হাটিকুমরুল-বনপাড়া মহাসড়ক
ক্লিপ, নাটবল্টু, হুক, ফিসপ্লেট, হুকবোল্ড খোলা!
মো. আবদুল কুদ্দুস, লাকসাম (কুমিল্লা) সংবাদদাতা
পূর্বাঞ্চলীয় রেলওয়ের গেটওয়ে খ্যাত লাকসাম অঞ্চলে রেলপথের বিভিন্ন স্থানে প্রায় সময়ই খোলা থাকে ফিসপ্লেট, ক্লিপ, হুক, নাটবল্টু, হুকবোল্ডসহ অন্যান্য যন্ত্রাংশ। এমনকি রেললাইন মজবুত ও স্থিতিশীল রাখতে স্থাপিত স্লিপারগুলোর অবস্থাও নাজুক। আর সবচে আতঙ্কের বিষয় হচ্ছে—রেলসেতুর মূল অংশের সঙ্গে স্লিপারের সংযোগকারী হুক বোল্ডগুলো সরে গেছে। আবার অনেক স্থানে ব্রিজের মূল অংশের লোহার প্লেট জোড়া লাগানোর স্থায়ী জয়েন্ট নাটগুলো জং ধরে খসে পড়েছে। এতে সেতুর সঙ্গে সংযোগহীন রেললাইনে যে কোনো সময় ট্রেন লাইনচ্যুত হয়ে যাত্রীসাধারণের প্রাণহানির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
লাকসাম রেলওয়ে জংশন থেকে ঢাকা, সিলেট, চট্টগ্রাম, নোয়াখালী ও চাঁদপুর রুটে রাত-দিন অসংখ্য ট্রেন চলাচল করে থাকে। রুটগুলোর মধ্যে লাকসাম-চট্টগ্রাম ডাবল লাইনের পর লাকসাম-আখাউড়া ডাবল লাইনের কাজ চলছে। অন্যদিকে, লাকসাম-নোয়াখালী ও লাকসাম চাঁদপুর রুটের বিভিন্ন স্থানে রেলসেতুর অবস্থা নাজুক আর লাইনের অনেক স্থানে রয়েছে ভাঙা স্লিপার, ক্লিপ-হুক, খোলা নাটবল্টু ও ফিসপ্লেট।
লাকসাম রেলওয়ে জংশন স্টেশন থেকে চিতোষী রেলওয়ে স্টেশন পর্যন্ত সরেজমিনে দেখা গেছে, লাকসাম পৌরসভার পেয়ারাপুর নামক স্থানের রেল সেতুটির অনেক স্থানে স্লিপার ভাঙা, খসে খসে পড়ছে। আর নিচ থেকে রেল সেতুর মূল অংশের সঙ্গে স্লিপারের সংযোগকারী হুকবোল্ড সরে গেছে। এ সেতুর চাইতেও খারাপ অবস্থা উপজেলার কাগৈয়া ব্রিজের। এ ব্রিজের অনেকগুলো স্লিপার ভাঙা ও পচে গেছে। অনেক স্থানে নাটবল্টু, ক্লিপ-হুক, ফিসপ্লেট খোলা। মূল আতঙ্কের বিষয় হলো- সেতুটির মূল অংশের লোহার প্লেটগুলোর সংযোগকারী স্থায়ী জয়েন্টগুলো জং ধরে খসে গেছে। আবার ব্রিজের মূল লোহার প্লেটের সঙ্গে স্লিপারের সংযোগকারী এঙ্গেল নাটের (হুকবোল্ড) ৯৫ ভাগেরই কোনো সংযোগ নেই। এতে অনেকটা অরক্ষিত হয়ে পড়েছে সেতুটি।
অন্যদিকে, কাগৈয়া রেলসেতুর পশ্চিমপাড়ে অবস্থিত ফুলহরা গ্রামের মোবারক হোসেন, শাহেদসহ কয়েজন স্থানীয় বাসিন্দা জানান, এ ব্রিজে ট্রেন উঠলে বিকট শব্দ হয়। ব্রিজের হুকবোল্ডগুলোর ৯৫ ভাগ খোলা। বেশিরভাগ স্লিপার ভাঙা, হুক, ফিসপ্লেট, নাটবল্টু খোলা। তাছাড়া এ ব্রিজের ওপর দিয়ে স্থানীয় কাগৈয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা যাতায়াত করে। ব্রিজের কাছাকাছি দূরত্বে ট্রেনগুলো হুইসেল দেয় না। কোনোরকম দুর্ঘটনা হলে এ এলাকায় মারাত্মক বিপর্যয় নেমে আসবে। আর লাইন মেরামতকারীরা নিয়মিত আসে না। কয়েকদিন পর আসলেও তারা রেললাইনের পাশের গাছ কাটা হলো কিনা— সে বিষয়েই ব্যস্ত থাকে।
ব্রিজের পূর্বপাড়ের চা দোকানদার আবুল কালাম জানান, এ সেতুটি বুড়ো হয়ে গেছে। নাটবল্টু, হুকবোল্ড, স্লিপার, ফিসপ্লেট ঠিক নেই। যেকোনো সময় ট্রেন এক্সিডেন্ট হতে পারে। আমরা এলাকাবাসী সরকারের কাছে ব্রিজটি দ্রুত পুনঃনির্মাণের আবেদন জানাই।
লাকসাম রেলওয়ে জংশনের স্টেশন মাস্টার কামরুল হাসান তালুকদার জানান, লাকসাম রেলওয়ে জংশন ঢাকা, চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, সিলেট, চাঁদপুর এ ৫ রেলপথের মোহনা। লাকসাম রেলওয়ে জংশনের ৫টি রেলপথে প্রতিদিন আন্তঃনগর, লোকাল, কমিউটার ও মেইল ট্রেনসহ ৩৮টি ট্রেন আসা-যাওয়া করে। স্টেশনের প্লাটফর্মে ট্রেন চলাচলের জন্য ১১টি পৃথক লাইন রয়েছে। তন্মধ্যে ১টি রেললাইন পরিত্যক্ত হয়ে পড়ায় সেটি সাইডিং এবং ৩টি গুডস-এর কাজে ব্যবহূত হয়। বাকি ৭টি লাইন দিয়ে ট্রেন চলাচল করে। প্রয়োজনীয় সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়ে স্টেশন মাস্টার বলেন, এ বিষয়টি রেলওয়ের প্রকৌশল বিভাগ দেখাশুনা করে।
পূর্বাঞ্চলীয় রেলপথের লাকসাম অঞ্চলের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকৌশলী (আইডব্লিউ) মো. জিল্লুর রহমান বলেন, নিয়মিতভাবে রেলপথের মেরামত কাজ হয়। একবারেই এ কাজ শেষ হয় না। তবে দুর্ঘটনা এড়ানোর জন্য আমাদের চেষ্টা অব্যাহত আছে। ঝুঁকিপূর্ণ সেতুর বিষয়ে এ কর্মকর্তা বলেন, এ অঞ্চলের রেললাইন ও সেতুগুলো পরিদর্শন করা হয়েছে। দু-একদিনের মধ্যেই ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নিকট প্রতিবেদন দাখিল করা হবে। আশা করি শিগগিরই সেতুগুলোর সংস্কার কাজ শুরু হবে। তিনি বলেন, রেললাইনের যেসব স্থানে পাথর নেই, সেসব স্থানে পাথর দেয়ার কাজ চলমান রয়েছে।