‘অধিনায়ককে বলেছিলাম শেষ উইকেট পর্যন্ত বল করব’

তরুণ একটা দল ওয়েস্ট ইন্ডিজের। বেশির ভাগ খেলোয়াড়েরই এই সিরিজের আগে ছিল না সাদা পোশাকে অভিজ্ঞ কোনো দলের বিপক্ষে ম্যাচে খেলার অভিজ্ঞতা। এমন একটা দল নিয়েই অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে দুই ম্যাচ টেস্ট সিরিজে মুখোমুখি হয়েছিলেন ক্যারিবীয়ানরা। তবে সিরিজের প্রথম ম্যাচে অভিজ্ঞ শক্তিশালী স্বাগতিকদের সামনে দাঁড়াতেই পারেনি তারা। কিন্তু এই সিরিজের দ্বিতীয় খেলায় সফরকারীরা যা করেছে তা হয়তো অজিরা এই দিনের আগে কল্পনাও করতে পারেনি। ২৭ বছর পর স্বাগতিকদের তাদের ঘরের মাটিতে হারিয়ে টেস্ট ম্যাচে জয় তুলে নিয়েছেন ওয়েস্ট ইন্ডিজের এই তরুণ দলটি। আর এই অসাধ্য সাধনের পেছনে বল হাতে সব থেকে বড় অবদান রেখেছেন শামার জোসেফ। সফরকারীদের এই ২৪ বছর বয়সি পেসার একাই গুঁড়িয়ে দিয়েছে অস্ট্রেলিয়ার দ্বিতীয় ইনিংস।

ব্রিজবেনে টানটান উইত্তেজনা ছড়ানো দিন-রাতের টেস্টের চতুর্থ দিনে গতকাল শামারের অগ্নিঝরা বোলিংয়ে ৮ রানে জিতেছে ক্রেইগ ব্র্যাথওয়েথের দল। সিরিজে ফিরিয়েছে ১-১ সমতা। চতুর্থ দিন রোববার ২১৬ রান তাড়ায় ২০৭ রানে থেমেছে অস্ট্রেলিয়ার দ্বিতীয় ইনিংস। আর অজিদের তাদের ঘরের মাটিতে হারিয়ে ১৯৯৭ সালের পর প্রথম বারের মতো জয় পেল ওয়েস্ট ইন্ডিজ দল। আর ঐতিহাসিক এই জয়ে ১১.৫ ওভারে ৬৮ রান দিয়ে অস্ট্রেলিয়ার ৭ উইকেট একাই নেন শামার। ম্যাচ-সেরাও হয়েছেন তিনি। তবে এই ইনিংসে তিনি মাঠে নামতে পারবেন কি না, তা নিয়েও ছিল ব্যাপক শঙ্কা।

মূলত এই টেস্টের তৃতীয় দিন নিজেদের দ্বিতীয় ইনিংসের শেষ ব্যাটার হিসেবে মাঠে নামেন শামার। সেই ইনিংসে ১৩ বলে তিন রান করার পর অজি তারকা পেসার মিচেল স্টার্কের ইয়র্কার বোলে পায়ে আঘাত পেয়ে মাঠ ছেড়ে উঠে যেতে হয়েছিল তাকে। সে সময় শামারকে দেখা গিয়েছিল খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে ফিজিওর সাহাজ্য নিয়ে মাঠ ছাড়তে। পরে পায়ের চোটের অবস্থা জানতে স্ক্যান করতে তাকে যেতে হয়েছিল হাসপাতালে। তাতে তিনি এই ম্যাচে আবার ফিরতে পারবে কি না, তা নিয়ে ছিল শঙ্কাও। তবে ব্যথানাশক ইনজেকশন নিয়ে চতুর্থ দিন বল হাতে নেমে তিনি যা করলেন, তা তো পুরো ইতিহাস হয়ে থাকল।

ম্যাচ শেষে মাঠে নিজের ফিরে আসার বিষয়ে ব্রডকাস্টারদের সঙ্গে আলাপকালে শামার বলেন, ‘উত্সাহ দেওয়ার জন্য কৃতিত্বটা কেবল সতীর্থদের দিতে চাই। ব্যথা নিয়েও দল ও দেশের মানুষদের জন্য আমি চেষ্টা করে যেতে চাই। আজকে আমার মাঠে নামার কথা ছিল না। তবে চিকিত্সক আমার পায়ের আঙুলে কিছু একটা করেছেন। জানি না কী করেছেন, তবে সেটা কাজে দিয়েছে। কেবল মৌলিক বিষয়গুলোয় থাকার চেষ্টা করেছি। এই টেস্ট জিতে আমার কাছে মনে হচ্ছে পুরো সিরিজ জিতে গেছি আমরা। ডাক্তার আমাকে সকালে জিগ্যেস করলেন, আমি কেমন অনুভব করছি। বলেছিলাম, অনেক ব্যথা। সে পরে বললেন, মাঠে নামতে এবং তার বিশ্বাস ছিল আমি বোলিং করতে পারব। যখন পাঁচ উইকেট নিলাম, আনন্দে অশ্রু ঝরছিল। আমি এখন অনেক খুশি। এমনকি কোনো ক্লান্তিও নেই। মনে হচ্ছে, বোলিং চালিয়ে যেতে পারব।’

এই সিরিজের প্রথম টেস্টে নিজের অভিষেক ম্যাচে পাঁচ উইকেট শিকার করে তার সক্ষমতা সম্পর্কে জানান দিয়েছিলেন শমার। এরপর দ্বিতীয় ম্যাচের প্রথম ইনিংসে শিকার করেছিলেন ১ উইকেট। তবে দ্বিতীয় ইনিংসে সব কিছুকে ছাড়িয়ে একাই তুলে নিয়েছেন ৭ উইকেট। তবে এ দিন মাঠে নামার আগে শামার তার অধিনায়ক ক্রেইগ ব্র্যাথওয়েথকে বলেছিলেন তিনি ইনিংসের শেষ উইকেট পড়া অবদি বল করতে চান। এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘এটা শুধু ইতিবাচক হওয়ার ব্যাপার ছিল। এখানেই শেষ। (আমার সতীর্থরা) বলেছিল, মাঠে যাও এবং উইকেট নাও। আমি এতটা ক্লান্ত (বোলিং করে) নই কারণ আমি আমার দলের জন্য এটি করতে চেয়েছিলাম। আমি আমার অধিনায়ককে বলেছিলাম, ইনিংসের শেষ উইকেট না পড়া পর্যন্ত আমি বোলিং করব।’ এ সময় নিজের চোট নিয়ে বলেন, ‘আমার পায়ের আঙুলগুলো কেমন আছে সেটা বিবেচ্য নয়, আমি ঠিক আছি। আর তাই আমি জয় পেতে অবদান রাখতে পেরেছি।’

সংক্ষিপ্ত স্কোর

ওয়েস্ট ইন্ডিজ : ৩১১ ও ১৯৩।

অস্ট্রেলিয়া : ২৮৯/৯ ডিক্লে. ও ৫০.৫ ওভারে ২০৭।

ফল: ওয়েস্ট ইন্ডিজ ৮ রানে জয়ী।

সিরিজ: ২ ম্যাচের সিরিজ ১১ ড্র।

ম্যান অব দ্য ম্যাচ ও সিরিজ: শামার জোসেফ।