ভেন্যু সংকটে দেশে আন্তর্জাতিক ফুটবল ম্যাচের আয়োজন করা কঠিন হইয়া পড়িয়াছে। আসন্ন মেয়েদের সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের ভেন্যু লইয়া দুশ্চিন্তায় রহিয়াছে খোদ দেশের ফুটবলের অভিভাবক সংস্থা বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন বা বাফুফের। এখনো সাফ ভেন্যু ঠিক হয় নাই, অথচ এইবার তাহা বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত হইবার সম্ভাবনা বেশি। গুলিস্তানে অবস্থিত বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়াম শুধু ফুটবল নহে, দেশের খেলাধুলার অন্যতম প্রধান ভেন্যু ও প্রাণকেন্দ্র। ঐতিহ্যবাহী এই স্টেডিয়ামে ফুটবল ও ক্রিকেটের পাশাপাশি একসময় হকি, আরচারি, অ্যাথলেটিকস ও বক্সিং আয়োজনেরও দৃষ্টান্ত রহিয়াছে। মোহাম্মদ আলি, লিওনেল মেসি, জিনেদিন জিদানের মতো বিশ্বতারকারা মাতাইয়াছেন এই সবুজ চত্বর। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরিয়া বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামের সংস্কারকাজ শেষ না হওয়ায় এইখানে অনুষ্ঠিত হইতেছে না কোনো আন্তর্জাতিক ম্যাচ। ইহার বিকল্প হিসাবে কমলাপুর বীরশ্রেষ্ঠ শহিদ সিপাহি মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল স্টেডিয়ামে সাম্প্রতিক কালে কিছু আন্তর্জাতিক ফুটবল খেলা অনুষ্ঠিত হইয়াছে বটে, কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ান ফুটবলের নীতিনির্ধারণী সংস্থা সাফ ইতিমধ্যেই এইখানে মেয়েদের সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ আয়োজন লইয়া নেতিবাচক মন্তব্য করিয়াছে। কেননা এমন আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার আয়োজনে এই স্টেডিয়ামের কিছু দুর্বলতা ও সীমাবদ্ধতা রহিয়াছে।
উপর্যুক্ত পরিস্থিতিতে ইহারও বিকল্প হিসাবে সিলেটের একটি ভেন্যুর কথা ভাবা হইয়াছিল। কিন্তু সাফের স্পনসর প্রতিষ্ঠান সেইখানে যাইতে রাজি নহে। কেননা জাতীয় স্টেডিয়াম রাখিয়া অন্য কোথাও এমন প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হইলে দর্শক উপস্থিতিসহ তাহা সফল হইবার সম্ভাবনা কম। এই পরিপ্রেক্ষিতে বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামের সংস্কারকাজ দ্রুত সম্পন্ন করা জরুরি হইয়া পড়িয়াছে। গত আড়াই বত্সর ধরিয়া এই স্টেডিয়ামে ফুটবলারদের পা পড়ে নাই, যাহা দুঃখজনক। প্রশ্ন হইল, খেলাধুলার দুনিয়ায় সমাদৃত এই স্টেডিয়ামের সংস্কারকাজে কালক্ষেপণ কেন? অনেক দিন ধরিয়া এইখানকার সংস্কারকাজও বন্ধ। নাই শ্রমিকের আনাগোনা। ফলে এখন সেখানে যত্রতত্র মালামাল পড়িয়া রহিয়াছে। পড়িয়া থাকা লোহালক্কড়ের ফাঁকফোকর দিয়া বাড়িয়া উঠিয়াছে আগাছা। জানা যায়, বর্তমানে টাকার অভাবে স্টেডিয়ামের সংস্কারকাজ বন্ধ রহিয়াছে। বিষয়টি আমাদের ভাবিতেও কষ্ট হয়। জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের সচিব জানাইয়াছেন যে, আরো ৫০ কোটি টাকার বাজেট সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিকট পাঠানো হইয়াছে। অনুমোদিত হইয়া আসিলে পুনরায় কাজ শুরু হইবে। এখানে ১০০ কোটি টাকার উন্নয়ন বাজেটেও কাজ হইতেছে না। ফ্লাডলাইট বসানো ও চেয়ার স্থাপনের কাজ এখনো বাকি। সরকারের বিভিন্ন প্রকল্পের মেয়াদ ও ব্যয় বৃদ্ধি লইয়া আমরা বহুবার লেখালেখি করিয়াছি। প্রকল্পের শুরুতে অদূরদর্শিতা হউক বা পরবর্তীকালে অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে হউক, এমন ব্যয়বৃদ্ধি ও উন্নয়নকাজে সময়ক্ষেপণ মোটেও প্রত্যাশিত নহে।
বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামকে কেন্দ্র করিয়া যে অনিশ্চয়তা তৈরি হইয়াছে, তাহার সমাধানে নূতন সরকার কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করিবেন বলিয়া আমরা আশা করি। বাজেট বৃদ্ধি করিয়া হইলেও এই সমস্যার আশু সমাধান করিতে হইবে। একই সঙ্গে আমরা বলিতে চাই, দেশের ক্রীড়াঙ্গন ক্রমেই স্থবির হইয়া যাইতেছে। জিলা-উপজেলায় স্টেডিয়ামে নির্মাণ করা হইলেও তাহার সদ্ব্যবহার কতটা হইতেছে সেদিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন। শহর ও গ্রামগঞ্জ হইতে নূতন নূতন খেলোয়াড় তৈরিতে আমাদের মনোনিবেশ করিতে হইবে। দেশের ক্রীড়াঙ্গনকে সতেজ ও সজীব রাখার উদ্দেশ্য কেবল বিনোদন নহে, জাতীয় স্বাস্থ্য সুরক্ষায়ও ইহার অবদানের কথা অনস্বীকার্য। বিশেষত তরুণ প্রজন্ম যেইভাবে খেলাধুলা ছাড়া বাড়িয়া উঠিতেছে তাহাতে আমরা উদ্বিগ্ন। ফুটবল যেহেতু এখনো দেশের জনপ্রিয় খেলা এবং শরীরচর্চার অন্যতম প্রধান উপায়, এই জন্য ফুটবলের ঘন ঘন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ম্যাচ অনুষ্ঠিত হওয়া প্রয়োজন। এইখানকার ঘরোয়া লিগগুলিকেও অধিকতর প্রাণবন্ত করিয়া তোলা আবশ্যক। এই জন্য দেশে ফুটবলের উন্নয়নের স্বার্থে একাধিক মানসম্পন্ন ও আন্তর্জাতিক স্টেডিয়াম গড়িয়া তুলিবার কোনো বিকল্প নাই।