‘আমরা যদি না জাগি মা কেমনে সকাল হবে?’

এই পৃথিবীটা বড়ই জটিল এবং কঠিন। জ্ঞানীরা উপলব্ধি করিতে পারেন—হিংসায় উন্মত্ত নিত্য নিঠুর দ্বন্দ্বের ঘোর কুটিল ধরণিতে টিকিয়া থাকাটাই অনেক বড় ব্যাপার। সেই জন্য যাহারা টিকিয়া আছেন, মহান সৃষ্টিকর্তার নিকট তাহাদের শুকরিয়া জানানো উচিত। ইমান রাখা ও শুকরিয়া জানাইবার মাধ্যমে আল্লাহ তাআলার নিকট সর্বদা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ ব্যতীত কখনো আমাদের সার্বিক মঙ্গল হইবে না। যাহারা বেইমানি করে এবং অতি চালাকির আশ্রয় নেয়, তাহাদের পরিণতি ইতিহাসের পাতায় লেখা রহিয়াছে। অনেক যানবাহনের গায়ে দার্শনিক কথাবার্তা লেখা থাকে। যেমন একটি ট্রাকের গায়ে লেখা ছিল—‘এখন করিবে চালাকি, পরে বুঝিবে জ্বালা কী?’ উন্নয়নশীল বিশ্বের অবৈধ উপার্জনের মাধ্যমে আঙুল ফুলিয়া কলাগাছ হওয়া ভুঁইফোঁড়রাও চালাকি করিতে চাহে। সেই চালাকি অনেক ক্ষেত্রে হইয়া পড়ে কাকের আচরণের মতন। কাক যেমন কোনো জিনিস লুকাইবার সময় চক্ষু মুদিয়া মনে করে পৃথিবী অন্ধকার হইয়া গিয়াছে, সুতরাং পৃথিবীর কেহই আর তাহার গোপন জিনিসটি দেখিতে পাইতেছে না। এমন চালাকির বিপদ অনেক। এই জন্য প্রবাদে বলে—অতি চালাকের গলায় দড়ি।

একদিকে অন্যায়ের প্রশ্রয়, অন্যদিকে অনৈক্য—এই দুইটি বৈশিষ্ট্য একটি জাতির উন্নত হইবার পথে সবচাইতে বড় বাধা। ‘অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে তব ঘৃণা তারে তৃণ সম দহে’—কথাটি বলিয়া গিয়াছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। আর ঐক্যের অভাব ঘটিলে কী হইতে পারে—ইহা লইয়া অসংখ্য নীতিগল্প ও ধর্মীয় কাহিনি রহিয়াছে। মনে রাখিতে হইবে মহান আল্লাহ তাআলা অন্যায়ের সহিত আপস করিতে নিষেধ করিয়াছেন। আল্লাহ বলিয়াছেন, নিজের ভাগ্য নিজেকেই গড়িতে হয় এবং তাহা পরিশ্রম করিয়া আদায় করিতে হয়। যাহারা অবৈধভাবে অর্থসম্পদ সৃষ্টি করিয়াছে, সময় থাকিতে নিজেদের শুধরাইয়া লওয়া উচিত। যাহারা অনিয়ম-দুর্নীতি করিতেছেন, তাহাদের নিজেদের বিবেকের দিকে তাকাইতে হইবে। তাহাদের অন্যায়-দুর্নীতি-অনিয়মের মাফ নাই। রাষ্ট্রযন্ত্র একটি সময় আসিয়া তাহাদের ব্যাপারে ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেই। ইহার পাশাপাশি জনগণকেও সচেতন হইতে হইবে। কোথাও অনিয়ম-দুর্নীতি হইলে তাহাদের বিরুদ্ধে সচেতন নাগরিকদের রুখিয়া দাঁড়াইতে হইবে, প্রতিরোধ গড়িয়া তুলিতে হইবে। আমরা না জাগিলে অন্ধকার দূর হইবে না। এই জন্য কাজী নজরুল ইসলাম বলিয়াছেন—‘আমরা যদি না জাগি মা কেমনে সকাল হবে?’ সুতরাং একজন নাগরিক হিসাবে আমাদেরও কর্তব্য রহিয়াছে অনিয়মকারীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়িয়া তোলা। ইহাদের বিরুদ্ধে জাগরণ সৃষ্টি করা প্রয়োজন। এই জন্য আমাদের ঐক্যবদ্ধ থাকিতে হইবে।

সচেতন জনগণ যদি ‘এক’ থাকে, তাহা হইলে তাহাদের ভাগ্য লইয়া কেহ ছিনিমিনি খেলিতে পারিবে না। মনে রাখিতে হইবে, উন্নয়নকাজের প্রশ্নে কোনো রাজনীতি করা উচিত নহে। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পার হইলেও আমাদের এখনো অনেক কাজ বাকি রহিয়াছে। লুটপাট বন্ধ করা না গেলে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়নকাজ কখনই সম্পন্ন করা যাইবে না। আর ইহার জন্য প্রয়োজন সকলের ঐক্য। মহাবিশ্বের দিকে তাকাইয়া আমরা দেখিতে পাই, পুঞ্জীভূত মহাশক্তিই এই জগতের প্রতিটি স্তরে স্তরে। সুতরাং ঐক্যই হইল জগতের সবচাইতে বড় শক্তি। আমাদের ধর্মে পারস্পরিক ঐক্য, মৈত্রী ও সম্প্রীতিকে অত্যন্ত প্রশংসনীয় এবং মানবজাতির জন্য কল্যাণকর বলিয়া মনে করা হয়। ইসলামে মুমিনদের পারস্পরিক সম্পর্ক ভ্রাতৃত্বের। এই ভ্রাতৃত্ব ও ঐক্য বজায় রাখিবার ব্যাপারে মহান আল্লাহ তাআলা বলিয়াছেন, ‘নিশ্চয়ই মুমিনরা পরস্পর ভাই ভাই।’ (সুরা-৪৯ হুজরাত, আয়াত :১০) ‘এই যে তোমাদের জাতি, এই তো একই জাতি আর আমি তোমাদের পালনকর্তা, অতএব তোমরা (ঐক্যবদ্ধভাবে) আমারই ইবাদত করো।’ (সুরা-৯ তওবা, আয়াত : ৯২)। বেইমান, অবৈধ উপার্জনকারী অন্যায়কারীদের বিরুদ্ধে আমাদের ঐক্যসাধন প্রয়োজন। বিভাজন নহে, ঐক্যই উন্নয়নের সবচাইতে বড় সহায়ক।