অবশেষে সম্পন্ন হইয়াছে বহুল আলোচিত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ। গতকাল রবিবার সকাল ৮টা হইতে বিকাল ৪টা পর্যন্ত সারা দেশে ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯৯টিতে ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হয়। একজন প্রার্থীর মৃত্যুর কারণে নওগাঁ-২ আসনের ভোটগ্রহণ স্থগিত হইয়াছে। নির্বাচন কমিশনের মোট নিবন্ধিত দলের সংখ্যা ৪৪। ইহার মধ্যে নির্বাচনে অংশ লইয়াছে ২৮টি রাজনৈতিক দল। বিএনপিসহ নিবন্ধিত বাকি দল এবং আরো কিছু বিরোধী দল নির্বাচন বর্জন করিয়াছে। ভালোমতো নির্বাচন সম্পন্ন হওয়ায় স্বস্তি ব্যক্ত করিয়াছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার। যদিও ভোট চলাকালীন চট্টগ্রামে গুলির ঘটনা ঘটিয়াছে। আর মুন্সীগঞ্জে একজনকে কুপিয়ে হত্যার খবর প্রকাশিত হইয়াছে। ইহা ছাড়া প্রকাশ্য ব্যালটে সিল মারা, কোথাও সিল মারা ব্যালট জব্দ ও পরে বাতিলের মতো কিছু ঘটনা ঘটিয়াছে। এই সকল ঘটনার অনেকগুলিই গণমাধ্যমে আসিয়াছে, আবার অনেক ঘটনাই চাপিয়া যাওয়া হইয়াছে।
যে কোনো নির্বাচনই তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলির জন্য যথেষ্ট চ্যালেঞ্জের। সিইসি জানাইয়াছেন, প্রায় ৪০ শতাংশ ভোট পড়িয়াছে, যদিও শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত তিনি এই ব্যাপারে নিশ্চিত ছিলেন না। নির্বাচনকে অংশগ্রহণমূলক বলিবার ক্ষেত্রে ভোটারের উপস্থিতি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বলা যায়, গড়ে প্রায় ৪০ শতাংশ ভোট কাস্টিং খুব খারাপ নহে। পৃথিবীর বৃহত্ জনসংখ্যার গণতান্ত্রিক দেশেও ভোটারের উপস্থিতি রাজ্য অনুযায়ী গড়ে ৫০/৬০/৭০ শতাংশের মধ্যে থাকে। আর সহিংসতার কথা বলিতে চোখ বস্ফািরিত হইয়া যায়। উদাহরণস্বরূপ প্রতিবেশী দেশের একটি প্রতিবেশী রাজ্যের সর্বশেষ পঞ্চায়েত নির্বাচনে গত জুলাইয়ে ১১ জন নিহত এবং অসংখ্য মানুষ আহত হইয়াছিলেন। অন্যান্য নির্বাচনেও সহিংসতা এমন পর্যায়ে চলিয়া যায়, টিভি পর্দায় তাহা দেখিয়া চমকাইয়া উঠিতে হয়। সেই হিসাবে বলা যায়, এই নির্বাচন তুলনামূলক অনেক কম সহিংসতাপূর্ণ। তবে নির্বাচন কি সকল জায়গায় সঠিকভাবে সম্পন্ন হইয়াছে? গণতন্ত্রে নির্বাচনের বিকল্প নাই। কিন্তু সেই সর্বত্র নির্বাচন স্বচ্ছ-সুষ্ঠু ও কারচুপিমুক্ত না হইলে তাহার গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়। কালো অর্থের নিকট যদি কোথাও কোথাও নির্বাচন জিম্মি হয় এবং সংশ্লিষ্টরা যদি অনিয়ম-কারচুপি দেখিয়াও না দেখিবার ভান করেন, তাহা হইলে এই নির্বাচন হইবে এক বালতি দুধের মধ্যে এক ফোঁটা চোনা। ইহা দুঃখজনক।
নির্বাচনের পর ইহার পরিবেশ ঠিক রাখাটা এখন সবচাইতে বড় চ্যালেঞ্জ। সরকার বিরোধী আন্দোলনের কর্মসূচি হিসাবে কিছুদিন পূর্বে বিএনপি বাংলাদেশে অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দিয়াছে। তাহারা বলিয়াছে, অসহযোগ আন্দোলন চলিতে থাকিবে। সেই অসহযোগটা বিভিন্ন পর্যায়ে বিভিন্নভাবে আসিবার কথা রহিয়াছে। আমরা দেখিয়াছি, গত বত্সরের ২৮ অক্টোবর হইতে চলতি বত্সরের ৬ জানুয়ারি পর্যন্ত ৭১ দিনে সারা দেশে মোট ৩০৩টি অগ্নিসন্ত্রাস ঘটিয়াছে। এই সকল ঘটনায় ৩০২টি যানবাহন ও ২৩টি স্থাপনা পুড়িয়াছে। গত শনিবার ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স মিডিয়া সেল হইতে জানানো হয়, ৭১ দিনে অগ্নিসন্ত্রাসে পুড়েছে ১৭৬টি বাস, ৪৯টি ট্রাক, ২৫টি কাভার্ড ভ্যান, ২১টি মোটরসাইকেল, ১০টি পিকআপ, পাঁচটি ট্রেনসহ ৯টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বিএনপির পাঁচটি অফিস, আওয়ামী লীগ একটি অফিস, একটি পুলিশ বক্স, এক কাউন্সিলরের অফিস, একটি বৌদ্ধমন্দির ইত্যাদি। নানান অগ্নিসন্ত্রাসে নিহত হইয়াছে আট জন। বিভিন্ন জায়গায় আগুন নিভাইতে দমকল বাহিনীর ৫৩৯টি ইউনিট এবং ২ হাজার ৯৫৯ জন জনবলকে ব্যস্ত থাকিতে হইয়াছে। সুতরাং দেশ যাহাতে নূতন অস্থিরতার দিকে না যায়, তাহা মোকাবিলা করাটাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।