সুষম শিল্পায়ন ও উন্নয়ন

চাকরি ও কর্মসূত্রে আমার বিশ্বের অনেক দেশ ভ্রমণ করার সুযোগ হয়েছে। সেই সময় সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর উন্নয়ন প্রচেষ্টা ও কৌশল সম্পর্কে ধারণা নেওয়ার চেষ্টা করেছি। এতে আমার প্রতীতি জন্মেছে যে, সুষম শিল্পায়ন ছাড়া কোনো দেশ দ্রুত ও টেকসই উন্নয়ন অর্জন করতে পারে না। বিশ্বে সম্ভবত একটি দেশও নেই, যারা শিল্পকে গুরুত্ব না দিয়ে দ্রুত উন্নয়ন অর্জন করতে সমর্থ হয়েছে। ম্যালথাসের জনসংখ্যাতত্ত্বে বলা হয়েছে, জনসংখ্যা ও শিল্প উত্পাদন বাড়ে জ্যামিতিক হারে; অর্থাত্ ১, ২, ৪, ৮, ১৬ আর কৃষি উত্পাদন বৃদ্ধি পায় গাণিতিক হারে; অর্থাত্ ১, ২, ৩, ৪, ৫ এইভাবে ক্রমান্বয়ে। তাই বর্ধিত জনসংখ্যার খাদ্য এবং অন্যান্য মৌলিক চাহিদা পূরণের জন্য কৃষির চেয়ে শিল্পেই বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। কোনো দেশ যদি শিল্প উত্পাদনে স্বনির্ভরতা অর্জন করতে পারে, তাহলে তারা দেশের মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্যচাহিদা আমদানির মাধ্যমেও পূরণ করতে পারবে। তাই প্রতিটি দেশকেই উন্নয়নের একটি পর্যায় পর্যন্ত শিল্পের ওপর বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। শিল্পের ওপর গুরুত্ব প্রদানের ক্ষেত্রে কোন ধরনের শিল্পকে বেছে নিতে হবে, তা দেশটির আর্থসামাজিক অবস্থাই বলে দেবে। যে দেশে মানুষের হাতে বিনিয়োগযোগ্য উদ্বৃত্ত পুঁজি ও শ্রমশক্তি বেশি থাকবে, সেই দেশের উদ্যোক্তাগণ বৃহত্ শিল্প স্থাপনের প্রতি বেশি জোর দেবে; আর যে দেশে বিনিয়োগযোগ্য উদ্বৃত্ত পুঁজির পরিমাণ কম, তারা ক্ষুদ্র শিল্প স্থাপনের মাধ্যমে তাদের উন্নয়নযাত্রা শুরু করবে। বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশ, যেখানে উদ্বৃত্ত পুঁজির পরিমাণ কম, সেখানে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (SME) স্থাপনের প্রতিই বেশি জোর দিতে হবে। অবশ্য যাদের উদ্বৃত্ত পুঁজি আছে, তারা বৃহত্ শিল্প স্থাপন করতে পারেন। যারা ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প স্থাপন করবেন, তারা অভিজ্ঞতা অর্জনের মাধ্যমে বৃহত্ শিল্প স্থাপনের প্রতি মনোযোগী হবেন।

ভৌগোলিক কারণেও বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। অধিকাংশ বৃহৎ শিল্পের জন্য কাঁচামাল বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়, অথচ ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের কাঁচামাল স্থানীয়ভাবেই সংগ্রহ করা সম্ভব। ফলে বৃহত্ শিল্পের তুলনায় ক্ষুদ্র শিল্পের জাতীয় অর্থনীতিতে মূল্য সংযোজনের হার বেশি। আমাদের এমন সব শিল্প স্থাপনের প্রতিই গুরুত্ব দিতে হবে, যা স্থানীয় কাঁচামালনির্ভর এবং জাতীয় অর্থনীতিতে অধিক হারে মূল্য সংযোজন করে।

