ভিডিও গেমের ইতিবাচক দিকগুলো

বর্তমান বিশ্বে বিনোদনের সবচেয়ে জনপ্রিয় মাধ্যমগুলোর মধ্যে ভিডিও গেম উল্লেখযোগ্য। শিশু থেকে বৃদ্ধ প্রায় সব বয়সি মানুষই গেম খেলতে ভালোবাসে। বর্তমান ডিজিটাল যুগে কম্পিউটার, ল্যাপটপ, কনসোল, ট্যাব, স্মার্টফোন ছাড়াও বিভিন্ন মাধ্যমে গেম খেলা যায়। গেমের উদ্ভব বা উত্স খুবই প্রাচীন। এমনকি প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে প্রাচীন গ্রিসে বিখ্যাত দার্শনিক প্লুটো তাঁর ‘দ্য রিপাবলিক’ বইয়ে গেমের মাধ্যমে শিক্ষালাভ করার এক অভিনব ধারণা প্রণয়ন করেন। গেমটি একে-অপরের সঙ্গে প্রশ্ন-উত্তরের মাধ্যমে খেলা হতো। স্বয়ং সক্রেটিসও এই গেমটি খেলতেন। শতাব্দীর পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বর্তমানে এমন সব বুদ্ধি ও কৌশলভিত্তিক, ঐতিহাসিক, রাজনৈতিক ও শিক্ষামূলক বিভিন্ন ধরনের গেম তৈরি করা হয়েছে, যার মাধ্যমে বিনোদনের পাশাপাশি জ্ঞানবুদ্ধির চর্চা করাও সম্ভব।

উন্নত বিশ্বে যেখানে ভিডিও গেমকে কীভাবে বিনোদনের পাশাপাশি শিক্ষা ও জ্ঞান বৃদ্ধির ক্ষেত্রে সহায়ক হিসেবে সৃষ্টি করা যায়, তা নিয়ে নিত্যনতুন গবেষণা করা হচ্ছে সেখানে আমাদের সমাজের অনেকেই ভিডিও গেমকে শত্রু হিসেবে বিবেচনা করছেন। তারা ভিডিও গেমের ইতিবাচক দিকগুলো তুলে না ধরে মনগড়া যুক্তি দিয়ে বিভিন্ন নেতিবাচক প্রতিবেদন বা প্রচারণা তৈরি করে যাচ্ছেন। এমনিতেই আমাদের দেশের মানুষ ভিডিও গেম নিয়ে উন্নত বিশ্বের মানুষের মতো ধ্যানধারণা পোষণ করেন না। সেই সঙ্গে এসব প্রতিবেদন দেখার ফলে বিভ্রান্ত হয়ে অনেক বাবা-মা তাদের সন্তানদের জন্য ইতিবাচক গেমগুলো খেলা থেকেও বিরত রাখছেন।

ভিডিও গেমের অনেক ইতিবাচক দিক আছে। তার মধ্যে মূল একটি দিক নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে, যেটি হচ্ছে শিক্ষামূলক দিক। একটি গবেষণায় দেখা গেছে ছাত্রদেরকে বইয়ের প্রতি আগ্রহী করতেও ভিডিও গেম প্রভাব বিস্তার করতে পারে। গবেষণা মতে, ‘এইজ অব মিথোলজি’ নামক একটি ভিডিও গেম খেলার পর কিছু ছাত্র মিথোলজির প্রতি আকৃষ্ট হয়ে মিথোলজি বা পৌরাণিক বই পড়তে কিংবা পৌরাণিক বিভিন্ন চরিত্র নিয়ে আলোচনা করতে আগ্রহী হয়ে ওঠে। এছাড়াও উন্নত বিশ্বে ক্লাসরুমে ভিডিও গেমের মাধ্যমে গ্রামার, ভোকাবুলারি এবং অঙ্ক শিক্ষাও দেওয়া হচ্ছে। সেই সঙ্গে গেম খেলার মাধ্যমে লিসেনিং এবং রিডিং স্কিল বাড়ানো সম্ভব। ক্রুসেডার কিং, ভিক্টোরিয়া, মেডিয়েভাল, এনসিয়েন্ট রোম, নেপোলিয়নসহ বিভিন্ন ভিডিও গেম খেলার মাধ্যমে পৃথিবীর বিভিন্ন সময়ের ইতিহাস সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করা সম্ভব। এসব কৌশলভিত্তিক গেমের মাধ্যমে বুদ্ধিবৃত্তির চর্চাও হয়ে ওঠে। বুদ্ধিভিত্তিক গেম মানসিক বিকাশেও সহায়ক হয়।

