সংকটাপন্ন ঘোষণার পরও সেন্টমার্টিনে পর্যটকদের ভিড়

পরিবেশ দূষণের মাত্রা প্রকট আকার ধারণ করেছে ৯৬ শতাংশ পর্যটকের মতে দ্বীপের সৌন্দর্য ও গুণাবলি নষ্ট হচ্ছে

আলাউদ্দিন চৌধুরী

১৯৯৯ সালে সরকার সেন্ট মার্টিন দ্বীপটিকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করে। কিন্তু এতবছর পার হয়ে গেলেও দ্বীপটির অবস্থার তেমন উন্নতি হয়নি। ৯৬ শতাংশ পর্যটক মনে করেন সাম্প্রতিক সময়ে দ্বীপের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও গুণাবলী নষ্ট হচ্ছে। অনিয়ন্ত্রিত পর্যটন এ দ্বীপের পরিবেশগত ঝুঁকির বড়ো কারণ বলে এক সমীক্ষায় উঠে এসেছে। প্রতিবেশগত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সেন্ট মার্টিন দ্বীপের জীববৈচিত্র্যের উন্নয়ন, ব্যবস্থাপনা ও সংরক্ষণ শীর্ষক চলমান প্রকল্পটির নিবিড় পরিবীক্ষণ করেছে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি)। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শতকরা ৪৮ ভাগ উত্তরদাতা মনে করেন কারেন্ট জালের ব্যবহারের কারণে প্রচুর কচ্ছপ জালে আটকা পড়ে মারা যাচ্ছে। ৪০ ভাগ উত্তরদাতা মনে করেন পর্যটকদের অনিয়ন্ত্রিত কার্যক্রমের জন্য কচ্ছপের আবাসস্থলের ক্ষতি হচ্ছে। সমুদ্রতীরে সাইকেল এবং মোটরসাইকেল চালানোর মাধ্যমে তীরের প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। রাতে সমুদ্র সৈকতে হৈহুল্লোর করা, প্লাস্টিক এবং সিগারেটের টুকরা ফেলা হচ্ছে। শতকরা ৬৬ ভাগ প্রতিবেশ সংকটাপন্ন এলাকা বিষয়ে তেমন কিছু জানেন না। শতকরা ৭১.৮ ভাগ মনে করেন দ্বীপকে সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করার পর সামগ্রিক কোনো উন্নতি হয়নি। মাত্র ২ দশমিক ৩ ভাগ মনে করেন ১৯৯৯ সালের পর দ্বীপের কিছু উন্নয়ন হয়েছে।

সেন্ট মার্টিন-নারকেল জিঞ্জিরা খ্যাত বাংলাদেশের একমাত্র প্রতিবেশগত প্রবালদ্বীপ। দেশে একমাত্র প্রবালসমৃদ্ধ এ দ্বীপে ৬৮ প্রজাতির প্রবাল আছে। এছাড়া ১৫১ প্রজাতির শৈবাল, ১৯১ প্রজাতির মোলাস্ক বা কড়ি-জাতীয় প্রাণী, ৪০ প্রজাতির কাঁকড়া, ২৩৪ প্রজাতির সামুদ্রিক মাছ, চার প্রজাতির উভচর, ২৮ প্রজাতির সরীসৃপ, ১২০ প্রজাতির পাখি, ২০ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী রয়েছে। এ ছাড়া ১৭৫ প্রজাতির উদ্ভিদ রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে দ্বীপটিতে শতকরা ৮২ ভাগের বিকল্প কোনো আয়ের উত্স নেই। দ্বীপের ৩৯ শতাংশ মানুষ অশিক্ষিত। শতকরা ২৬ ভাগ শুধু স্বাক্ষর করতে পারে। বেশিরভাগ মানুষের (৬২%) কোনো আর্থিক সঞ্চয় নেই।

সমীক্ষায় অংশ নেওয়া ৮৮.৫ ভাগ উত্তরদাতাই পরিবেশবান্ধব পর্যটন নিয়ে কিছু জানেন না। শতকরা ৪৬.৬ ভাগ উত্তরদাতা বলেছেন, প্লাস্টিক বর্জ্য উন্মুক্ত স্থানে ফেলা হয় যা পরিবেশের জন্য ভীষণ ক্ষতিকর। দ্বীপটিতে পর্যটকের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ ছাড়াও প্রকল্প কার্যক্রমে স্থানীয়দের সম্পৃক্ত করার সুপারিশ করা হয়েছে প্রতিবেদনে। সমুদ্র সৈকতে যানবাহন চলাচলের কারণে বালিয়াড়ি নষ্ট হচ্ছে এবং সামুদ্রিক কচ্ছপসহ অন্যান্য প্রাণীদের আবাসস্থলে বিরূপ প্রভাব পড়ছে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে সেন্ট মার্টিন দ্বীপটিতে পর্যটক ধারণক্ষমতা দৈনিক ১৮৩৫ জন। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে দৈনিক ৫ হাজার থেকে ৭ হাজার পর্যটক এ দ্বীপে অবস্থান করে। দ্বীপে পর্যটকের চাপে পরিবেশ দূষণের মাত্রা প্রকট আকার ধারণ করেছে। এ বিশাল পর্যটককে সেবা প্রদানের জন্য গড়ে উঠেছে অপরিকল্পিতভাবে প্রচুর দোকানপাট। বেড়েছে বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য। দ্বীপে একটি সমন্বিত বিদ্যুত্ সঞ্চালন ব্যবস্থা বিশেষ করে সৌর বিদ্যুত্ এবং সমন্বিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা চালু করার সুপারিশ করা হয়েছে।