নির্বাচনি আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ ও প্রতিকার

বাংলাদেশে ‘সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণ বিধিমালা, ২০০৮’ নামের বিধিমালাটি গেজেট আকারে প্রকাশিত হয় ২০০৮ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর। আমাদের বিশ্বাস, এই বিধিমালাটি যথাযথভাবে প্রয়োগ করা হইলে জাতীয় সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ না হইয়া পারে না; কিন্তু দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই বিধিমালা কতটা বাস্তবায়িত হইতেছে তাহা প্রশ্নসাপেক্ষ। ইতিমধ্যে নির্বাচনি প্রচারণাকে কেন্দ্র করিয়া দেশের বিভিন্ন এলাকায় অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ, হামলা-পালটাহামলা, নির্বাচনি ক্যাম্প ভাঙচুর ও ক্যাম্পে আগুন দেওয়ার পাশাপাশি ওয়ার্ডে একাধিক ক্যাম্প স্থাপন, ক্যাম্প স্থাপনের জন্য সড়ক-ফুটপাতের জায়গা ব্যবহার, রাত ৮টার পরও মাইকিং, সড়কে তোরণ নির্মাণ, রঙিন পোস্টার লাগানো ইত্যাদি অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া যাইতেছে। যেন আচরণবিধি ভঙ্গে একধরনের প্রতিযোগিতা চলিতেছে। এমনকি আচরণবিধি লঙ্ঘন করিয়া সরকারি চাকুরিজীবী যেমন—শিক্ষক, পুলিশ এমনকি প্রশাসনিক কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নির্বাচনি প্রচার-প্রচারণায় সম্পৃক্ত করা হইতেছে। বিশেষ করিয়া নারায়ণগঞ্জ, সিরাজগঞ্জ, পাবনাসহ বিভিন্ন এলাকায় উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা, শিক্ষা কর্মকর্তা প্রমুখকে যেভাবে নির্বাচনি প্রচারণায় জড়ানো হইতেছে বা তাহারা স্বেচ্ছায় জড়াইতেছেন, তাহা অপ্রত্যাশিত। তাহারা নিজ অধীনস্থ লোকদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার জন্য চাপ দিতেছেন। এমনকি চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে একজন স্বাস্থ্য সহকারী কীভাবে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে নির্বাচনে দাঁড়াইলেন, তাহা লইয়াও প্রশ্ন উঠিয়াছে।

নির্বাচনি আচরণবিধি লঙ্ঘনে নির্বাচন কমিশন একেবারে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করিতেছে না তাহা নহে; কিন্তু তাহার পরও কেন আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনা বাড়িয়া চলিয়াছে তাহাই মূল প্রশ্ন। তাহার অর্থ ব্যবস্থা গ্রহণ পর্যাপ্ত নহে। আচরণ বিধিমালার ১১(ক) অনুচ্ছেদে স্পষ্টভাবে বলা হইয়াছে, ‘নির্বাচনি প্রচারণাকালে ব্যক্তিগত চরিত্র হনন করিয়া বক্তব্য প্রদান বা কোনো ধরনের তিক্ত বা উসকানিমূলক কিংবা লিঙ্গ, সাম্প্রদায়িকতা বা ধর্মানুভূতিতে আঘাত লাগে—এমন কোনো বক্তব্য প্রদান করিতে পারিবেন না’। কোনো নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল কিংবা উহার মনোনীত প্রার্থী বা স্বতন্ত্র প্রার্থী কিংবা তাহাদের পক্ষে অন্য কোনো ব্যক্তিও তাহা করিতে পারিবেন না; কিন্তু প্রতিদিনই গণমাধ্যমে যেই সকল বক্তব্য ছাপা হইতেছে তাহা যেমন বিস্ময়কর, তেমনি উদ্বেগজনক। বিধিমালার ৭ নম্বর ধারায় পোস্টার সাদা-কালো রঙের হইতে হইবে এবং উহার আয়তন ২৩"´১৮"-এর অধিক হইতে পারিবে না বলিয়া বলা হইয়াছে। ১০ নম্বর ধারা অনুযায়ী নির্বাচনি প্রচারণায় কোনো গেট বা তোরণ নির্মাণ করা যাইবে না এবং কোনো সড়ক কিংবা জনগণের চলাচল ও সাধারণ ব্যবহারের জন্য নির্ধারিত স্থানে নির্বাচনি ক্যাম্প স্থাপন করা যাইবে না; কিন্তু তোরণ নির্মাণ যেমন করা হইতেছে, তেমনি ফুটপাত দখল করিয়া ক্যাম্প স্থাপনের খবরও আসিতেছে। ১৩ নম্বর ধারায় দুপুর দুই ঘটিকা হইতে রাত্রি আট ঘটিকার মধ্যে প্রচারণা সীমাবদ্ধ রাখিবার কথা বলা হইয়াছে। ইহা ছাড়া ১৪(২) ধারায় বলা হইয়াছে, ‘...কোনো ব্যক্তি নির্বাচনি কাজে সরকারি প্রচারযন্ত্রের ব্যবহার, সরকারি কর্মকর্তা বা কর্মচারীগণকে ব্যবহার বা সরকারি যানবাহন ব্যবহার করিতে পারিবেন না এবং রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা ভোগ বা ব্যবহার করিতে পারিবেন না’।

নির্বাচনি আচরণবিধি লঙ্ঘন বন্ধ না হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ হইল, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নিজ উদ্যোগে সরেজমিনে গিয়া পরিস্থিতি বিবেচনাপূর্বক কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করিতেছেন না। তাহারা অভিযোগ দায়ের কিংবা পত্রপত্রিকা বা টেলিভিশনে প্রকাশিত বা প্রচারিত খবরের উপর নির্ভর করিতেছেন। কোথায় অভিযোগ করিতে হইবে—এই সম্পর্কেও অনেকে জানেন না। প্রথমত নির্বাচনি আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠিলে তাহা বিধিমালার ১৭(১) ধারা অনুযায়ী সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি বা নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলকে প্রতিকার চাহিয়া নির্বাচনি তদন্ত কমিটি বা কমিশন বরাবরে দরখাস্ত পেশ করিতে হইবে। রিটার্নিং অফিসারের অধীনে পরিচালিত তদন্ত বা অনুসন্ধান কমিটিতে আছেন যুগ্ম-জেলা জজ বা সিনিয়র সহকারী জজ। ইহা ছাড়া নির্বাচনপূর্ব অনিয়ম দৃষ্টিগোচর হইলে কমিশন তাত্ক্ষণিকভাবে রিটার্নিং অফিসার বা প্রিজাইডিং অফিসার অথবা আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে বিধিমোতাবেক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নির্দেশ দিতে পারেন।

অতএব, জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করিয়া নির্বাচনি আচরণবিধি লঙ্ঘনের যেই সকল অভিযোগ পাওয়া যাইতেছে তাহা কমিশন বা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দৃষ্টিগোচরে আনিতে রাজনৈতিক দল, প্রার্থী ও সচেতন নাগরিকদের উদ্যোগী হইতে হইবে। সকলের আন্তরিক প্রচেষ্টা ছাড়া নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ করা সম্ভব নহে।