তবু কথা থাকে: তৃপ্তিতে অন্তর জুড়ায়

আপডেট : ০৯ মার্চ ২০২৫, ১১:৩৯

বাংলা সাহিত্যে সনেটের পরিসর খুব বেশি বিস্তৃত না হলেও, কিছু কবির অনবদ্য চর্চার মধ্য দিয়ে এ ধারাটি নতুন মাত্রা পেয়েছে। রফিক লিটনের তবু কথা থাকে সেই ধারারই এক গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। ২০২৫ সালের অমর একুশে বইমেলায় চৈতন্য প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত এই গ্রন্থটি পাঠকদের জন্য ভিন্ন স্বাদের অভিজ্ঞতা তৈরি করেছে। ৫৯টি সনেট নিয়ে রচিত এই বইয়ে কবি প্রেম, দ্রোহ, সমাজচেতনা ও মানবিকতার সুর বুনেছেন। এটি উৎসর্গ করা হয়েছে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের শহীদদের প্রতি, যা কবির রাজনৈতিক ও মানবিক দায়বদ্ধতাকে প্রকাশ করে।

রফিক লিটনের কবিতার বৈশিষ্ট্য হলো তার স্বতন্ত্র কাব্যভাষা ও গভীর দৃষ্টিভঙ্গি। তিনি চৌদ্দ পঙক্তির কাঠামোয় সীমাবদ্ধ থেকেও এক বিস্তৃত চিন্তার জগৎ তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন। মা শিরোনামের সনেটে তিনি লিখেছেন—

"মা'র অংশ নিয়ে পৃথিবীতে যারা করে বিচরণ—
জীবনের বিনিময় দাবি রাখে তাদের স্মরণ।"

এটি কেবল মায়ের প্রতি এক কবির শ্রদ্ধা নয়, বরং মাতৃত্বের মহিমাকে এক অনন্য উচ্চতায় তুলে ধরার প্রয়াস।

এ সনেটগুলোতে প্রেম যেমন রয়েছে, তেমনি সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতার ছোঁয়াও রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, কবি যখন লেখেন—

"মুক্তির পথ বলতে বলো; বলি শোনো
প্রেমিকার ঠোঁটে যদি দিতে পারো গান
ভরণ পোষণ আর সুসন্তান কোনো
তবে হতে পারে রক্তখেলা অবসান"

সমাজ, ইতিহাস ও রাজনীতি নিয়েও তিনি সমানভাবে সোচ্চার। শিল্পের শিল্পিত দিক কবিতায় উল্লেখ করেছেন—

"জয়নুলের দুর্ভিক্ষের চিত্র জড়িয়ে ধরেছে এ গলা"

এখানে তিনি শিল্পী জয়নুল আবেদিনের চিত্রকর্মের গভীর দুঃখবোধকে নিজের অস্তিত্বের সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছেন। অন্যদিকে, কিদংশ কবিতায় সমাজের নৃশংস বাস্তবতাকে তুলে ধরেছেন—

"মানুষের খুনে আজ মানুষের নির্জলা পুলক।"

এটি এক দুঃসহ সত্যের স্বীকারোক্তি, যেখানে মানবতা নিজেই বিপন্ন।

তার কবিতায় আশার আলোও দেখা যায়। অবসান কবিতায় তিনি লিখেছেন—

"উদ্ভিদের মতো আগামীর দিন বরণে উজালা।"

এটি ভবিষ্যতের প্রতি বিশ্বাস ও নতুন দিনের প্রতিশ্রুতি বহন করে। একইভাবে, অপূর্ব উজালা কবিতায় পাওয়া যায় এক সূক্ষ্ম দর্শন—

"কীর্তিরা কত বড় হলো অবহেলা ছাড়া ভূ-ভাগ।"

এখানে কবি সমাজের মূল্যবোধের পরিবর্তন নিয়ে ইঙ্গিত দিয়েছেন।

রফিক লিটন প্রেম নিয়েও অনবদ্য সনেট রচনা করেছেন। ক্রমধারা কবিতায় তিনি প্রেমের শক্তিকে ব্যাখ্যা করেছেন—

"প্রকৃতির ধাক্কা খেয়ে যদি ফিরে হুশ,
প্রেমের বাতাস লেগে ওড়বে ফানুশ।"

এই পঙক্তিগুলো প্রেমের পুনর্জাগরণ ও তার বিশুদ্ধতার প্রতি কবির বিশ্বাসকে প্রকাশ করে।

সব মিলিয়ে, তবু কথা থাকে শুধু প্রেম, দ্রোহ বা সমাজের প্রতিবাদ নয়, বরং এটি সময়ের এক প্রামাণ্য দলিল। এটি পাঠকের মনে দীর্ঘস্থায়ী দাগ কাটবে এবং বাংলা সাহিত্যের সনেট ধারাকে আরও সমৃদ্ধ করবে।

ইত্তেফাক/এমএএম