বিশ্বের ১০০ কোটিরও অধিক প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর প্রায় ৯ কোটি ৩০ লাখ প্রতিবন্ধী শিশু; যা মোট জনগোষ্ঠীর ৯ শতাংশ। এই বৃহত্ জনগোষ্ঠীর চার ভাগের তিন ভাগই শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত; যার মধ্যে ৪০% প্রতিবন্ধী শিশুর বসবাস আমাদের মত উন্নয়নশীল দেশে। শিক্ষার অধিকার মৌলিক মানবাধিকার। মৌলিক মানবাধিকার সুনিশ্চিতকরণে প্রয়োজন সাম্য ও অভিন্ন যাত্রায় প্রতিবন্ধী শিশুর শিক্ষা কার্যক্রমের যথাযথ বাস্তবায়ন। তাহলেই কেবল সম্ভব হয়ে উঠবে প্রতিবন্ধী শিশুর পরিপূর্ণ বিকাশ। আজ ২৭তম আন্তর্জাতিক ও ২০তম জাতীয় প্রতিবন্ধী দিবস। দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য বিষয়ও তাই: ‘সাম্য ও অভিন্ন যাত্রায় প্রতিবন্ধী ব্যক্তির ক্ষমতায়ন’। প্রতিবন্ধী ব্যক্তির ক্ষমতায়নে সাম্যের পাশাপাশি প্রয়োজন ন্যায্যতা। ন্যায্যতা না থাকলে শুধু সাম্য দিয়ে সমতায় পৌঁছা সম্ভব্য নয়। তাই এবারের প্রতিপাদ্য বিষয় বেশ তাত্পর্যময়। চাকরির ক্ষেত্রে যদি সব ধরনের কোটা উঠিয়ে দিয়ে সবার সমান অধিকার প্রতিষ্ঠা করা হয় তাহলে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীরা ন্যায্যতা থেকে বঞ্চিত হবে। একজন সেরিব্রাল পালসিতে আক্রান্ত প্রতিবন্ধী শিশু যথেষ্ট প্রতিভাবান হওয়া সত্ত্বেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে তার হাত দিয়ে সে দ্রুততার সাথে লিখতে পারে না। এজন্য ন্যায্যতা নিশ্চিত করতে তার জন্য পরীক্ষায় অতিরিক্ত সময় দেওয়া দরকার।
বিইডিপি তথ্যমতে, বাংলাদেশে ১৬ মিলিয়ন শিশু ৮০ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশুনা করছে। তথাপি এখনও অনেক শিশু আছে যারা শারীরিক বা অন্য কোনো প্রতিবন্ধকতার শিকার, আর্থ-সামাজিকভাবে ঝুঁকিগ্রস্ততা, দারিদ্র্য, দুর্গম এলাকায় বসবাস, পথশিশু কিংবা উপজাতি শিশু হওয়ার কারণে তারা বিদ্যালয়ে আসতে পারে না। এ সকল শিশুকে সাধারণ শিশুদের সাথে একই বিদ্যালয়ে কিংবা বিশেষায়িত বিদ্যালয়ে অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি। বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষা আইন ১৯৯০-এ বলা হয়েছে শিক্ষক স্বল্পতা, পর্যাপ্ত শিক্ষা উপকরণ অথবা স্থানের অভাবে কোনো শিশুকে শিক্ষা থেকে বঞ্চিত করা যাবে না এবং জেন্ডার, বয়স, আয়, পরিবার, সাংস্কৃতিক বা উপজাতি পার্থক্য বা ভৌগোলিক দূরত্বের কারণে কোনো শিশুর প্রাথমিক শিক্ষালাভে বৈষম্য সৃষ্টি করা যাবে না। তাছাড়া জাতিসংঘ ঘোষিত প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার সনদের ২৪ ধারায়ও প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের শিক্ষা লাভের ক্ষেত্রে একটি একীভূত শিক্ষা ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে। জাতীয় শিক্ষা নীতি-২০১০ ‘প্রাথমিক শিক্ষার মেয়াদ ও বাস্তবায়ন’ একুশ হতে তেইশ ধারায় বর্ণিত আছে ‘সবধরনের প্রতিবন্ধিতার জন্য প্রয়োজনানুসারে বিদ্যালয়গুলোতে প্রতিবন্ধীবান্ধব সুযোগ-সুবিধা, যেমন:শৌচাগার ব্যবহারসহ অন্যান্য সুযোগ নিশ্চিত করা, প্রতিবন্ধীদের বিশেষ প্রয়োজনকে অগ্রাধিকারভিত্তিতে বিশেষ বিবেচনা করা এবং প্রত্যেক পিটিআইতে বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষাদান পদ্ধতির ওপর কমপক্ষে একজন প্রশিক্ষককে প্রশিক্ষণ দেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে।
