প্রাচীনকাল হইতেই মানুষ বাজারে গিয়া যাচাই-বাছাই করিয়া সুলভ মূল্যে প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি ক্রয়বিক্রয় করিত। যুগের পরিবর্তনের সহিত বাজারব্যবস্থাতেও পরিবর্তন আসিতেছে। ক্রেতা ও বিক্রেতাদের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির জন্য বাজারব্যবস্থায় যোগ হইয়াছে সুপার শপ, শপিং মল, সুপার মার্কেট, মেগা মল। পাশাপাশি, তথ্যপ্রযুক্তির বিকাশের পাশাপাশি নগদ অর্থ লেনদেনের বিকল্প হিসাবে জনপ্রিয় হইয়াছে ক্রেডিট কার্ড, ডেবিট কার্ড ও মোবাইল ব্যাংকিং সেবা। বাজারে গিয়া সরাসরি পণ্য ক্রয়ের পাশাপাশি মানুষজন বর্তমানে অনলাইনে পণ্য অর্ডার করিয়া ঘরে বসিয়াই পণ্য হাতে পাইয়া যাইতেছে। উন্নত বিশ্বে যখন ই-কমার্স শুরু হয় এবং এই ব্যবস্থা যখন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জনপ্রিয় হইতে শুরু করে, তখন কিছু ধান্ধাবাজ প্রতারক ই-কমার্সের নামে প্রতারণার নূতন নূতন ফাঁদ পাতে। বিশ্বে অ্যামাজন, আলিবাবাসহ যেই সকল বড় ই-মার্ট প্রতিষ্ঠান রহিয়াছে, তাহারা সততার সহিত সার্ভিস দিতেছে বিধায় তাহারা বিশ্বের অন্যতম ধনী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হইতে পারিয়াছে; কিন্তু যাহাদের শুরুতেই থাকে প্রতারণার উদ্দেশ্য, তাহারা সাময়িক সময়ের জন্য বৃহত্ অঙ্কের অর্থ লোপাট করেন বটে; কিন্তু তাহাতে সামগ্রিকভাবে ক্ষতি হয় ই-কমার্স ব্যবসায়ের। পরিসংখ্যান অনুসারে, দেশে ই-ক্যাব নিবন্ধনকৃত ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান রয়েছে প্রায় ২ হাজার; ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যক্তিগত উদ্যোগে পরিচালিত ৫০ হাজারের অধিক পেইজ/প্রতিষ্ঠান রয়েছে। সূত্রমতে, ২০২২ সালে দেশের ই-কমার্স বাজারের আকার ছিল প্রায় ৬৬ হাজার কোটি টাকার—যাহা ২০২৬ সাল নাগাদ দেড় লক্ষ কোটি টাকায় পৌঁছাইবে বলিয়া ধারণা করা হইতেছে।
সুতরাং ই-কমার্সের বিশাল সম্ভাবনার ব্যবস্থাটিকে অসাধু ও প্রতারকদের হাত হইতে রক্ষা করিবার জন্য সংশ্লিষ্ট মহলকে কঠোর হইতেই হইবে। অতি লোভে পা না দিতে ক্রেতাদেরও সতর্ক হইতে হইবে। মনে রাখিতে হইবে, অস্বাভাবিক ছাড় ও অতি লোভনীয় অফারের মধ্যে গন্ডগোল থাকিবেই। ক্রেতারা প্রতারিত হইলে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে দ্রুত অভিযোগ দায়ের করা জরুরি। লোভনীয় অফার সম্পর্কিত পপ-আপ বা ইমেইলে প্রাপ্ত ফিশিং লিংকে ক্লিক করা কিংবা পাবলিক ওয়াইফাই ব্যবহার করিয়া অনলাইনে কিনাকাটা না করাই উত্তম। অনলাইনে কিনাকাটার পূর্বে ক্রেতারা যত সতর্ক ও সচেতন থাকিবেন এবং যত অধিক যাচাই-বাছাই করিবেন, ততই কমিয়া যাইবে প্রতারিত হইবার সম্ভাবনা। যাহারা সত্যিকারের ই-কমার্সে যুক্ত থাকিতে চাহেন, তাহাদেরও মনে রাখিতে হইবে—ব্যবসায়ে সততা সবচাইতে বড় মূলধন। এই জন্য ইংরেজি প্রবাদে বলা হইয়াছে—অনেস্টি ইজ দ্য বেস্ট পলিসি। কেন ‘অনেস্টি’ বেস্ট পলিসি—তাহা বুঝিতে ‘বুদ্ধিমান’ হইতে হয়। চালাক হওয়াটা দোষণীয় নহে; কিন্তু চালাকির সহিত যখন অসততা জোট বাঁধে তখনই হয় সমস্যার শুরু। এই বিষয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত একটি গল্প স্মরণ করা যাইতে পারে। তৃতীয় বিশ্ব হইতে একজন চালাক কর্মী গিয়াছে উন্নত বিশ্বের একটি বৃহত্ দুগ্ধ খামারে কাজ করিতে। চালাক কর্মীটি একদিন তাহার দুগ্ধ খামারের মালিককে বলিলেন, ‘মহোদয়, আপনার মুনাফা ১০ শতাংশ বাড়িয়া যাইবে, যদি আপনি এক লিটার দুধে এক শত মিলিগ্রাম পানি মিশাইয়া দেন।’ মালিক শুনিয়া তাহাকে পত্রপাঠ ছাঁটাই করিয়া দেশে পাঠাইয়া দিলেন। কারণ, এই পরামর্শ হইল সোনার রাজহাঁসের পেট কাটিবার শামিল। সাময়িক লাভ বটে, ধরা পড়িলেই সকল সুনাম শেষ। আর সুনামই তো সবচাইতে বড় পুঁজি।
যে কোনো কাজ করিবার পূর্বে প্রথম নিজের বিবেকের নিকট প্রশ্ন রাখিতে হইবে। এই জন্য বিবেক জাগ্রত করিবার শিক্ষা শৈশব হইতে আমাদের ভিতরে প্রোথিত করিতে হইবে। জাতি হিসাবে আমাদের দৈন্য ঘুচাইতে হইলে সুনীতি ও সততার সংস্কৃতিকে ধারণ করিতেই হইবে।