আমি শিল্পের সঙ্গে যুক্ত আছি দীর্ঘদিন হলো। এ বিষয়ে দেশ-বিদেশে শিক্ষা গ্রহণ করেছি। আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে মনে হয়েছে, আমাদের দেশে শিল্পায়নের প্রভূত সম্ভাবনা রয়েছে। শিল্পায়ন ত্বরান্বিত করার জন্য যেসব উপকরণ থাকা দরকার, তার প্রায় সবই আমাদের দেশে বিদ্যমান রয়েছে। তার পরও শিল্পায়নের গতি ত্বরান্বিত হচ্ছে না। শিল্পায়ন হচ্ছে অত্যন্ত মন্থর গতিতে। ব্যক্তিমালিকানায় কিছু শিল্প স্থাপিত হলেও সরকারি খাতে শিল্পায়ন তেমন একটা হচ্ছে না। শুধু কিছু কিছু বিদ্যমান শিল্পের বিএমআরই করা হচ্ছে মাত্র। রাষ্ট্রীয় মালিকানায় স্থাপিত বেশির ভাগ শিল্পকারখানা এখন জরাজীর্ণ হয়ে রয়েছে। কোনো কোনো শিল্পকারখানায় উত্পাদন থেমে গেছে। এসব বন্ধ বা জরাজীর্ণ শিল্পকে ব্যক্তিমালিকানায় হস্তান্তর করা যেতে পারে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ব্যক্তিমালিকানায় তৈরি পোশাকশিল্প বিকশিত হয়েছে। তবে এই শিল্পের প্রধান অন্তরায় বা সীমাবদ্ধতা হচ্ছে, জাতীয় অর্থনীতিতে এই শিল্পের মূল্য সংযোজনের হার কম। বর্তমানে তৈরি পোশাক (নিট) শিল্পের মূল্য সংযোজনের হার ৬৮ শতাংশের মতো; অর্থাত্ তৈরি পোশাকশিল্প (ওভেন) থেকে যে রপ্তানি আয় হয়, তার ৩২ শতাংশের মতোই কাঁচামাল, ক্যাপিটাল মেশিনারিজ এবং মধ্যবর্তী পণ্য আমদানিতে চলে যায়। তৈরি পোশাক খাত থেকে বর্তমানে প্রায় ৪৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় হচ্ছে প্রতি বছর। কিন্তু এর একটি বড় অংশই কাঁচামাল, ক্যাপিটাল মেশিনারিজ ও মধ্যবর্তী পণ্য আমদানিতে চলে যাচ্ছে। জাতীয় অর্থনীতিতে মূল্য সংযোজনের বিচারে পাট ও পাটজাত পণ্য, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য বেশি সফল। কারণ এই শিল্পের কাঁচামাল স্থানীয়ভাবেই জোগান দেওয়া সম্ভব। ফলে রপ্তানি আয়ের প্রায় পুরোটাই জাতীয় অর্থনীতিতে মূল্য সংযোজন করে। ওষুধ রপ্তানিতেও বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে।

একই কথা বলা যেতে পারে জনশক্তি রপ্তানির ক্ষেত্রে। জনশক্তি রপ্তানি আয়ের প্রায় পুরোটাই জাতীয় অর্থনীতিতে মূল্য সংযোজন করে। উপরন্তু, প্রায় দেড় কোটি মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হচ্ছে এই খাতে। এই দেড় কোটি মানুষের  অধিকাংশই অদক্ষ শ্রমিক; তারা যদি দেশে থাকতেন, তাহলে চাকরির বাজারের অবস্থা কেমন হতো, তা ভাবলেই গা শিউরে ওঠে।

আমাদের দেশের শিল্পায়নের গতি তুলনামূলকভাবে মন্থর হওয়ার জন্য বেশ কিছু কারণ দায়ী। একটি শিল্পপ্রকল্প বিনিয়োগ বোর্ডে নিবন্ধিত হওয়ার পর অনেক সরকারি অফিসে যেতে হয়। প্রতিটি অফিসেই অনুমোদনদানের ক্ষেত্রে অহেতুক সময়ক্ষেপণ করা হয়; ফলে যে প্রকল্পটি ছয় মাসের মধ্যে উত্পাদন শুরু হওয়ার কথা, তার উত্পাদন শুরু করতে দুই বছর থেকে আড়াই বছর লেগে যায়। এই সময়ের মধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারের অবস্থা পরিবর্তিত হয়ে যেতে পারে।

