শিক্ষা

দক্ষ ও মানবসম্পদ কারিগর তৈরি

কারিগরি শিক্ষা মানে তো হাতে-কলমে শেখানো, তাই না? এর জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি দরকার। ধরে নিলাম তা আছে। দক্ষ প্রশিক্ষক দরকার, তা-ও হয়তো আছে (তারা অবশ্যই সনদধারী, কোনো সন্দেহ নেই)। কিন্তু যেখানে দক্ষতার প্রশ্ন, সেটি নিশ্চিত করতে হলে যা করা দরকার ছিল, তা করা হয়েছে কি? নাকি এখনো হয়?

আমি দেখেছি, কারিগরি শিক্ষার নামে বরাদ্দকৃত বহু মূল্যবান যন্ত্রপাতি ধুলায় ধুলোময় হয়ে অযত্নে অবহেলায় পরে আছে। ওতে হাতও দেওয়া হয় না, কাজ শেখানো তো দূরের কথা। তবে হ্যাঁ, এদের পরীক্ষার খাতাগুলো থাকে ঝকঝকে পরিষ্কার। ফলে কিছু না শিখেই, কিছু না বুঝেই কারিগরি পাশ হয়ে যাচ্ছে শত শত ছাত্রছাত্রী এবং একটা কার্যকর সনদও পেয়ে যাচ্ছে তারা। অর্থাত্, বিল্ডিং আছে, যন্ত্রপাতি আছে, শিক্ষক আছে, ছাত্রও আছে, তবু কী যেন নেই। একেই বলে শুভঙ্করের ফাঁকি!

সাধারণ শিক্ষার ব্যবহারিকের ক্ষেত্রে একই চিত্র। বিশেষ করে মফস্বলে। হাতে-কলমে কিছু না শিখেই ২৪-২৫ নম্বর পেয়ে যাচ্ছে তারা, যার দৌলতে গ্রেড নম্বরও বেড়ে যাচ্ছে। ব্যবহারিকের উদ্দেশ্য কি এই ছিল? শুধু নম্বর পাওয়া!

বিদেশি ভক্তিতে আমরা মাতোয়ারা, তাই বিদেশ থেকে বিমানে করে সাড়ম্বরে সৃজনশীল পদ্ধতিকে এদেশে আনা হয়েছে। কিন্তু ভেবে দেখা হয়েছে কি, এদেশে পদ্ধতিটা কতটা ফলপ্রসু? কর্ণকুহরে মিনি ডিভাইস রেখে নকল করা কি সৃজনশীল পদ্ধতির কুফল নয়?

এমসিকিউ পদ্ধতির মহাসমুদ্রে হাবুডুবু খেতে খেতে কে না চাইবে খড়কুটো ধরে বাঁচতে? তাই শিক্ষকেরাই খড়কুটো হওয়ার প্রাণান্তকর অপচেষ্টা চালাচ্ছেন। কখনো উতরে যাচ্ছেন, কখনোবা হাতেনাতে ধরা পড়ে হেনস্তা হচ্ছেন। এসবের পেছনের গূঢ় রহস্যটা এবার উদ্ঘাটন করতে হবে এবং এই লজ্জার হাত থেকে পরিত্রাণের পথ খুঁজতে হবে। নতুবা বিপদ ক্রমে ঘণীভূত হতে হতে ছাত্রসমাজকে ধ্বংসের দাবানলে নিক্ষেপ করবে।

পরিত্রাণের উপায় সৃজনশীল পদ্ধতি বন্ধ করে দেওয়া নয়, উপায়টা হলো পরীক্ষা পদ্ধতির আমূল পরিবর্তন ঘটানো। আর তা হলো মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা। অর্থাত্, একবারে বেশি খেলে যেমন বদহজম হওয়ার আশঙ্কা থাকে, তেমনি একবারে পর্বতপ্রমাণ পরীক্ষার বোঝা মাথায় নিয়ে ছাত্রসমাজ যে হাঁসফাঁস করছে আর দুর্নীতির কোলে আশ্রয় নিচ্ছে, তা থেকে মুক্ত করতেই হবে ছাত্রসমাজকে। এজন্যই সদিচ্ছা দরকার। দরকার আত্মশুদ্ধির সব পর্যায়ে। যেমন ছাত্র-শিক্ষক-অভিভাবক, সর্বোপরি সরকার। সবারই আন্তরিকতায় শিক্ষাজগতের বিরাজমান অন্ধকার ঘোচানো সম্ভব।

অস্ট্রেলিয়াতে শুনেছি অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত কোনো পরীক্ষা নেওয়া  হয় না। এতে কি তারা মূর্খ থাকে? কখনোই নয়। শিক্ষার্থীরা কতটুকু শিখল সঠিকভাবে, সেটাই দেখার বিষয়, সেটাই পরীক্ষা। চাপিয়ে দেওয়া নিষ্ফল পরীক্ষা কীভাবে শুভ ফল বয়ে আনবে?

তাই আসুন আগে ভালোভাবে শেখাই, তারপর অল্প অল্প করে ননি তুলি। অর্থাত্, প্রতি সপ্তাহে এবং মাসে পঠিত বিষয়ের চূড়ান্ত মূল্যায়ন করি, তবেই না শিক্ষার সুফল ঘরে আসবে। ছাত্ররাও আনন্দের সঙ্গে শিখবে, আত্মস্থ করবে, সুযোগ্য ভবিষ্যত্ নাগরিক হয়ে গড়ে উঠবে।

মনীষীরা বলে গেছেন, ‘শিক্ষা সেটাই, যাহাতে অপুষ্ট মনুষ্যত্ব পুষ্টি লাভ করে, প্রচ্ছন্ন মনুষ্যত্ব বিকশিত হয়, হীন মনুষ্যত্ব স্ফূর্তি লাভ করিয়া জাগ্রত ও চেতন হইয়া উঠে।’

n লেখক : অবসরপ্রাপ্ত প্রভাষক, বাউফল সরকারি কলেজ, বাউফল, পটুয়াখালী