বাংলাদেশে ২০০৩ সালের বিশ্বব্যাংক জরিপ অনুযায়ী ৩৫ লাখ প্রতিবন্ধী শিশু রয়েছে, যা বৃদ্ধি পেয়ে বর্তমানে প্রায় ৪৫ লাখের ওপরে। কিন্তু গৃহীত পদক্ষেপগুলো যথাযথ বাস্তবায়ন না হওয়ায় আমাদের দেশে মোট প্রতিবন্ধী শিশুর মাত্র ১৭% শিশু স্কুলগামী হচ্ছে; যার মধ্যে মৃদু প্রতিবন্ধী শিশুদের সংখ্যাই অধিক। অপরদিকে একীভূত শিক্ষা কার্যক্রম বিষয়ে শিক্ষাদান পর্যায়ের কারো কারো মনে এখনও কিছু ভ্রান্ত ধারণা আছে। তারা মনে করেন, মাঝারি ও উচ্চমাত্রার প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য একীভূত শিক্ষা ব্যবস্থা শুধু কাগজে-কলমে সম্ভব, বাস্তবে নয়। কিন্তু গবেষণায় প্রমাণিত, প্রতিবন্ধী শিশুদের প্রায় ৬০% সামান্য বা কোনো পরিবর্তন ছাড়াই মূলধারার শিক্ষায় প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে। ২০% প্রতিবন্ধী শিশু আনুষ্ঠানিক প্রাথমিক শিক্ষা নিতে পারে সামান্য অভিযোজনের মাধ্যমে। কেবল বাকী ২০% উচ্চমাত্রা বা চরম প্রতিবন্ধী শিশুদের ক্ষেত্রে তা হয়তো বা প্রযোজ্য নাও হতে পারে; প্রয়োজন হতে পারে বিশেষায়িত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।
বাংলাদেশে সরকারি ও এনজিওর বিশেষায়িত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বর্তমানে প্রায় ২২ থেকে ২৫ হাজার শ্রবণ, দৃষ্টি, বুদ্ধি প্রতিবন্ধী ও অটিস্টিক শিশু পড়ার সুযোগ পাচ্ছে। এই বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানগুলোর বেশির ভাগই গুরুত্বপূর্ণ শহরে; যা অনেকাংশে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য অত্যন্ত ব্যয়বহুল। তাই সকল ধরনের সকল মাত্রার প্রতিবন্ধী শিশুকে স্কুলগামী করণে প্রয়োজন একীভূত ও বিশেষায়িত শিক্ষা ব্যবস্থার সমন্বয়। এ প্রেক্ষিতে বর্তমান সরকারের সাম্প্রতিক উদ্যোগ দেশের প্রতি উপজেলায় কমপেক্ষ একটি করে বিশেষায়িত বিদ্যালয় এমপিওভুক্তকরণ নিঃসন্দেহে সময়োপযোগী পদক্ষেপ। কিন্তু উদ্যোগ নেওয়ার তিন বছর পেরিয়ে গেলেও এ পর্যন্ত জেলা ও উপজেলায় পর্যায়ে স্থাপিত অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের সরকারি স্বীকৃতি ও এমপিওভুক্তকরণ নিশ্চিত করা হয়নি যা দুঃখজনক।
প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের শিক্ষার অধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে আমাদের পরামর্শ হলো- প্রতিটি নবনির্মিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শারীরিক প্রতিবন্ধী ছাত্র-ছাত্রীদের চলাচলের জন্য ঢালু সিঁড়ি ও হুইল চেয়ার ব্যবহারকারীদের জন্য উপযোগী টয়লেট নির্মাণ, শ্রেণিকক্ষ সুবিধাজনক স্থানে বিশেষ করে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য নীচতলায় করা, তাদের কথা বিবেচনায় এনে শ্রেণিকক্ষের আসন ব্যবস্থা পুনর্বিন্যাস যেমন প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষের সামনের আসনগুলোতে বসানো, সম্ভব হলে শ্রেণিকক্ষের আলোচনা রেকর্ড করার জন্য প্রয়োজনীয় বিদ্যুত্ সরবরাহের ব্যবস্থা করা এবং বিনামূল্যে বইয়ের পাশাপাশি উপকরণ প্রদান ও অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তাদের ভর্তি বা কোটা সংরক্ষণ করা। তাছাড়া শ্রেণিকক্ষে ‘বিশেষ চাহিদা’ সম্পন্ন শিক্ষার্থীদের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া এবং সহপাঠীরা যাতে তাদের সাথে ভালো আচরণ করে সে ধরনের পরিবেশ সৃষ্টি করা, ক্রীড়া ও বিনোদনমূলক অনুষ্ঠানে তাদের অংশগ্রহণের সুযোগ করে দেওয়া । সকল শিক্ষকদের একীভূত বিষয়ক প্রশিক্ষণ প্রদান এবং বিশেষায়িত বিদ্যালয়ে বিএসএড (ব্যাচেলর অব স্পেশাল অ্যাডুকেশন) গ্রহণ বাধ্যতামূলক করা। শিক্ষকদের প্রতিবন্ধী শিশুদের পাঠদানে কমপক্ষে একটি বিদ্যালয়ে কমপক্ষে একজন শিক্ষককে ব্রেইল, ইশারা ভাষার ওপর বিশেষ প্রশিক্ষণ প্রদান করা ইত্যাদি।
n লেখক: প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারপারসন, মৃত্তিকা
প্রতিবন্ধী ফাউণ্ডেশন
mahbuburrahman77@gmail.com