শীত আগমনের পূর্বে নভেম্বর মাসে প্রায়শই শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় হইয়া থাকে। আশার কথা হইল, মিধিলি ক্রমশ স্তিমিত হইয়াছে। যদিও এক মাসেরও কম সময়ের ব্যবধানে ঘনীভূত হইল এই দ্বিতীয় ঘূর্ণিঝড়—মিধিলি। নামটি দিয়াছে মালদ্বীপ—যাহার অর্থ বৃহত্ বৃক্ষ বা মহিরুহ। গত মাসের ২৩ অক্টোবর বাংলাদেশ উপকূলে দুর্বল হইয়া চলিয়া গিয়াছিল ‘হামুন’। নামটি দিয়াছিল ইরান। মিধিলির পরের নামটি মিয়ানমারের—‘মিগজাউম’। ঘূর্ণিঝড় মিধিলির প্রভাবে ২০টি মাছ ধরার ট্রলারসহ দুই শতাধিক জেলে নিখোঁজের খবর প্রকাশ হইয়াছে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়। ইহা দুঃখজনক যে, এই আধুনিক প্রযুক্তির যুগে ঘূর্ণিঝড়ের গতিপথ ও দিনক্ষণের প্রায় নিখুঁত হিসাবনিকাশ কয়েক দিন পূর্বেই পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে প্রচারিত হইয়াছে। সুতরাং তাহার পরও সকল কিছু জানিয়া-শুনিয়া কেহ যদি মাছ ধরিতে সমুদ্রেই অবস্থান করিয়া থাকে, তাহা আত্মঘাতীতুল্য।
যদিও উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষ দুঃসাহসী হইয়া থাকে; কিন্তু প্রকৃতির শক্তির সহিত গোঁয়ারতুমি চলে না। ৫৩ বত্সর পূর্বে এই নভেম্বরেই একটি ঘূর্ণিঝড়ের কথা বিশেষভাবে স্মরণ করা যাইতে পারে। জাতিসংঘের আওতাধীন বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা ২০১৭ সালে বিশ্বের সবচাইতে শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়গুলির একটি তালিকা প্রকাশ করিয়াছে, যেইখানে ঐ ঘূর্ণিঝড়টিকে ‘সবচাইতে শক্তিশালী সাইক্লোন’ হিসাবে চিহ্নিত করিয়াছে। বিবিসির একটি রিপোর্টেও বলা হইয়াছিল, ১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বর প্রলয়ংকরী ঐ ঝড়ের আঘাতে তছনছ হইয়া গিয়াছিল বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল। তীব্র জলোচ্ছ্বাসে ভাসিয়া গিয়াছিল লক্ষ লক্ষ মানুষ। অনেকে মনে করেন, সেই সাইক্লোন পশ্চিম পাকিস্তানের প্রতি বাঙালির অবিশ্বাসের কফিনে শেষ পেরেক ঠুকিয়া দিয়াছিল। বঙ্গবন্ধু তখন বলিয়াছিলেন, ‘দুর্গত এলাকা আমি সফর করে এসেছি। .... পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট এখনো দুর্গত এলাকায় আসেননি। আমরা যে কত অসহায়, এই একটা সাইক্লোন তা প্রমাণ করেছে।’ ইহার ২৫ দিন পর নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানের ১৬৯টি আসনের মধ্যে ১৬৭টি আসনে জয়লাভ করে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ। সুতরাং ঘূর্ণিঝড়ও কখনো-সখনো অনেক বড় প্রভাবক হইয়া উঠিতে পারে।
সত্তরের ঐ ভয়ানক ঘূর্ণিঝড়ের পর বাংলাদেশে আরো অনেক সুপার সাইক্লোন আঘাত হানিয়াছে। তবে সুপার সাইক্লোন না হইলেও সাধারণ ঘূর্ণিঝড় তো বাংলাদেশের জন্য খুবই সাধারণ ঘটনা। দুর্যোগ-দুর্বিপাকের বিরুদ্ধে লড়িতে লড়িতে বাংলাদেশ এখন ঘূর্ণিঝড় জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় বিশ্বের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় দেশ। ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের জন্য গত কয়েক দশক জুড়িয়া উপকূলীয় অঞ্চলে অসংখ্য সাইক্লোন শেল্টার কাম বিদ্যালয় তৈরি করা হইয়াছে। বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট নিম্নচাপ সাধারণত ঘণ্টায় ৬৫ কিলোমিটার (৪০ মাইল) বেগপ্রাপ্ত হইলেই উহাকে ‘ঘূর্ণিঝড়’ আখ্যা দেওয়া হয়। প্রশ্ন জাগিতে পারে, ঘূর্ণিঝড়ের কেন নাম দেওয়া হয়? আসলে ঘূর্ণিঝড়ের নামকরণের ইতিহাস খুব বেশি পূর্বের নহে। ১৯৫৩ সালে আমেরিকার ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের সবচাইতে বড় শহর মায়ামির জাতীয় হ্যারিকেন সেন্টার আটলান্টিক অঞ্চলে ঘূর্ণিঝড়ের নামকরণের জন্য প্রস্তাব দেয়। পরবর্তীকালে জাতিসংঘের একটি ইউনিট ওয়ার্ল্ড মেটিওরোলজিক্যাল অর্গানাইজেশনের বৈঠকে ঘূর্ণিঝড়ের নামকরণের জন্য একটি তালিকা তৈরি করা হয়। পৃথিবীতে মোট ১১টি সংস্থা ঝড়ের নামকরণ করিয়া থাকে। ওয়ার্ল্ড মেটিওরোলজিক্যাল ওয়েদার অর্গানাইজেশন এবং এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয়র জন্য জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কমিশন ২০০০ সালে ইহার সদস্য দেশগুলির পরামর্শ লইয়া ঘূর্ণিঝড়ের জন্য নাম প্রস্তুত করিবার কাজ শুরু করে—বাংলাদেশ, ভারত, মালদ্বীপ, ওমান, পাকিস্তানের মতো আরো ১২টি দেশকে সঙ্গে লইয়া। শ্রীলঙ্কা, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত এই প্যানেলের অংশ। ঝড়ের নাম দেওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ হইল—একটি নামের মাধ্যমে সুনির্দিষ্টভাবে ঝড় উপদ্রুত অঞ্চলে বসবাসরত অধিবাসীদের মধ্যে সতর্কবার্তা পৌঁছাইয়া দিতে সহজ হয়। তাহা ছাড়া ঝড়ের নাম দেওয়া হইলে কোন ঝড়ে কেমন ক্ষয়ক্ষতি হইয়াছে বা কোনো গবেষণার প্রয়োজনে তথ্য ঘাঁটতে সুবিধা হইয়া থাকে। আমরা আশা করিব, মহান সৃষ্টিকর্তার কৃপায় উত্তরোত্তর আরো ভালোভাবে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা করিতে পারিব।