ভিডিও গেমের উত্তরোত্তর সফলতার ফলে উন্নত মানের গ্রাফিক্স প্রযুক্তি ব্যবহার করে এমন সব গেম তৈরি করা হচ্ছে যেগুলো খেলার মাধ্যমে গেমাররা শুধু ইতিহাসই নয় বরং বিভিন্ন যুগের স্মৃতিচিহ্ন, শিল্পকলা, ঐতিহাসিক স্থাপনা ইত্যাদি চোখের সামনেই দেখতে পাচ্ছে। এসেসিনস্ ক্রিড সিরিজের গেমগুলোর মাধ্যমে ইতালিয়ান রেনেসাঁ যুগ, কলোনিয়াল যুগ, ভিক্টোরিয়ান যুগ, মিশরীয় সভ্যতার যুগ, আমেরিকান ও ফরাসি বিপ্লবের পটভূমি নিয়ে তৈরি করা হয়েছে। এই সিরিজের সদ্য মুক্তিপ্রাপ্ত গেম ‘ওডিসি’ প্রাচীন গ্রিসের খ্রিষ্টপূর্ব ৪৩১ সালের অ্যাথেন্স ও স্পার্টার ঐতিহাসিক যুদ্ধকে কেন্দ্র করে তৈরি করা হয়েছে। জিটিএ কিংবা ফার ক্রাইয়ের মতো ওপেন ওয়ার্ল্ড গেমগুলো বিভিন্ন শহরের সঙ্গে মিল রেখে তৈরি করা হচ্ছে। ফলে খুব সহজেই এগুলো খেলার মাধ্যমে বিভিন্ন শহর বা দেশ সম্পর্কে জানা যাচ্ছে। যুদ্ধভিত্তিক গেমগুলোতে যদিও মারামারির দৃশ্য রয়েছে। তবে এসব যুদ্ধের মাধ্যমে ইতিহাস বা বিভিন্ন প্রেক্ষাপট খুব সহজেই তুলে ধরা হয়। গেমাররা এর ইতিবাচক দিকগুলো গ্রহণ করছে কি না এ বিষয়ে তাদের বাবা-মা নজরদারি করতে পারেন। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের ঘটনা ও পটভূমি তুলে ধরেও উন্নত মানের ভিডিও গেম বানানো যেতে পারে। এতে নতুন প্রজন্মের ক্ষতি হবে না বরং তারা মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস সহজ ও সুন্দর উপায়ে জানতে পারবে। ফলে তাদের মধ্যে দেশপ্রেম বৃদ্ধি পাবে।

বাড়ন্ত বয়সি অনেক ছেলেমেয়ে আজকাল খারাপ সঙ্গ, আড্ডা কিংবা মাদকের মতো ভয়াবহ দিকে ঝুঁকে পড়ছে। বিভিন্ন এলাকায় গড়ে তুলছে কথিত গ্যাং বা মাস্তান বাহিনী। এক্ষেত্রে ভালো ভালো গেম খেলার মাধ্যমে তারা বিনোদন ও জ্ঞানলাভের পাশপাশি এসব ঝুঁকি থেকে নিরাপদ দূরত্বে থাকতে পারে।

n লেখক :শিক্ষার্থী, ইংরেজি বিভাগ (অনার্স), খিলগাও মডেল বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ, ঢাকা