দিন মাস বা সময়টাও জানা। এই ফেব্রুয়ারির বিকেলটা ঠিক যেন মিশে যাবে বাংলা একাডেমি বা সোহরাওয়ার্দীর বিকেলের সঙ্গে। এতটুকু অবসর মিললেই ছুটে যাওয়া অমর একুশে গ্রন্থমেলার দিকে। লেখক-পাঠক বা প্রকাশকের কত টুকরো-মেদুর স্মৃতি ঘুরে-ফিরে আসে এই বইমেলাকে ঘিরে।
এরও আগে বৃহস্পতিবার (১ ফেব্রুয়ারি) সকালে ‘যুদ্ধ গণহত্যা সহে না কবিতা’ প্রতিপাদ্যে দুই দিনের ৩৬তম জাতীয় কবিতা উৎসব শুরু হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার সংলগ্ন হাকিম চত্বরে জাতীয় কবিতা পরিষদের আয়োজনে এই উৎসব চলছে। কবি নির্মলেন্দু গুণ এক ভিডিও বার্তায় উৎসবের উদ্বোধন করেন।
কবিতা উৎসবে এসেছেন বিদেশের অনেক আমন্ত্রিত কবিই। প্রযুক্তির এই যুগে এসে কবিতার পাঠক কি হারিয়ে যাচ্ছে বা কবিতা কি আগের মতো আবেদন রাখতে পারছে না? এমন প্রশ্ন ছিল কয়েকজনের কাছে।
ত্রিপুরার কবি রাতুল দেব বর্মণ মনে করে করেন কবিতা কোনোদিন আবেদন হারাবে না। পৃথিবীব্যাপী যে যুদ্ধের উন্মাদনা চলছে তার জন্য সাহিত্যের প্রতিটি শাখাকেই একযোগে রুখে দাঁড়াতে হবে। যেটির অন্যতম মাধ্যম কবিরা। কোনো মানুষই কোনোদিন যুদ্ধ চায় না। মানুষ সবসময় শান্তিপ্রিয়। তিনি মনে করেন, কোনো প্রযুক্তিই কবিতাকে থামিয়ে রাখতে পারবে না। কবিতায় স্ব মহিমায় মুক্ত কথা বলবে।
কবি আকবর আহমেদ বলেন, ভাষা যদি জীবিত থাকে, মানুষ যতদিন বাঁচবে ততদিন পর্যন্ত কবিতা ও সাহিত্য থাকবে। আমরা টেকনোলজির কথা বলছি, এটা বহুযুগ ধরে চলে আসছে। প্রযুক্তিতো নিজে নিজে কিছু তৈরি করতে পারবে না। মানুষই তাকে চালিত করবে, কাজেই মানুষ যতদিন থাকবেন কবিতার আবেদনও ততদিন থাকবে।
তবে এই দুজনের বক্তব্যের সঙ্গে একমত নন ত্রিপুরার আরেক কবি দীলিপ দাস। তিনি কবি জয় গোস্বামীর একটি সমীক্ষার কথা উল্লেখ করেন, যেখানে তিনি দেখেছেন শতকরা ৭ জন লোক কবিতা পড়েন। সেই সমীক্ষাও অনেক আগের। এখন হয়তো সেটা শতকরা ২/৩ জনে নেমেছে। এমন কি কবিরাও কবিদের কবিতা পড়ে না। মানুষের এই কবিতা বিমুখতার কারণ কী? দীলিপ দাস বলেন, কবিদের প্রতি এখন শ্রদ্ধাবোধ কমে যাচ্ছে। কবিরাও সেই ধরনের কবিতা লিখতে পারছে না যে কবিতা মানুষকে আকৃষ্ট করে। কবিরা এখন নিজের কথা বলেন বেশি। মানুষের এত দুর্দশা আছে, কষ্ট আছে সেগুলো যদি কবিরা না বলেন তখন মানুষ কবিতা বিমুখ হবেন সেটাই স্বাভাবিক।
আসামের কবি চন্দ্রিমা দত্ত মনে করেন কবিতার কখনো মৃত্যু নেই। প্রযুক্তি যতোই আসুক এখনো কবিতার উৎসবে তরুণ তরুণীরা আসছেন এটা দেখে ভালো লাগে। তিনি মনে করেন, ভালো কবিতা লিখতে হলে সাধনা লাগে। একটি কবিতা লিখলাম ফেসবুকে পোস্ট করলাম কয়েকটি লাইক কমেন্ট পেলাম তাতেই কবি হয়ে যাওয়া হলো না। আরেক একটি বিষয় হলো মানুষের যাপিত জীবনের কষ্ট যত বেশি কবিরা অনুভব করতে পারবেন ততই কবিতা গণমুখী হবে।
বাংলাদেশের কবি রবীন্দ্র গোপ মনে করেন, সকাল থেকে রাত্রি পর্যন্ত জীবনকে নিয়ে যাওয়ার যে জটিলতা সেই জটিলতার কথা, কষ্ট ও মানুষের জীবনের কথা যদি কবিতায় উঠে না আসে তাহলে মানুষ সেটি গ্রহণ করবে না একই সঙ্গে আবেদনও হারাবে।
কবি আসলাম সানী মনে করেন, কবিতা গণমানুষের কাছে পৌঁছে গেছে সেটির আবেদন কখনো হারাবে না। আজকের যে স্মার্ট বাংলাদেশ এটিও এগিয়ে যাবে কবিতা, নাটক, গান এসবের মধ্য দিয়ে।
কবি মাহফুজা অনন্যা প্রযুক্তির যুগে কবিতা আবেদন হারাচ্ছে এ কথা মানতে রাজি নন। তিনি মনে করেন, প্রযুক্তির কল্যাণেই বরং দেশি-বিদেশি কবিদের কবিতা পাঠকের কাছাকাছি চলে এসেছে।