‘ওই যে কালাই ভাই আইছে!’ ভিক্ষুকদের মাঝে কেমন উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
আমার বন্ধু এসেছে তার মায়ের কবর জিয়ারত করতে। আজিমপুরের এই জায়গাটায় সবসময়ই কমবেশি ভিক্ষুক থাকে। কিন্তু কালাই ভাইকে দেখে ভিক্ষুকদের ভেতরে কেমন যেন উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ল।
কালাই ভাই সবাইকে ভিক্ষা দিচ্ছে। বেশ ভালো অঙ্কের টাকা। গুলিস্তান থেকে একশো টাকার চকচকে অনেকগুলো নোট নিয়ে এসেছেন মনে হয়। আমি একটু দূরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছিলাম কালাই ভাই আর ভিক্ষুকদের এই মহব্বত।
‘লোকটার কি টাকার গাছ আছে?’ আমার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একজন ভিক্ষুককে জিজ্ঞেস করলাম।
ভিক্ষুকটা আমার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘জি। অনেকগুলো টাকার গাছ।’
কালাই ভাই আমার পাশে এলেন। লাইনের শেষ ভিক্ষুককে ভিক্ষা দিয়ে পাশের দালানের দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়ালেন। আমিও তার পাশে এসে হেলান দিয়ে দাঁড়ালাম।
‘কালাই ভাইয়ের বাড়ি কোথায়?’
কালাই ভাই আমার দিকে তাকালেন, গম্ভীর স্বরে বললেন, ‘আমার বাড়ি কালাই।’
‘কালাই মানে?’
‘কালাই মানে কালাই। উপজেলা। জয়পুরহাট।’
‘কিন্তু আপনারে যে সবাই কালাই ভাই বলে?’
‘আমার নাম গুলবুদ্দিন কালাই। লিওনার্দো দা ভিঞ্চির মতো আমার নানা আমার নাম রাখছিলেন গুলবুদ্দিন কালাই। কালাই আমাদের গ্রামের নাম।’
‘ও। আপনাকে যে সবাই দানবীর কালাই বলেন?’
‘জি। তবে আমি দানবীর না। আমি হইলাম দেনাদার কালাম।’
‘মানে?’
‘আমার আব্বা কোটি কোটি টাকা দেনা করছিলেন। আমি সেই দেনা শোধ করতিছি।’
‘কার কাছে দেনা করছিলেন? এই ভিক্ষুকদের কাছে?’
কালাই ভাই উদাস চোখে আকাশের দিকে তাকালেন। কিছু বললেন না। সামনে দিয়ে একটা খালি রিকশা যাচ্ছিল। তিনি রিকশাওলাকে জিজ্ঞেস করলেন নীলক্ষেত যাবে কি না। রিকশাওয়ালা রাজি হতে ভাড়া দরদাম না করেই তিনি রিকশায় উঠে বসলেন। আমার দিকে তাকিয়ে অল্পখানিকটা হেসে বললেন, ‘আসি ভাই।’
কালাই ভাই চলে যেতেই একজন ভিক্ষুক আমার পাশে এসে দাঁড়ালেন। আমার দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বললেন, ‘পাগলা কালাই খুউব ভালো মানুষ।’
‘পাগলা কালাই? তোমরা না বললে কালাই ভাই।’
‘হে হে। সামনাসামনি কি কাউরে পাগলা বলা যায়? আইজকে এক লাখ টাকা বিলায় গেলেন।’
‘উনি এত টাকা কোথায় পান?’
‘টাকাগুলান উনার না। উনার বাপের। উনার বাপ ছিলেন কোর্টের পেশকার। কালাইতে উনি জমি কিনছিলেন হাজার হাজার বিঘা। নয়া জমিদার হইয়া গেছিলেন।’
‘ইন্টারেস্টিং! তারপর?’
‘তারপর উনার বাপ মারা যাওয়ার পর কালাই ভাই যা করেন, তাতেই ফেইল মারেন। উনার দুইডা বাচ্চা হয়। বোবা। কথা কইতে পারে না। তারপর উনি স্বপ্নে দেখলেন উনার বাপের পাপে উনার নাকি এই অবস্থা। উনার বাপ অন্যায়ভাবে অনেক টাকা কামাইছেন। সেই টাকাগুলান ফেরত দিতে হইবে।’
‘তারপর?’
‘উনার বাপের সব টাকা উনি বিলাইতে শুরু করলেন। সব জমি বিক্রি করতে শুরু করলেন। এইবার শেষ জমি বিক্রি কইরা গত দশদিনে ত্রিশ লাখ টাকা বিলাইছেন সারা ঢাকা শহরের গরিবদের কাছে।’
‘আপনি এত কিছু জানলেন কী করে?’
‘জানি জানি। এইবার কইলেন উনার বউয়ের আবার বাচ্চা হইবো। দোয়া চাইলেন। খুব টেনশনে আছেন।’
আমার বন্ধু এতক্ষণে ফিরে এসেছে। আমরা হাঁটা শুরু করলাম। আমার মাথায় কেবল ঘুরতে থাকল—কালাই ভাইয়ের বাচ্চাটা এইবার সুস্থ হবে তো?