কচুগাছ কাটিয়াই তাহারা গলা কাটিতে শিখিয়াছে!

বর্তমানে রাজনীতির মাঠে একটি বিশেষ শ্রেণির উপস্থিতি চোখে পড়িবার মতো! ইহারা সাহেবেরও এক ধাপ উপরে—মোসাহেব! তৈলবাজি, তোষামোদি, চাটুকারিতাকে পুঁজি করিয়া ইহারা রাজনৈতিক দলগুলির একেবারে শিকড় অবধি বিচরণ করিতেছে; বেশ অবাধেই। জর্জ বার্নার্ড শ ইহাদের শনাক্ত করিয়াছেন এইভাবে, ‘ইহারা কিছুই জানে না; অথচ ভাবখানা এমন যে, সকল কিছুই তাহাদের জানা।’ তবে আমরা মনে করি, একটি ক্ষেত্র ঠিকই তাহাদের নখদর্পণে—অন্যায়, অপকর্ম, মাস্তানি, চাঁদাবাজি, অত্যাচার, অসদুপায় ও অসত্ উপায়ে অর্থ উপার্জনের ন্যায় অপরাধ-অপকর্ম। এই বিষয়ে তাহারা অধিক পারদর্শীও বটে। ইহাদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণেই সম্ভবত উইনস্টন চার্চিল রাজনীতিকে ‘গুরুতর ব্যবসায়’ হিসাবে অবিহিত করিয়াছেন। সত্যি বলিতে, রাজনীতিতে সকল সময়েই কমবেশি তাহাদের দৌরাত্ম্য থাকিলেও আজিকার দিনে অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছাইয়াছে। বিশেষত, রাজনীতিকে কলুষিত করিয়া চলিয়াছে এই সকল ‘উঠতি নেতা, পাতিনেতা’ নামধারী পরজীবীর দল। আইজ্যাক আসিমভ ইহাদের সম্পর্কে আশঙ্কা প্রকাশ করিয়া বলিয়াছেন, ‘সহিংসতা ইহাদের শেষ অবলম্বন।’ অর্থাত্, কেবল রাজনীতি নয়, সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্যও ইহারা ‘রেড সিগন্যাল’।

বাংলায় একটি কথা প্রচলিত রহিয়াছে, ‘কচুগাছ কাটিতে কাটিতে একটি সময়ে আসিয়া মানুষের গলা কাটিয়া বসা।’ ইহাই কি আজিকার দিনে বাস্তবতা নহে? কাহাদের হাত রহিয়াছে ইহাতে? স্থানীয় নির্বাচনে বিরোধী পক্ষকে কোণঠাসা, মাঠছাড়া করিতে যাহারা অরাজকতা করিয়াছে, ভোটকেন্দ্রে ভাঙচুর চালাইয়াছে, তাহারাই এখন আসন্ন নির্বাচন ঘিরিয়া সহিংসতা ছড়াইবার জন্য তত্পর হইয়া উঠিয়াছে। হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনাও ঘটাইতেছে ইহারা। খোদ সরকারি দলের মধ্য হইতেই আশঙ্কা প্রকাশ করা হইয়াছিল যে, আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটিতে পারে; কিন্তু সেই জন্য দায়ী কাহারা, তাহা একটু তলাইয়া দেখা প্রয়োজন।

নিকট অতীতে বিভিন্ন স্থানীয় নির্বাচনে ইহাদের তাণ্ডবলীলা দেখিয়াছি আমরা। পুলিশ-প্রশাসনের একশ্রেণির কর্মকর্তাকে অর্থের বিনিময়ে ‘ম্যানেজ’ করিয়া কী করে নাই অনুপ্রবেশকারী এই সকল অতি উত্সাহী ‘নেতা’! ভোটকেন্দ্রের সিসিটিভি পর্যন্ত তছনছ করিয়াছে। বিরোধী দলের নেতাকর্মীর উপর অমানবিক দমন-পীড়ন চালাইয়াছে। সেই সকল ক্ষেত্রে দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তারা ‘সব দেখেও না দেখার ভান’ করিয়া দুষ্কৃতকারীদের রেহাই দিয়া দিয়াছেন। এমনকি কোর্টের দ্বারস্থ হইয়াও পরিত্রাণ মিলে নাই কতিপয় ক্ষেত্রে। সকল কিছুই যেন তাহাদের পকেটে! এই ক্ষেত্রে মনে রাখা জরুরি, প্রত্যেক ক্রিয়ার সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া আছে। এইভাবে একশ্রেণির নেতা ও অসাধু সরকারি কর্মকর্তার কারণে মারাত্মক ক্ষতি হইতেছে সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলগুলির। ইহাদের ব্যবহার করিয়া সাময়িক সময়ের জন্য সুবিধা হাসিল করা যাইতেছে বটে; কিন্তু কায়েম হইতেছে অরাজকতা। 

প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ করিতে হয়, বিজ্ঞানী ফ্রাংকেনস্টাইনের পরিণতির কথা—যেই দানবকে সৃষ্টি ও লালনপালন করিলেন, তাহার হাতেই সর্বস্ব হারাইলেন তিনি। অত্যন্ত আদরে পালিত অজগরের গল্পও এই ক্ষেত্রে প্রযোজ্য :অজগরের নিবিড় আলিঙ্গনে আপ্লুত মনিব মনোবিজ্ঞানীর নিকট গিয়া জানিতে পারিলেন, অজগর তাহাকে একটু একটু করিয়া মাপ লইতেছে, পেটে জায়গা হইলেই গলাধঃকরণ করিবে! কোনো সন্দেহ নাই, নিজের আখের গুছাইবার স্বার্থে যে বা যাহারা এই সকল তথাকথিত নেতাকে আদরে-আপ্যায়নে পুষিতেছে, একটি সময়ে আসিয়া তাহারাই পস্তাইবার কারণ হইয়া উঠিবে। অনিবার্যভাবে উভয়কেই কলুষিত হইতে হইবে। ইহাদের আশ্রয়-প্রশয়দাতারা এই সত্য জানিবার পরও ভান করিয়া চলে বটে; কিন্তু তলে তলে কত কী যে ঘটিয়া যাইতে পারে, সেই খবর কি তাহারা রাখে?

কেবল রাজনীতি কিংবা নির্বাচনের প্রশ্নে নহে, অনুপ্রবেশকারী উঠতি নেতারা সকল সময়েই দল কিংবা সাধারণ জনগণের জন্য হুমকিস্বরূপ। স্বীয় এজেন্ডা বাস্তবায়নই তাহাদের প্রধান ও একমাত্র টার্গেট। সুতরাং, প্রতিটি রাজনৈতিক দলের উচিত, সময় থাকিতে আস্তাকুঁড়ে ছুড়িয়া ফেলিয়া দিতে হইবে ইহাদের। তাহা না হইলে নির্ঘাত ফ্রাংকেনস্টাইনের ন্যায় পরিণতি, তথা কোমরের ছোরাতেই কোমর কাটিবে।