আমাদের দেশে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির অভাব রয়েছে। কোনো শিল্পপ্রস্তাব দাখিলের পর নির্ধারিত সময়ে গ্যাস ও বিদ্যুতের সংযোগ পাওয়া যায় না। এটা সবাই  বোঝেন যে, গ্যাস ও বিদ্যুতের সংযোগ না থাকলে কোনো প্রকল্প উত্পাদন শুরু করতে পারে না। একই সঙ্গে রয়েছে শিল্পপ্রকল্প স্থাপনের মতো উপযুক্ত জমির অভাব। অনেকেই উপযুক্ত ও পর্যাপ্ত পরিমাণ জমি সংগ্রহ না করতে পেরে শিল্পকারখানা স্থাপন করতে পারছেন না। বেশ কয়েক বছর আগে দুই জন জাপানি উদ্যোক্তা বাংলাদেশে শিল্প স্থাপনের জন্য এসেছিলেন; কিন্তু উপযুক্ত জমি না পাওয়ায় তারা স্বদেশে ফিরে যেতে বাধ্য হন। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন স্থানে ১০০টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপিত হচ্ছে। এগুলো দেশের শিল্পায়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে। শিল্প স্থাপনের ক্ষেত্রে আমাদের পরিকল্পিতভাবে উদ্যোগ নিতে হবে। বিচ্ছিন্নভাবে শিল্প স্থাপনের পরিবর্তে শিল্পের স্থানীয়করণ করা যেতে পারে। যে এলাকায় যে শিল্প স্থাপনের সম্ভাবনা বেশি, সেখানে সেই শিল্প স্থাপন করা যেতে পারে। যে ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপিত হচ্ছে, সেই সব অঞ্চলে যেসব বিদেশি উদ্যোক্তা তাদের উদ্বৃত্ত পুঁজি নিয়ে আসবেন, তারা দক্ষ ও প্রশিক্ষিত শ্রমিক কোথায় পাবেন, সেটাও আমাদের ভাবতে হবে। কারণ তারা উদ্বৃত্ত পুঁজি নিয়ে আসবেন, কিন্তু শ্রমিক তো স্থানীয়ভাবেই জোগান দিতে হবে। আমরা কি সে জন্য প্রস্তুত আছি? আমরা কথায় কথায় বলে থাকি, বাংলাদেশে সস্তায় বিপুল পরিমাণ শ্রমিকের নিশ্চিত জোগান আছে। কিন্তু আমরা কি একবারও ভেবে দেখি, আমাদের দেশে সস্তায় কেন শ্রমিক পাওয়া যায়? আমাদের দেশে শ্রমিকেরা অদক্ষ ও অপ্রশিক্ষিত। অদক্ষ ও অপ্রশিক্ষিত শ্রমিকের মজুরি কমই হয়। এই অদক্ষ ও অপ্রশিক্ষিত শ্রমিক নিয়ে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা যাবে না।

শিল্পকারখানা স্থাপনের পাশাপাশি আমাদের দক্ষ ও প্রশিক্ষিত জনশক্তি গড়ে তোলার জন্য উদ্যোগ নিতে হবে। যেসব বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপিত হচ্ছে, তার আশপাশে দক্ষ শ্রমশক্তি গড়ে তোলার জন্য সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউশন গড়ে তোলা যেতে পারে। আমাদের মনে রাখতে হবে, দক্ষ ও উপযুক্তভাবে প্রশিক্ষিত জনশক্তি একটি দেশের শ্রেষ্ঠ সম্পদ। আর অদক্ষ ও অপ্রশিক্ষিত লোকবল যে কোনো দেশের জন্য বিরাট দায়।

বাংলাদেশ ইতিমধ্যে বিশ্বব্যাংকের রেটিংয়ে নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়েছে। ২০৩১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হবে। ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ উন্নত দেশের তালিকায় উত্তীর্ণ হওয়ার জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। জাতিসংঘের সহযোগী সংস্থা কর্তৃক বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশের প্রাথমিক তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। ২০২৬ সালের মধ্যে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশের চূড়ান্ত তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হবে।

এসব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন এবং ধরে রাখার জন্য আমাদের দ্রুত শিল্পায়নের প্রতি গুরুত্বারোপ করতে হবে। শুধু কৃষির ওপর জোর দিয়ে এসব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা যাবে না। উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের চেয়ে তা ধরে রাখাটা আরো কঠিন। বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশের চূড়ান্ত তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পর আন্তর্জাতিক বাজারে যেসব বিশেষ সুবিধা এত দিন পাচ্ছিল, তা হারাতে পারে; সেই অবস্থায় আমাদের উন্মুক্ত প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হতে হবে। বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বাংলাদেশ যে জিএসপি-সুবিধা এত দিন পাচ্ছিল, তা ২০২৯ সালের পর বন্ধ হয়ে যেতে পারে। সেই অবস্থায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে তৈরি পোশাক শিল্পজাত পণ্য রপ্তানি অনেকটাই কমে যেতে পারে। সম্প্রতি বাংলাদেশ চীনকে অতিক্রম করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে শীর্ষস্থানীয় তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক দেশের মর্যাদা লাভ করেছে। এই অবস্থান আর ধরে রাখতে পারবে না। একই সঙ্গে প্রবাসী বাংলাদেশিরা প্রতি বছর যে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা দেশে পাঠাচ্ছেন, তা যেন বৈধ চ্যানেলে দেশে আসে, সেই ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রবাসী আয় যাতে দেশের শিল্প খাতে বিনিয়োগ করা যায়, সে ব্যাপারেও কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ বিশেষ প্রয়োজন বলে মনে করি।

লেখক: অবসরপ্রাপ্ত পরিচালক বিএসটিআই, ও বিশিষ্ট শিল্পোদ্যোক্তা
অনুলিখন: এম এ খালেক