সত্যজিৎ রায়ের সিনেমা ‘হীরক রাজার দেশে’ দেখেননি বা এর নাম শোনেননি, বয়সে একটু প্রাচীন বা মধ্যবয়সী এমন লোক খুঁজে পাওয়া মুশকিল। এটি নিছক একটি সিনেমাই নয়; রূপকের আশ্রয়মিশ্রিত এই সিনেমায় কিছু ধ্রুব সত্য ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। যারাই দেখেছেন, প্রত্যেকের মনে গেঁথে আছে সিনেমাটির দৃশ্যগুলোর কথা! ছোটবেলায় যতবার সিনেমাটি আমরা দেখেছি ততবারই মনে হতো, ‘এটা কোথায়?’ এখানে যাওয়া গেলে বেশ হতো। এই সেই পুরুলিয়ার জয়চন্ডী পাহাড়।
পাহাড়ের নিচের ছোট ছোট দোকানে সিনেমার মলিন হয়ে যাওয়া প্ল্যাকার্ড দেখেই মনে পড়ে গেল নানা দৃশ্যের কথা। ছোটবেলায় যতবার সিনেমাটা দেখেছি, ততবারই ‘হীরক রাজার দেশে’ চষে বেড়ানোর ইচ্ছে জেগেছে। হাতে ছুটি ছিল মাত্র তিন - চারদিন—তাই পরিবারের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের অপরূপ সুন্দরী পুরুলিয়ায় গিয়ে পূরণ হয়েছে সেই ইচ্ছে!
জয়চন্ডী পাহাড় ও সিনেমার স্মৃতি
প্রথমেই দেখা পাওয়া যায় পুরোনো একটি ওয়াচ টাওয়ার। ধাপ কাটা সিঁড়ি, দুপাশে বন পেরিয়ে অবশেষে পাহাড়ের মাথায় উঠলে প্রথমে বজরংবলির মন্দির এবং পরে জয়চন্ডী মাতার মন্দির। এই মন্দির থেকেই পাহাড়ের নাম জয়চন্ডী। ঝোপজঙ্গল, বড় বড় পাথরের চাঁই টপকে উঠে এসে গুপি-বাঘা দেখল, পাহাড়ের গুহায় এক মানুষ শুয়ে। তাদের দেখতে পেয়েই কাটারি হাতে তেড়ে এলো যে, উদয়ন পণ্ডিত! পুরুলিয়ার জয়চন্ডী পাহাড়েই তো তার সঙ্গে প্রথম আলাপ তাদের। পাহাড়টি দেখতে দেখতে দৃশ্যগুলো মনে পড়তে বাধ্য।
পাহাড়ের ওপরে ছাদ থেকে নিচের উপত্যকার দৃশ্য ভারি সুন্দর। স্থানীয় মানুষের ভিড়ও চোখে পড়ার মতন। যে যার মতো বসে চারপাশের সৌন্দর্য উপভোগ করছে। পাতা ঝরা গাছেরা সেখানে মনে করিয়ে দিতে থাকল অতীতের ছবি। জয়চন্ডী পাহাড় থেকে নেমে আমরা গেলাম গড় পঞ্চকোট-এর দিকে।
ইতিহাসের আরেক পাতায় ‘গড় পঞ্চকোট’
এ যেন ইতিহাসের এক পাতা থেকে আরেক পাতায় প্রত্যাবর্তন। অষ্টাদশ শতাব্দীর গোড়া থেকে পঞ্চকোটের দুর্গ পরিত্যক্ত। পাহাড়ের ওপর বিশাল আয়তন দুর্গের অতি সামান্য অংশের অস্তিত্ব এখনো বিদ্যমান। পঞ্চকোট পাহাড়ের নিচের অবস্থাও তাই। পঞ্চকোট দুর্গের পরিত্যক্ত হওয়ার নানা কাহিনি কথিত আছে।
চুয়ান্নতম মল্লরাজ দ্বিতীয় রঘুনাথ সিংহের রাজত্বকালে (১৭০২-১৭১২) তার পরিবারের সমস্ত সদস্যকে এক রহস্যজনিত শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে গড়পঞ্চকোট থেকে বিতাড়িত করা হয়েছিল। রাজা চিত্র সেনের কাহিনিও জনপ্রিয়। তবে গড় পঞ্চকোটের বর্গি আক্রমণের ঘটনা সম্পর্কে যে জনশ্রুতি রয়েছে সেটি কল্পনাপ্রসূত কাহিনি ছাড়া আর কিছু নয়। বর্তমানে জায়গাটিতে একটি চার্টের মাধ্যমে ইতিহাসের সম্যক ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করেছে ভারত সরকার।
আমরা প্রথমেই গিয়েছিলাম পঞ্চকোট রাজাদের রাস মন্দির। যেখানে এখনো রাধা-কৃষ্ণের মূর্তি রয়েছে, রাস পূর্ণিমায় পূজাও হয় সেখানে। তারপর দেখে নিলাম জঙ্গলে ঘেরা ইতস্তত ছড়িয়ে থাকা পরিত্যক্ত গড়গুলো—যা বহন করে চলেছে ইতিহাসের সাক্ষ্য।
রানি ভবনে গিয়ে দেখা যায় পরিত্যক্ত কুয়ো ও কিছু মূর্তি। গড়গুলো দেখা হয়ে গেলে আমরা স্থানীয় এক দোকানে পুরুলিয়ার আঞ্চলিক কিছু খাবার দিয়ে দুপুরের আহার সারলাম। ঘুরে এলাম জঙ্গল থেকে। এই জঙ্গলের পথ ধরেই চড়াই-উতরাই পেরিয়ে ওপরে উঠলে আসল গড়গুলো দেখা যায়। পাহাড়ের মাথায় উঠতে গেলে ফিরতে সন্ধ্যা হয়ে যাবে, অগত্যা জঙ্গলে ঘেরা গড়কে পেছনে ফেলে আমরা হোটেলের পথ ধরলাম। তারা রচনা করুক আরো ইতিহাস। ইতিহাসের পৃষ্ঠা বাড়তে থাকুক আর সমৃদ্ধ করুক আমাদের।