মনের আনন্দের খোরাকের জন্য যুগে যুগে হিংটিংছট (অর্থহীন) ধরনের ছড়া যেমন লেখা হয়েছে, তেমনি চেতনাকে জাগাতে বারুদঠাসা ছড়াও লিখেছেন অনেকে। এই দুই রকম ছড়াই আমাদের শিশুসাহিত্যের বাগানে ফুল হয়ে ফুটেছে। তবে কিছু ছড়া হিংটিংছট মনে হলেও সেসব ছড়ার ভেতরে আছে আলাদা অর্থ কিংবা তাত্পর্য। একটি শক্তিশালী ছড়া দেশ-কাল ছাপিয়ে এক অন্যরকম সৌরভ ছড়িয়ে যায়। যার রেশ থেকে যায় যুগ থেকে যুগান্তর। যেমন আমাদের বাংলা বইয়ে ছোটবেলায় পড়া ছড়াগুলো আজও আমাদের স্মৃতিতে জ্বলজ্বল করছে। ‘খোকা ঘুমালো পাড়া জুড়ালো/বর্গী এলো দেশে/বুলবুলিতে ধান খেয়েছে/ খাজনা দেবো কিসে?/ ধান ফুরালো, পান ফুরালো/ খাজনার উপায় কী?/ আর ক’টা দিন সবুর করো/ রসুন বুনেছি।’ আনুমানিক ২৮০ বছর আগে লেখা একটি ছড়া, কিন্তু আজও এর অর্থ এবং তাত্পর্য অম্লান। এই ছড়া নিছক আনন্দ জাগায় না, চেতনাকেও জাগায়। কবি কাজী নজরুল ইসলামের একটি লাইন এক্ষেত্রে মনে এলো—‘আমরা যদি না জাগি মা, কেমনে সকাল হবে?’ এখানে সকাল বলতে নেহাত সূর্যোদয় নয়, সকাল একটি স্বপ্নপূরণের নাম! অনিন্দ্য সুন্দর একটি পৃথিবীর দিকে যাত্রা। এই সুন্দর যাত্রাকে মহিমা দিতে বা ছড়ায় চেতনা জাগাতেই যেন ছড়া লিখে চলেন জয়দুল হোসেন। নিজের শেকড় আঁকড়ে ছড়ার মাধ্যমে তিনি কথা বলেন নব জাগরণের, নতুন ভবিষ্যতের। জয়দুল হোসেন ছড়া লিখছেন কয়েক দশক ধরে। মুক্তিযুদ্ধ, একুশে ফেব্রুয়ারি, স্বৈরাচার বিরোধিতা, বঙ্গবন্ধু, দেশপ্রেম, মানবতা বোধ, সাম্যবাদ, লোকজ অনুষঙ্গ, লোকপ্রবাদ, ঋতুবৈচিত্র্য ছাড়াও সমকালীনতা তার ছড়ার প্রতিপাদ্য। তিতাস পাড়ে বেড়ে ওঠা এই ছড়াকবির ছড়ায় তিতাস নদীও এসেছে নানাভাবে। তিতাস নিয়ে তার একটা কবিতা পড়া যাক—
তিতাস নদীর জলের ধারা
রক্তে আমার পাগলপারা
সকাল-দুপুর বিকেল-সাঁঝে
জলতরঙ্গ তালে বাজে। (তিতাস নদীর ভাঙাগড়া)
মুক্তিযুদ্ধে বিজয় ছিল বাঙালি জাতির সবচেয়ে বড় অর্জন। মুক্তিযুদ্ধকে জয়দুল হোসেন সরাসরি প্রত্যক্ষ করেছেন। পরবর্তী সময়ে মুক্তিযুদ্ধ তার ছড়া-কবিতায় নানা মাত্রিকতায় উঠে এসেছে। পেয়েছে বিশেষ মর্যাদা। লাল-সবুজের এই গৌরবগাথা তার ছড়ার বইয়ের পাতায় পাতায় ছড়িয়ে আছে। তার লেখা ‘স্বাধীনতার ছড়া’ থেকে কিছু অংশ পড়ি—
বাংলাদেশের স্বাধীনতা
এলো একাত্তরে
স্বাধীনতার জন্যে দেশের
লক্ষ শিশু মরে।
লক্ষ মাতা প্রাণ দিয়েছে
লক্ষ পিতার লাশ
পাড়ি দিলাম আমরা
স্বাধীনতার মাস।
জননী-জন্মভূমি স্বর্গাদপি গরীয়সী। কে না জানে নিজের মা ও মাতৃভূমি স্বর্গ থেকেও শ্রেষ্ঠ। নিজের দেশ-ঐতিহ্য, লোকাচার, কৃষ্টি-সংস্কৃতি এসব আমাদের ছড়াসাহিত্যের অপরিহার্য উপাদান। এই বিষয়গুলো বুকের মধ্যে সযত্নে লালন করেন জয়দুল হোসেন। তার লেখার মধ্যে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জলবিধৌত জনপদ উঠে আসে বারবার। বাঙালি অসাম্প্রদায়িক। ধর্ম-বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে এই বাংলাদেশ সবার। এখানে নেই কোনো ভেদাভেদ—এরকম চেতনা থেকেই জয়দুল হোসেন আগলে রাখতে চান তার গ্রামকে, তার দেশকে। তাই গ্রাম কিংবা মফস্সল থেকে তিনি বের হতে চান না। ফলে অনায়াসে ‘পুণ্যভূমি গাঁওয়ে’ তিনি বলতে পারেন—
গৈ-গেরামের মানুষ আমি শহর থেকে দূরে
ঘুমের ঘোরে জেগে উঠি পাখির গানের সুরে।
নিজের মফস্সল শহরকে সঙ্গী করেই তিনি হেঁটে যেতে চান নতুন সব স্বপ্নের সড়কে। বৈরী আবহাওয়ার ঘাত-প্রতিঘাত কোনো কিছুই তার স্বপ্নযাত্রাকে আটকে রাখতে পারে না। গত কয়েক দশক ধরে তিনি লিখেছেন অনেক ছড়া, এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলো হচ্ছে—‘স্বরবৃত্তে স্বরাঘাত’, ‘সময় অসময় দুঃসময়’, ‘বারোমাসি ছন্দছড়া’, ‘লাল-সবুজের দেশের জন্যে’ ইত্যাদি।
গ্রন্থভুক্ত এমন অনেক ছড়াই আছে যা দেশকাল সচেতনতা সৃষ্টি করে এবং নতুন প্রজন্মকে নির্মল আনন্দ দেওয়ার পাশাপাশি দেশপ্রেমেও উদ্বুদ্ধ করতে সাহায্য করে। শুধু ছড়া সাহিত্যই নয়, শিশুদের প্রতি দায়বোধ থেকে শিশু-কিশোরদের উপযোগী করে লিখেছেন নিবন্ধ ও পথনাটক—এমনকি মুক্তিযুদ্ধের আঞ্চলিক ইতিহাসও।
এছাড়া তিনি তার প্রিয় কবিদের নিয়েও লিখেছেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলামসহ অনেকেই উঠে এসেছেন তার লেখায়। অনেক স্বাদের ও মননের ছড়া নিয়ে তিনি উপস্থিত হন পাঠকের কাছে। যে সব ছড়া রসবোধ ও শিল্পের দ্যোতনা ছড়িয়ে হয়ে ওঠে ঘুম জাগানিয়া।
লেখক : সংস্কৃতিকর্মী