সবুজ কারখানার গৌরব

আপডেট : ১৯ জুলাই ২০২৬, ০৫:০০

চারিদিকে যখন নানাবিধ সংকট, অনিশ্চয়তা ও হতাশার সংবাদই অধিক শোনা যায়, তখন কিছু অর্জন আমাদেরকে আশাবাদী করিয়া তোলে। সম্প্রতি গণমাধ্যমে প্রকাশিত এক সংবাদ তেমনই আশার সঞ্চার করিয়াছে। বিশ্বের সর্বোচ্চ স্কোরপ্রাপ্ত শীর্ষ ১০০টি সবুজ বা লিড (Leadership in Energy and Environmental Design-LEED) সনদপ্রাপ্ত পোশাক কারখানার মধ্যে বাংলাদেশের ৫৩টি কারখানা স্থান লাভ করিয়াছে। ইহার সহিত নূতন করিয়া আরও চারটি তৈরি পোশাককারখানা আন্তর্জাতিক লিড সনদ অর্জন করায় দেশে এই স্বীকৃতিপ্রাপ্ত কারখানার সংখ্যা দাঁড়াইয়াছে ২৯০টিতে। ইহা নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের জন্য এক গৌরবোজ্জ্বল মাইলফলক এবং বিশ্ববাজারে আমাদের সক্ষমতার উজ্জ্বল স্বাক্ষর।

সন্দেহের অবকাশ নাই, বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণশক্তি হইল তৈরি পোশাকশিল্প। দেশের মোট রপ্তানি আয়ের সিংহভাগই আসে এই খাত হইতে; প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হইয়াছে কয়েক কোটি মানুষের জন্য। অতীতে নিম্নমূল্যের শ্রমনির্ভর উৎপাদনের দেশ বলিয়া যাহাদের নিকট বাংলাদেশ পরিচিত ছিল, আজ সেই বাংলাদেশই পরিবেশবান্ধব ও টিকসই শিল্পায়নের ক্ষেত্রেও বিশ্বকে নেতৃত্বের বার্তা দিতেছে। ইহা কেবল একটি সনদপ্রাপ্তির বিষয় নহে; বরং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি, গ্রহণযোগ্যতা এবং ভবিষ্যৎ প্রতিযোগিতার সক্ষমতার প্রতীক। কারণ, 'লিড সনদ অর্জন' মোটেই সহজসাধ্য বিষয় নহে। জ্বালানিসাশ্রয়, পানির দক্ষ ব্যবহার, কার্বন নিঃসারণ হ্রাস, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, প্রাকৃতিক আলো-বাতাসের ব্যবহার, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং টিকসই অবকাঠামো-এই সকল সূচকে আন্তর্জাতিক মান পূরণ করিলেই কেবল একটি কারখানা এই স্বীকৃতি লাভ করে। বর্তমান বিশ্বে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার শীর্ষ ব্র্যান্ডগুলি পরিবেশবান্ধব উৎপাদনকে কেবল অগ্রাধিকারই দেয় না, অনেক ক্ষেত্রে ইহাকে ব্যবসার পূর্বশর্ত হিসাবে বিবেচনা করে। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে বিশ্ব যখন টিকসই উন্নয়নের পথে অগ্রসর হইতেছে, তখন বাংলাদেশের এই সাফল্য আমাদের রপ্তানি সম্ভাবনাকে আরও সুদৃঢ় করিবে বলিয়া আমাদের প্রত্যাশা।

তবে এই অর্জনে আত্মতৃপ্ত হইবার অবকাশ নাই। দেশে হাজার হাজার পোশাককারখানা রহিয়াছে; সেইখানে মাত্র ২৯০টি কারখানা লিড সনদপ্রাপ্ত এবং বিশ্বের শীর্ষ ১০০-এ ৫৩টি কারখানার উপস্থিতি নিঃসন্দেহে গর্বের হইলেও, ইহাই আমাদের চূড়ান্ত গন্তব্য নহে। এখনও বহু কারখানায় কমপ্লায়েন্স, শ্রমিকের নিরাপত্তা, পরিবেশ সুরক্ষা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা লইয়া প্রশ্ন রহিয়াছে। আন্তর্জাতিক বাজারে সুনাম অর্জন করিতে যেমন বহু বছর সময় লাগিয়া যায়, তেমনি সামান্য অব্যবস্থাপনাও সেই সুনামকে এক নিমিষে প্রশ্নবিদ্ধ করিতে পারে। অতএব, অর্জনের আনন্দের পাশাপাশি আত্মসমালোচনার সাহসও আমাদের রাখিতে হইবে। বিশেষজ্ঞগণ যথার্থই বলিয়াছেন, শুধু লিড সনদের সংখ্যা বৃদ্ধি করিলেই চলিবে না। উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, আধুনিক প্রযুক্তির বিস্তৃত ব্যবহার, গবেষণা ও উদ্ভাবনে অধিক বিনিয়োগ, দক্ষ মানবসম্পদ গঠন এবং উচ্চমূল্যের বৈচিত্র্যময় পণ্য উৎপাদনের প্রতি সমান গুরুত্ব আরোপ করিতে হইবে। বিশেষত ক্ষুদ্র ও মাঝারি পোশাককারখানাগুলিকে সহজ শর্তে অর্থায়ন, প্রযুক্তিগত সহায়তা ও নীতিগত প্রণোদনার মাধ্যমে সবুজ রূপান্তরের আওতায় আনিতে হইবে। সরকার, উদ্যোক্তা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এই লক্ষ্য পূরণ সম্ভব নহে।

উল্লেখ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়নের কর্পোরেট সাসটেইনেবিলিটি ডিউ ডিলিজেন্স এবং ইকোডিজাইন নীতিমালা, পাশাপাশি বৈশ্বিক ফ্যাশন ব্র্যান্ডগুলোর 'নেট-জিরো' লক্ষ্য পোশাকশিল্পের জন্য নূতন বাস্তবতা সৃষ্টি করিতেছে। ভবিষ্যতে কেবল অল্প মূল্যে পোশাক উৎপাদন করিলেই চলিবে না; উৎপাদন প্রক্রিয়া কতটা পরিবেশবান্ধব, শ্রমিকবান্ধব ও জবাবদিহিমূলক-তাহাও সমান গুরুত্ব পাইবে। অতএব, সবুজ কারখানা নির্মাণের পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি, বর্জ্য পুনর্ব্যবহার, পানি ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন এবং সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ ও টিকসই করিবার প্রতি এখনই অধিক গুরুত্ব প্রদান করিতে হইবে। ইহাতে বাংলাদেশ বৈশ্বিক বাজারে কেবল শক্ত অবস্থানই রক্ষা করিবে না, অধিকন্তু আরও উচ্চমূল্যের ক্রয়াদেশ আকর্ষণ করিয়া দীর্ঘ মেয়াদে প্রতিযোগিতামূলক সুবিধাও অর্জন করিতে সক্ষম হইবে। সুতরাং আজিকার এই অর্জনকে গন্তব্য নহে, বরং আরও উৎকর্ষের পথে যাত্রার মাইলফলক হিসাবেই বিবেচনা করা উচিত। আমরা মনে করি, এই অগ্রযাত্রাকে আরও বিস্তৃত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করিয়া তোলাই হইবে বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত।

ইত্তেফাক/এমএস

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন