দারিদ্র্যমোচনে যুবকদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে সেইপ

দারিদ্র্যমোচন, বেকার সমস্যা হ্রাস ও টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিতের লক্ষ্যে এবং প্রায় ৮ লাখ কর্মহীন যুবক, নারী, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীসহ অনগ্রসর জনগোষ্ঠীকে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কর্মক্ষম হিসেবে গড়ে তুলতে বিভিন্ন ট্রেডে প্রশিক্ষণ প্রদান করে আসছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের স্কিল্স ফর এমপ্লয়মেন্ট ইনভেস্টমেন্ট প্রোগ্রাম (সেইপ)। কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করার পাশাপাশি দেশজুড়ে সড়ক দুর্ঘটনা রোধে দক্ষ চালক তৈরি এবং দেশ-বিদেশে চাকরির চাহিদা পূরণে দক্ষ ইলেক্ট্রিশিয়ান তৈরিতেও চলছে সেইপ প্রকল্পের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম। ফলে একদিকে যেমন দেশের আর্থসামাজিক অবস্থার আমূল পরিবর্তন হচ্ছে, তেমনি চাকরি পেয়ে স্বাবলম্বী হচ্ছে যুবসমাজ।

মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে দক্ষ মোটর চালকের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। সড়ক দুর্ঘটনা রোধের পাশাপাশি এ বিষয়টিতেও নজর দিচ্ছে সরকার। এই লক্ষ্যে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি), বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন (বিআরটিসি) ও ট্রাস্ট টেকনিক্যাল ট্রেনিং ইনস্টিটিউটের (টিটিটিআই) মাধ্যমে এক লাখ দক্ষ চালক তৈরিতে সেইপ প্রকল্প থেকে পদক্ষেপ নেওয়া হয়। সামাজিক প্রতিবন্ধকতাকে দূর করতে নারীদেরও এ প্রশিক্ষণে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এই তিন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ইতোমধ্যে ৯৩ হাজার ৬৩১ জনকে মোটর ড্রাইভিং প্রশিক্ষণে ভর্তির সুযোগ দেওয়া হয়েছে এবং ৬৪ হাজার ৭৬৩ জনকে প্রশিক্ষণসহ বিআরটিএ থেকে সেইপ প্রকল্পের উদ্যোগে এবং অর্থায়নে লাইসেন্স প্রদান করা হয়েছে।

যুবক-যুবতীদের মধ্যে ড্রাইভিং বা গাড়িচালনা প্রশিক্ষণটি (চার মাস মেয়াদি মোটর ড্রাইভিং উইথ বেসিক মেইনটেন্যান্স কোর্স) ইতোমধ্যেই দেশজুড়ে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এ ছাড়া সারাদেশেই সেইপ প্রকল্পের এই মোটর ড্রাইভিং প্রশিক্ষণটির ব্যবস্থা রয়েছে। পাশাপাশি বিদেশে চাকরির সুযোগ তৈরিতে এ প্রশিক্ষণের আওতায় ইংরেজি ও আরবি ভাষা শেখানোরও উদ্যোগ নেওয়া হয়। বিনামূল্যে প্রশিক্ষণ প্রদানের পাশাপাশি প্রশিক্ষণ উপকরণ, প্রশিক্ষণ গাড়িসহ প্রশিক্ষণার্থীদের পোশাকের ব্যবস্থাও করা হয়। প্রতিদিন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে আসা-যাওয়া এবং নাশতার জন্য দেওয়া হয় ভাতা। বিআরটিএ থেকে লাইসেন্স প্রাপ্তির জন্য লাইসেন্স ফিসহ ডোপ টেস্ট ফি এবং অন্যান্য খরচও সেইপ প্রকল্প থেকে বহন করা হয়। সেই সাথে জব প্লেসমেন্ট সেলের মাধ্যমে কর্মসংস্থানের জন্যেও করা হয় সহায়তা।

গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ার বিআরটিসি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের অপারেশন ম্যানেজার জাহাঙ্গীর আলম জানান, তাদের প্রশিক্ষণ কোর্সে মোট ৮০টি ক্লাস রয়েছে। তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক উভয় দিকেই নজর দেওয়া হয়। এ ছাড়া ট্রাফিক নিয়মকানুনের ব্যাপারে সচেতন করা হয় প্রশিক্ষণার্থীদের। প্রতি ক্লাসে অংশগ্রহণের জন্য যাতায়াত ও টিফিন বাবদ ১৫০ টাকা করে বরাদ্দ রয়েছে। প্রশিক্ষণার্থীরা বিনাখরচে ড্রাইভিং শেখার পাশাপাশি এককালীন প্রায় ১২ হাজার টাকাও পাচ্ছেন। কোর্স শেষে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে সার্টিফিকেট এবং ফ্রি ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়ার সুবিধাও রয়েছে।

