ট এসব চ্যানেলে আপলোড করা হয়। এছাড়া ডিবেট ফর ডেমোক্রেসির সহযোগিতায় আমরা বিতর্ক প্রতিযোগিতার আয়োজন করছি। মিডিয়া আমাদের কার্যক্রম লাইভ প্রচার করছে। এর মাধ্যমে সাধারণ মানুষ জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের কার্যক্রম এবং তাদের আইনি অধিকার সম্পর্কে জানতে পারছে। কীভাবে তাদের অধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে, তা অবহিত হতে পারছেন। ভোক্তারা এখন আগের যে কোনো সময়ের তুলনায় সচেতন হয়েছেন। তবে এতে আমরা আত্মতুষ্টি লাভ করছি না। কারণ আমাদের আরো বহু দূর যেতে হবে।

২০০৯ সাল থেকে গত ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত সময়ে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর বিভিন্ন বাজারে মোট ৬৯ হাজার ২৮৮টি অভিযান পরিচালনা করে। এ সময় ১ লাখ ৬৩ হাজার ৩১টি প্রতিষ্ঠানকে দণ্ড প্রদান করা হয়। বাজার অভিযানের মাধ্যমে জরিমানা আদায় করা হয় ১১২ কোটি ৪১ লাখ ১৫ হাজার ২৪২ টাকা। প্রাপ্ত অভিযোগ নিষ্পত্তির মাধ্যমে দণ্ডিত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৮ হাজার ৮৮৭টি। এদের কাছ থেকে জরিমানা আদায় করা হয় ৬ কোটি ২০ লাখ ১৬ হাজার ৯০৮ টাকা। বর্ণিত সময়ে ৮ হাজার ৭৩২ জন অভিযোগকারীকে ১ কোটি ৫২ লাখ ২ হাজার ৯৭৭ টাকা প্রদান করা হয়েছে। জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের আইনে আছে, কোনো ব্যক্তি যদি কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করেন এবং অভিযুক্ত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে যদি জরিমানা করা হয়, তাহলে জরিমানাকৃত অর্থের ২৫ শতাংশ অভিযোগকারীকে দেওয়া হয়। বাংলাদেশের অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের আইনে এ ধরনের কোনো বিধান নেই।

আমরা ইদানীং সিসিএমএস (কনজুমার কমপ্লেইন ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম) চালু করেছি। আগে অনেক সময় ভোক্তাগণ তাদের ছোটখাটো অভিযোগ দায়ের করত না। এখন সিসিএমএস চালু হবার ফলে ভোক্তাগণ সহজেই তাদের অভিযোগ দায়ের করতে পারছেন। সিসিএমএস চালু করার পর অভিযোগের মাত্রা আগের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। গত আট মাসে সিসিএমএসের মাধ্যমে প্রায় ২০ হাজার অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। অধিদপ্তরের উদ্যোগে দিনে যেমন অভিযান পরিচালনা করা হয়, তেমনি রাতের বেলায়ও বিভিন্ন মার্কেটে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। যতদিন পর্যন্ত আমরা ভোক্তাদের কার্যকরভাবে তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করে তুলতে না পারব, ততদিন ভোক্তা-অধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনা সম্ভব হবে না। একই সঙ্গে ব্যবসায়ী মহলকেও তাদের বাধ্যবাধকতা সম্পর্কে সচেতন করে তুলতে হবে।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বর্তমান উচ্চ মূল্যস্ফীতি সবচেয়ে জটিল সমস্যায় পরিণত হয়েছে। সর্বশেষ পরিসংখ্যান মোতাবেক খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি সাড়ে ১২ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণভাবে ভোক্তাগণ, বিশেষ করে দরিদ্র শ্রেণির মানুষ অসুবিধার মধ্যে রয়েছেন। সরকার নানাভাবে চেষ্টা করে যাচ্ছেন উচ্চ মূল্যস্ফীতিকে সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনার জন্য। যারা পণ্য বিপণনব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত, তাদের মধ্যে একটি শ্রেণি আছেন, তারা সব সময় মূল্য বৃদ্ধির অজুহাত খুঁজতে থাকেন। একসময় করোনার অজুহাত দেওয়া হতো। তারপর ইউক্রেন যুদ্ধ এবং পরবর্তী সময় তাপপ্রবাহের দোহাই দিয়ে পণ্যমূল্য বাড়িয়ে দেওয়া হলো। ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে আমদানিকৃত পণ্যের মূল্য বাড়তে পারে। তবে দেশে উত্পাদিত পণ্যের ক্ষেত্রে তা কতটা যৌক্তিক? এখন আবার মার্কিন ডলারের সংকটের অজুহাত দেওয়া হচ্ছে কিন্তু দেশের অভ্যন্তরে যেসব পণ্য উত্পাদিত হয়, তার মূল্য কেন এতটা বৃদ্ধি পাবে? আমাদের দেশে ভোক্তা পর্যায়ে পণ্যমূল্য অস্বাভাবিক মাত্রায় বৃদ্ধি পাওয়ার পেছনে মধ্যস্বত্বভোগীদের ভূমিকা রয়েছে। তৃণমূল পর্যায়ের উত্পাদকরা সংগঠিত নন। দারিদ্র্যের কারণে তারা উত্পাদিত পণ্য বেশি দিন ধরে রাখতে পারেন না। এই সুযোগে মধ্যস্বত্বভোগীরা উত্পাদকদের কাছ থেকে তুলনামূলক কম মূল্যে পণ্য ক্রয় করে শহরে এনে বেশি মূল্যে তা ভোক্তাদের কাছে বিক্রি করে থাকেন। বিদ্যমান ব্যবস্থায় উত্পাদক তার পণ্যের সঠিক মূল্য পান না। ভোক্তা বেশি দামে পণ্য ক্রয় করতে বাধ্য হন। মাঝখান থেকে মধ্যস্বত্বভোগীরা অযৌক্তিক মুনাফা করছেন। মধ্যস্বত্বভোগী, যাদের উত্পাদন-প্রক্রিয়ার সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই, তারাই বর্ধিত পণ্যমূল্যের পুরোটা লুফে নেন। মধ্যস্বত্বভোগীরা অত্যন্ত ক্ষমতাবান।

বাজারে পণ্যমূল্য বৃদ্ধির কিছু যৌক্তিক কারণ রয়েছে। কিন্তু এর পাশাপাশি তারা অযৌক্তিকভাবেও কোনো কোনো পণ্যের মূল্য বাড়িয়ে দিচ্ছে। সেই মূল্য বৃদ্ধির পরিমাণ বা হার অস্বাভাবিক রকম বেশি। বাজারে হঠাত্ হঠাত্ কোনো পণ্যের মূল্য অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পায়। জীবন রক্ষাকারী ওষুধের মূল্যও অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি করা হয়েছে। যে পণ্য আমদানি করতে হয় না, স্থানীয়ভাবে উত্পাদিত হয়, সেই পণ্যের মূল্য বাড়বে কেন? অতি মুনাফালোভী ব্যবসায়ীদের মানসিকতার পরিবর্তন না হলেও শুধু আইন প্রয়োগ করে এদের পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। আমাদের দেশের বিপণনব্যবস্থায় ত্রুটি রয়েছে। উত্পাদক থেকে শুরু করে ভোক্তা পর্যায়ে আসতে একটি পণ্য অনেক বার হাত বদল হয়। প্রতিটি স্তরেই অরাজকতা বিদ্যমান। ফলে ভোক্তা পর্যায়ে একটি পণ্য পৌঁছানোর আগেই, তার মূল্য অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। উত্পাদনকারীরা সংগঠিত না হলেও বিপণনকারী এবং মধ্যস্বত্বভোগীরা অত্যন্ত সংগঠিত। আমাদের পরিবহনব্যবস্থার মধ্যে সমস্যা রয়েছে। পণ্য পরিবহনকালে পথে পথে চাঁদা দিতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে ভোক্তা কোনো পণ্য কিনে ক্রয়রসিদ গ্রহণ করেন না। ফলে তারা নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে পণ্য ক্রয় করলেও তা প্রমাণ করা যায় না।

পণ্য উত্পাদক সব সময় চাইলেও শহরে এনে পণ্য বিপণন করতে পারেন না। তাই সরকারি উদ্যোগে স্থানীয়ভাবে উত্পাদকদের কাছ থেকে পণ্য সংগ্রহ করে শহরের ভোক্তাদের কাছে পৌঁছে দেওয়া গেলে পণ্য বিপণন-ব্যবস্থায় মধ্যস্বত্বভোগীদের তত্পরতা অনেকটাই কমে যেতে পারে। সরকারিভাবে তৃণমূল পর্যায় থেকে পণ্য সরাসরি ক্রয় করে এনে শহরে বিক্রির ব্যবস্থা করা গেলে উত্পাদক এবং ভোক্তা উভয় শ্রেণিই লাভবান হতে পারবেন।

নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, বিশেষত সয়াবিন তেল ও চিনির মূল্য (যা বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ঠিক করে দেয়) স্থিতিশীল ও সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার লক্ষ্যে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে অধিদপ্তর কর্তৃক রিফাইনারি থেকে পরিবেশক পর্যায় পর্যন্ত তেল ও চিনির মজুত পরিস্থিতি জানার লক্ষ্যে একটি অ্যাপস তৈরির কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এর মাধ্যমে এসব পণ্যের অবৈধ মজুত শনাক্ত করা সহজ হবে এবং এর সঙ্গে জড়িত অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে অধিদপ্তর কর্তৃক আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ সহজ হবে।

ভোক্তাদের স্বার্থে অভিযোগ দায়েরের পদ্ধতি এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া অধিকতর সহজ ও দ্রুত করার লক্ষ্যে সিসিএমএস (CCMS) শীর্ষক ওয়েব পোর্টাল এবং সফটওয়্যার তৈরি করা হয়েছে। সফটওয়্যারটি ব্যবহারের মাধ্যমে ভোক্তাদের কাছ থেকে প্রাপ্ত অভিযোগসমূহ দ্রুত নিষ্পত্তির মাধ্যমে ভোক্তাগণকে তাদের কাঙ্ক্ষিত সেবা প্রদান করা সম্ভব হবে।

ভোক্তা-অধিকার আইন সম্পর্কে খুব সহজে ও দ্রুত সময়ে বেশিসংখ্যক ভোক্তাকে সচেতন করার লক্ষ্যে অধিদপ্তর কর্তৃক ‘জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর’ শীর্ষক ফেসবুক পেজ (https://facebook.com/dncrp) চালু করা হয়। ২০১৫ সালের ৩ নভেম্বর অধিদপ্তরের অফিশিয়াল ফেসবুক পেজ চালু করা হয়। এর আনুষ্ঠানিক প্রচার-প্রচারণামূলক কার্যক্রম শুরু হয় ১ জুলাই ২০২২ থেকে। বর্তমানে অধিদপ্তরের ফেসবুক পেজের ফলোয়ারের সংখ্যা প্রায় ২০ লাখ ৬০ হাজারের বেশি।

জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের মধ্যে ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯ সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টিসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের কারিকুলামে আইনটি অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণে নিবিড়ভাবে কাজ করার লক্ষ্যে গত ৩ আগস্ট ২০২৩ সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করা হয়েছে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা মোতাবেক ঈদুল  আজহা ২০২৩ উপলক্ষ্যে কাঁচা চামড়ার গুণমান রক্ষার্থে যথাযথ পদ্ধতিতে চামড়া ছাড়ানো, লবণ প্রয়োগ ও সংরক্ষণ এবং পরিবেশসম্মত উপায়ে বর্জ্যব্যবস্থাপনা বিষয়ে সচেতনতামূলক প্রচার-প্রচারণার লক্ষ্যে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর কর্তৃক তৈরিকৃত TVC বহুল প্রচারের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। এরই অংশ হিসেবে দেশের শীর্ষস্থানীয় ১৭টি টেলিভিশন চ্যানেলে ঈদের আগে ২৬ জুন ২০২৩ থেকে ২৮ জুন ২০২৩ পর্যন্ত (প্রতিদিন প্রতিটি চ্যানেলে পিক সময়ে দুই বার ও অফ পিক সময়ে দুই বার করে) প্রচারের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। এছাড়াও অধিদপ্তরের নিজস্ব ফেসবুক পেইজের মাধ্যমে টিভিসিটি প্রচারের ব্যবস্থা করা হয়। এছাড়া বিভিন্ন সুপার শপের ভেতর স্থাপিত টিভি স্ক্রিনে ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯ এবং অধিদপ্তরের কার্যক্রমভিত্তিক বিভিন্ন সচেতনতামূলক ভিডিও কনটেন্ট প্রচার কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। (অনুলিখন :এম এ খালেক)

লেখক: মহাপরিচালক (অতিরিক্ত সচিব), জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়