নতুন শিক্ষাক্রম নিয়ে তর্কবিতর্ক

২০১০ সালে চালু হওয়া ‘সৃজনশীল’ পদ্ধতি বাদ নিয়ে ২০২৩ শিক্ষাবর্ষে নতুন শিক্ষাক্রম চালু করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। দীর্ঘদিন ধরে চালু থাকা পরীক্ষা পদ্ধতি বাদ দিয়ে ধারাবাহিক মূল্যায়নে জোর দেওয়া হয়। উন্নত বিশ্বের আদলে এই পড়াশোনা বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ‘অস্বাভবিক ও অপ্রয়োজনীয়’ উল্লেখ করে শুরু থেকেই সমালোচনা করেন অভিভাবকরা। নতুন এই পদ্ধতির বাতিল/ সংশোধনের দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন।

এক পর্যায়ে নতুন কারিকুলামের সমালোচনাকারীদের বিরুদ্ধে মামলা করে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড। চার জন অভিভাবককে গ্রেফতারও করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। সমালোচনাকারীদের বিরুদ্ধে সরকারের এই কঠোর আচরণে প্রকাশ্যে সমালোচনা না করলেও তীব্র ক্ষোভ বয়ে বেড়াচ্ছেন অভিভাবকরা।

নতুন শিক্ষাক্রম দশম শ্রেণির আগের সব পাবলিক পরীক্ষা তুলে দেওয়া হয়েছে। নবম শ্রেণিতে গিয়ে কোনো বিভাগ পছন্দের সুযোগ থাকবে না। তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত কোনো পরীক্ষা নেই। ৪র্থ থেকে ৮ম শ্রেণি পর্যন্ত শিখনকালীন মূল্যায়ন হবে ৬০ শতাংশ আর সামষ্টিক মূল্যায়ন হবে ৪০ শতাংশ। নবম ও দশম শ্রেণিতে ৫০ শতাংশ শিখনকালীন, বাকি ৫০ শতাংশ সামষ্টিক মূল্যায়ন। একাদশ ও দ্বাদশে গিয়ে শিখনকালীন মূল্যায়ন হবে ৩০ শতাংশ আর সামষ্টিক মূল্যায়ন হবে ৭০ শতাংশ। তবে প্রায়োগিক বিষয় শত ভাগই শিখনকালীন মূল্যায়ন।

তবে নতুন কারিকুলামের বইয়ে নানা অসংগতিও দেখা দেয়। অপ্রয়োজনীয় ছবি ও লেখা যুক্ত করা হয়। এ বিষয় নিয়ে নানা সমালোচনা হলে এক পর্যায়ে ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণির প্রণীত ইতিহাস ও সামাজিক বিজ্ঞান ‘অনুসন্ধানী পাঠ’ পাঠদান থেকে প্রত্যাহার করা হয়। এর বাইরে ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণির প্রণীত ইতিহাস ও সামাজিক বিজ্ঞান বইয়ের অনুশীলনী পাঠ ও ষষ্ঠ শ্রেণির বিজ্ঞান বইয়ে সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবে অন্য বই ও শিক্ষাক্রম অব্যাহত রাখার ঘোষণা দেয় মন্ত্রণালয়।

অভিভাবকরা বলেছেন, এই শিক্ষাক্রমে কোনো পরীক্ষা না থাকায় শিক্ষার্থী বই থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। বাসায় কোনো পড়াশোনাই করছে না। এছাড়া শিক্ষকদের ওপর বেশি নম্বর থাকায় প্রাইভেট টিউশনি আরো বেড়ে যাবে। প্রভাবশালীরা এগিয়ে যাবে। দরিদ্ররা পিছিয়ে পড়বে। ২০২৩ সাল থেকে প্রথম, ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণিতে এ শিক্ষাক্রম চালু করা হয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৪ শিক্ষাবর্ষ থেকে এই পদ্ধতি ২য়, ৩য়, ৮ম ও ৯ম এবং ২০২৫ সালে এটি ৪র্থ, ৫ম ও ১০ম শ্রেণিতে চালু হবে। পর্যায়ক্রমে ২০২৬ ও ২০২৭ সালে এই পদ্ধতি চালু হবে উচ্চমাধ্যমিকে। হাতেগোনা কয়েক জন ব্যক্তির চিন্তাধারা ৫ কোটি শিক্ষার্থীর ওপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে, এমনটি জানিয়ে আসছেন অভিভাবকরা।

শিক্ষাক্রম নিয়ে এত আপত্তি থাকলেও শিক্ষা মন্ত্রণালয় বলেছে ভিন্ন কথা। শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি বিভিন্ন সময়ে অভিভাবকদের আন্দোলনের পেছনে কোচিং ও নোট গাইড মালিকদের সংশ্লিষ্টতা আছে বলে বক্তব্য দিয়েছেন। মন্ত্রী বোঝাতে চেয়েছেন, অভিভাবকদের বিভিন্ন সুবিধা দিয়ে কোচিং ও নোট-গাইডের মালিকরা আন্দোলনের মাঠে নামিয়েছেন। যদিও নোট-গাইড ও কোচিং মালিকরা মন্ত্রীর এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন। অভিভাবকরাও বলেছেন, দেশের স্বার্থেই নিজ সন্তানদের ভবিষ্যতের স্বার্থেই আমরা এই কারিকুলামের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছি।

মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে আন্দোলন করা অভিভাবকদের বিরুদ্ধে মামলা করে এনসিটিবি। এই মামলায় কয়েক জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত ৪০ জনকে আসামি করা হয়। মামলার আলোকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী চার জন অভিভাবককে গ্রেফতারও করে। নতুন শিক্ষাক্রম নিয়ে মতপ্রকাশ বা বিরুদ্ধমত দেওয়ার কারণে শিক্ষক-অভিভাক-নাগরিকদের গ্রেফতারের তীব্র নিন্দা জানিয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এক উন্মুক্ত আলোচনাসভার আয়োজন করেছিল বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সংগঠন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক। কিন্তু শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় এই সেমিনার করতে দেওয়া হয়নি।

২২টি বইয়ে ৪২১টি ভুল : নতুন কারিকুলামের ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণির বইয়ে অসংখ্য ভুল ধরা পড়ে। প্রায় চার মাস পর এপ্রিলের শেষে এসে ২২টি বইয়ে ৪২১টি ভুলভ্রান্তির সত্যতা পায় এনসিটিবি।

আলোচনায় আইডিয়াল স্কুল ও গভর্নিং বডি : ঢাকার মতিঝিলের আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের একাদশ শ্রেণির এক ছাত্রীকে বিয়ে করে আলোচনায় আসেন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির পরিচালনা পর্ষদের সদস্য খন্দকার মুশতাক আহমেদ। এটি উচ্চ আদালত পর্যন্ত গড়ায়। এছাড়া পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠানটির গভর্নিং বডির বিরুদ্ধে কোটি কোটি টাকা অনিয়মের প্রমাণ পায়।

এমপিওভুক্তির দাবিতে শিক্ষকরা রাজপথে : এমপিওভুক্তির দাবিতে নন-এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা জুন থেকে আন্দোলন শুরু করেন। রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে শিক্ষক সংগঠন বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতির (বিটিএ) সদস্যরা অবস্থান নেন। তবে সরকারের আশ্বাসে আন্দোলন স্থগিত করেন শিক্ষকরা।