প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদের অনেকেই বর্তমানে দক্ষ চালক হয়ে বিভিন্ন এনজিও, উন্নয়ন সংস্থা ও কোম্পানিতে আকর্ষণীয় বেতনে চাকরি করছেন। কেউ কেউ আবার মোটর গাড়ি মেরামতের ওয়ার্কশপও দিয়েছেন।

seip

সেইপ থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে স্বাবলম্বী তানিয়া বললেন, 'স্বামী মারা যাওয়ার পর দুই সন্তানকে নিয়ে অনেক চিন্তায় ছিলাম। অর্থনৈতিক অবস্থাও ভালো ছিল না। ২০২১ সালের জানুয়ারিতে গাজীপুরের কেন্দ্রীয় প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটে প্রশিক্ষকদের আন্তরিক চেষ্টায় সেইপ- এর চার মাস মেয়াদি মোটর ড্রাইভিং উইথ বেসিক মেইনটেন্যান্স কোর্স করি। বর্তমানে আমি কেন্দ্রীয় প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটেই প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করে সংসারের খরচ চালাচ্ছি। আগের চেয়ে আমার অর্থনৈতিক অবস্থা অনেক ভালো।"

অন্যদিকে, ২০১৫ সাল থেকে ইলেক্ট্রিক্যাল ইনস্টলেশন অ্যান্ড মেইনটেন্যান্স কোর্সের মাধ্যমে দক্ষ ইলেক্ট্রিশিয়ান তৈরির জন্যেও প্রশিক্ষণ দিয়ে আসছে সেইপ প্রকল্প। লাইট ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের যেসব সেক্টরে চাকরির সুযোগ রয়েছে, তার মধ্যে ইলেক্ট্রিক্যাল ইনস্টলেশন অ্যান্ড মেইনটেন্যান্স বিভাগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণে বিষয়টির ওপর চার মাস মেয়াদি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে আসছে সেইপ। কর্মসংস্থানের চাহিদা অনুযায়ী চ্যানেল ওয়্যারিং, কচুইট ওয়্যারিং আর্থিং এবং  অ্যাটমসফেরিক লাইটিং প্রটেকশন সিস্টেম ইনস্টলেশন, সার্ভিস কানেকশন, মোটর কানেকশন সম্পাদন, ইলেক্ট্রিক মোটর ও কন্ট্রোল সিস্টেম ইনস্টল এবং মেইনটেন্যান্স, মোটর বাইন্ডিং এবং সার্ভিসিং, সোলার ইলেক্ট্রিক্যাল সিস্টেম ইনস্টল এবং ট্রাবলশু্যটিং ইত্যাদি বিষয় কোর্সে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। বর্তমানে সারা দেশেই চলছে এ প্রশিক্ষণ কার্যক্রম। তবে পিছিয়ে পড়া এলাকাগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে, যাতে এসব এলাকার আর্থসামাজিক অবস্থার আরও উন্নয়ন ঘটে।

দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণে সেইপ প্রকল্পের সাথে যৌথভাবে কাজ করে যাওয়া বাংলাদেশ ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্প মালিক সমিতি'র (বিইআইওএ) চিফ কো-অর্ডিনেটর ইঞ্জিনিয়ার মোহাঃ হাবিবুর রহমান জানান, 'লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং সেক্টরে দক্ষতার যে ঘাটতি রয়েছে, দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির মাধ্যমে সেই ঘাটতি পূরণ করে যাচ্ছে সেইপ প্রকল্প। দক্ষ কর্মীরা শিল্পের উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর পাশাপাশি পণ্যের গুণগত মান বজায় রাখতেও ভূমিকা রাখছে। এ ছাড়া পণ্যের বহুমূখীকরণেও সক্ষমতা রয়েছে এসব দক্ষ কর্মীর। সবমিলিয়ে ব্যবসার প্রসার বাড়ছে। এ ছাড়া ইলেট্রিক্যাল ইনস্টলেশন অ্যান্ড মেইনটেন্যান্স কোর্স থেকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত যুবক-যুবতীরা দক্ষ কর্মী হয়ে দেশ-বিদেশে চাকরির সুযোগ পাচ্ছেন। এক্ষেত্রে সেইপ-এর পক্ষ থেকে সবসময়ই সহায়তা করা হয়। আমাদের প্রশিক্ষণার্থীরা মূলত সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরে চাকরির সুযোগ বেশি পাচ্ছেন। অনেকেই আবার প্রশিক্ষণলব্ধ জ্ঞান কাজে লাগিয়ে নিজেদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানও দাঁড় করিয়েছেন।'