এইচআইভির প্রতি অবহেলা নহে

বৈশ্বিকভাবে এইচআইভি সংক্রমণ কমিতেছে। তবে বাংলাদেশে এই রোগে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়িতেছে। এই বত্সর নূতন করিয়া ৮৬৯ জন সংক্রমিত ব্যক্তি শনাক্ত করা হইয়াছে। আর এক বত্সরে মারা গিয়াছে ১৪৮ জন। গত শনিবার বিশ্ব এইডস দিবস উপলক্ষে সরকারের জাতীয় এইডস/এসডিটি কর্মসূচির উদ্যোগে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর উপস্থিতিতে এই তথ্য তুলিয়া ধরা হয়। বলা হয়, দেশে প্রথম এইডস রোগী শনাক্ত হয় ১৯৮৯ সালে। এ পর্যন্ত ৬ হাজার ৪৫৫ জন এইচআইভি সংক্রমিত ব্যক্তি শনাক্ত করা হইয়াছে। আর মারা গিয়াছে ১ হাজার ২২ জন। দেশে এইচআইভি সংক্রমিত মানুষের সংখ্যা ১৩ হাজারের মতো হইলেও তাহাদের সবাইকে শনাক্ত করা সম্ভব হয় নাই অদ্যাবধি। সর্বাপেক্ষা উদ্বেগজনক তথ্যটি হইল, শিরায় মাদকগ্রহণকারী ব্যক্তিদের মধ্যে এইচআইভির প্রকোপ নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পাইয়াছে। মাত্র এক বত্সরের ব্যবধানে বৃদ্ধির এই হার তিনগুণের কাছাকাছি। সরকারের  রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) ও আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআরবি)-এর  যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত সর্বশেষ রক্ত পরীক্ষাভিত্তিক এক জরিপে দেখা গিয়াছে, ঢাকার একটি অঞ্চলে শিরায় মাদকগ্রহণকারী ব্যক্তিদের ২৭ দশমিক ৩ শতাংশ এইচআইভিতে আক্রান্ত। এই জনগোষ্ঠীর চারজনে একজন এই রোগে আক্রান্ত। এই জরিপে বলা হইয়াছে, দেশে প্রথমবারের মতো নারী মাদকগ্রহণকারীদের মধ্যে এইচআইভি ঘনীভূত মহামারি আকারে দেখা দিয়াছে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও ভাইরাস বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মো. নজরুল ইসলাম পরিস্থিতিকে ‘আতঙ্কজনক’ আখ্যা দিয়ে বলিয়াছেন যে, শিরায় যাহারা মাদক নেয়, তাহারা এই সমাজেরই মানুষ। সমাজেই তাহাদের মেলামেশা। তাহাদের মাধ্যমে এইচআইভি সংক্রমণের ঝুঁকি বহুগুণে বৃদ্ধি পাইবে—ইহাই স্বাভাবিক। এই আশঙ্কা অমূলক নহে। সমাজে মাদকাসক্তের সংখ্যা যেই হারে বাড়িতেছে, তাহাতে এখনই যথাযথ সতর্কতামূলক ব্যবস্থাদি গৃহীত না হইলে পরিস্থিতির অবনতি অনিবার্য। বিশ্বব্যাপী যখন এইচআইভি সংক্রমণ কমিতেছে, তখন আমাদের দেশে তাহা বৃদ্ধি পাইবার কারণসমূহ জরুরিভিত্তিতে চিহ্নিত করা দরকার। মূল্যায়ন হওয়া দরকার বিদ্যমান সরকারি কর্মসূচি এবং কর্মসূচির সহিত সম্পৃক্ত এনজিওদের ভূমিকাও। বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো বিশেষ জনগোষ্ঠীর ৫ শতাংশ যদি কোনো রোগে আক্রান্ত হয়, তাহা হইলে পরিস্থিতিকে ঘনীভূত মহামারি বা কনসেন্ট্রেটেড এপিডেমিক বলা হইয়া থাকে। ঢাকা এ-১ অঞ্চলে বেশ কয়েক বছর ধরিয়াই এই পরিস্থিতি বিদ্যমান। আশার দিক হইল, সরকার এই বিষয়ে পূর্ণ সচেতন। স্বাস্থ্যমন্ত্রী দৃঢ়তার সঙ্গেই বলিয়াছেন যে, ২০৩০ সাল নাগাদ দেশ হইতে এইচআইভি/এইডস নির্মূলের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হইয়াছে, বাংলাদেশ তাহা অবশ্যই অর্জন করিতে পারিবে। স্বাস্থ্যমন্ত্রীর এই বক্তব্য যে নিছক কথার কথা মাত্র নহে—বিগত বত্সরগুলিতে স্বাস্থ্যখাতে অভূতপূর্ব সাফল্যই তাহার প্রমাণ। বলিবার কথা কেবল এইটুকু যে, এইচআইভি/এইডসকে বিন্দুমাত্র অবহেলা করা যাইবে না। এই ব্যাপারে মানুষের মধ্যে সার্বিক সচেতনতা যেমন বাড়াইতে হইবে, তেমনি গৃহীত কর্মসূচি বাস্তবায়নে কোনো প্রকার শৈথিল্য যেন না ঘটে—তাহাও নিশ্চিত করিতে হইবে। জোরদার করিতে হইবে মনিটরিং ব্যবস্থা।