ইংরেজি নববর্ষ উদ্যপানকে ম্লান করিয়া নূতন বত্সরের প্রথম দিনে জাপানের ইশিকাওয়ায় আঘাত হানিল এক শক্তিশালী ভূমিকম্প। এক দিনেই ১৫৫টি ভূমিকম্প আঘাত হানিয়াছে দেশটিতে। যদিও অধিকাংশ ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল রিখটার স্কেলে ৩ মাত্রার অধিক। তবে দেশটির উত্তর-মধ্যাঞ্চলীয় এলাকায় আঘাত হানা সবচাইতে শক্তিশালী ভূমিকম্পটি ছিল রিখটার স্কেলে ৭ দশমিক ৬ মাত্রার। এই ভূমিকম্পের জেরে দেশটিতে আঘাত হানে সুনামিও। গতকাল পর্যন্ত পাওয়া সর্বশেষ খবর অনুযায়ী ইহাতে নিহত হইয়াছে ৬২ জন এবং আহত হইয়াছে তিন শতাধিক। ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনো বহু মানুষ চাপা পড়িয়া রহিয়াছে বিধায় হতাহতের সংখ্যা আরো বাড়িতে পারে। আমরা ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত বন্ধুপ্রতিম দেশ জাপানের নাগরিকদের প্রতি জানাই গভীর সমবেদনা।
জাপান পৃথিবীর সবচাইতে ভূমিকম্পপ্রবণ দেশ। দেশটিতে প্রতি বত্সর গড়ে ২ হাজার ভূমিকম্প হয়। লাইভ সায়েন্সের তথ্যানুযায়ী, জাপান ‘প্যাসিফিক রিং অব ফায়ার’ বরাবর অবস্থিত, যাহা বিশ্বের ‘সবচাইতে সক্রিয়’ ভূমিকম্প বেল্ট। এই রিং অব ফায়ার হইল প্রশান্ত মহাসাগরের ধারে ‘ঘোড়ার নালের’ আকৃতির একটি বড় পথ, যাহা সক্রিয় আগ্নেয়গিরি এবং ভূমিকম্পের ক্রিয়াকলাপ বা ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকা হিসাবে চিহ্নিত। ন্যাশনাল জিওগ্রাফির তথ্য অনুযায়ী, পৃথিবীর প্রায় ৯০ শতাংশ ভূমিকম্প প্যাসিফিক রিং অব ফায়ারে সংঘটিত হয়। ফলে জাপানে ভূমিকম্পের বিষয়টি অনেকটা নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। সেই অনুযায়ী দেশটিতে ভূমিকম্প সহনশীল ঘরবাড়ি নির্মাণ করা হয়। তাহাদের এই সম্পর্কিত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাও উন্নত। ফলে শক্তিশালী ভূমিকম্প হইলেও দেশটিতে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ তুলনামূলক কম। উল্লেখ্য, গত বত্সর ৬ ফেব্রুয়ারি ৭ দশমিক ৮ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্পে কাঁপিয়া উঠে তুরস্কের দক্ষিণাঞ্চল ও উত্তর-পশ্চিম সিরিয়া। ইহাতে অর্ধ লক্ষাধিক মানুষ নিহত হয়। কেবল তুরস্কে ১ লক্ষ ৭৩ হাজার ভবন ধসিয়া পড়ে এবং মোট ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় ১০ হাজার কোটি ডলারেরও অধিক। সেই সময় উদ্ধার তত্পরতায় অন্যান্য দেশের পাশাপাশি বাংলাদেশও অংশগ্রহণ করে; কিন্তু বাংলাদেশও ভূমিকম্পের দিক হইতে একটি ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হওয়া সত্ত্বেও আমাদের ভূমিকম্পের দুর্যোগ মোকাবিলায় পূর্বপ্রস্তুতি আশানুরূপ নহে।
বিশেষজ্ঞরা বলিতেছেন, বাংলাদেশের ১৩টি এলাকা ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে রহিয়াছে। সবচাইতে প্রচণ্ড ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে রহিয়াছে পার্বত্য চট্টগ্রামের তিনটি জেলা ও সিলেটের জৈন্তাপুর এলাকা। সকল এলাকাই ঢাকা হইতে কমপক্ষে ১০০ কিলোমিটার দূরে; কিন্তু সেইখানে ৭ হইতে ৮ মাত্রার ভূমিকম্প হইলে তাহা ঢাকায় বড় ধরনের বিপর্যয় তৈরি করিতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েক জন শিক্ষকের গবেষণায় এই সকল তথ্য উঠিয়া আসিয়াছে। ঢাকার সম্প্রসারিত বা নতুন নতুন আবাসিক এলাকার মাটি নরম ও দুর্বল। আবার ঢাকার ভবনগুলোর অধিকাংশই ইমারত নির্মাণ বিধিমালা এবং ভূমিরূপ মানিয়া নির্মাণ করা হয় নাই। ফলে ভূমিকম্পে যেই হেতু মানুষের মৃত্যুর ৯০ শতাংশই হয় ভবনধসে, তাই বড় ভূমিকম্প বাংলাদেশে হইলে উদ্ধারকাজ পরিচালনা করাই হইবে সবচাইতে বড় চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের হিসাবে, ঢাকা শহরে মোট ভবন আছে ২১ লাখ। ইহার মধ্যে ৬ লাখ ভবন ছয়তলা বা তাহার চাইতে উঁচু। এই সকল ভবন রেট্রোফিটিং বা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা লইয়া ঝুঁকি কমানো যায়।
অতএব, জাপান ও তুরস্কের ভূমিকম্প হইতে আমাদের শিক্ষা লইতে হইবে। ভূমিকম্প মোকাবিলার জন্য ন্যাশনাল ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সরকারের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বেসরকারি সংস্থার সমন্বয়ে দুর্যোগের পূর্বে ও পরে নানা ধরনের পদক্ষেপ লইতে হইবে। এই জন্য প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবক সর্বদা প্রস্তুত রাখা প্রয়োজন। ইহা ছাড়া বড় দুর্যোগ হইলে আন্তর্জাতিক সাহায্য-সহযোগিতা আসিবার সুবিধার্থে স্থানীয় ইমার্জেন্সি ম্যানেজমেন্ট কমিটি গঠন করা দরকার। ভূমিকম্পের আভাস ও ইহার পরবর্তী দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার উন্নতি সাধনেও আমাদের দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন। জাপান আমাদের উন্নয়ন সহযোগী দেশ। বিভিন্ন প্রকল্পে তাহাদের বিনিয়োগে আমরা উপকৃত। অনুরূপভাবে এইরূপ দুর্যোগ মোকাবিলার ক্ষেত্রেও আমরা তাহাদের নিকট পরামর্শ ও আর্থিক সহযোগিতা গ্রহণ করিতে পারি।