‘চোলি কে পিছে কেয়া হ্যায়’ ১৯৯৩ সালে মুক্তি পাওয়া সুভাষ ঘাইয়ের ‘খলনায়ক’ সিনেমার এ গানটি ঘুম কেড়ে নিয়েছিল উপমহাদেশের হাজারো তরুণের। তখন ভারতের অলিগলিতে দাঁড়িয়ে থাকা বখাটেরা শাড়ি পরা মেয়ে দেখলেই বলে উঠত, ‘চোলি কে পিছে কেয়া হ্যায়?’। প্রসঙ্গত, গানটি একটি লোকসংগীত। আঞ্চলিক ভাষায় চোলি মানে ব্লাউজ। তাই ওই সময় গানটিকে ‘অশ্লীল’ আখ্যা দিয়ে নানা বিতর্ক হয়। ছবিটি মুক্তি পাবার পর গানটির বিরুদ্ধে প্রতিবাদও হয়েছিল।
নজরুলের ‘তুমি সুন্দর তাই চেয়ে থাকি প্রিয়, সেকি মোর অপরাধ?’, বা কিশোর কুমারের ‘আহা! কী দারুণ দেখতে! চোখ দুটো টানা টানা/যেন শুধু বলে কাছে আসতে।’ কিংবা নচিকেতার জনপ্রিয় গান ‘লাল ফিতে সাদা মোজা সু-স্কুলের ইউনিফর্ম/ন’টার সাইরেন সংকেত, সিলেবাসে মনোযোগ কম/পড়া ফেলে এক ছুট ছুটে রাস্তার মোড়ে...’ এক হুজুর বলল, এইসব অশ্লীল গানই সমাজটারে নষ্ট করছে। পোলাপানগুলারে নির্লজ্জ বানাইছে। কথাটা সম্পূর্ণ মিথ্যাও না। বখাটে ছেলেরা ইভ টিজিং-এর সময় এমন গানের লাইনগুলোই গলা চড়িয়ে গেয়ে ওঠে। কিন্তু এগুলো প্রেমের গান হিসেবেই সর্বজনস্বীকৃত বলেই জানি। কথা হচ্ছে, এগুলো কি বর্তমানে ইভ টিজিং-এর প্রধান সহায়ক? তাহলে কি প্রেমের গানের অধিকাংশই ইভ টিজিং ধরনের গান!
একসময় ‘কে তুমি নন্দিনী? আগে তো দেখিনি’ গানের লাইনটি অলিগলির ইভ টিজারদের মাঝে তুমুল জনপ্রিয় ছিল। অথচ মান্না দে যদি জানতেন হতচ্ছাড়া বখাটের দল তাঁর এই কালজয়ী প্রেমের গানকে ইভ টিজিং-এর জাতীয় সংগীত বানিয়ে ফেলেছে, তাহলে নির্ঘাত তিনি গজল গাইতে বসতেন।
সেদিন এক আড্ডায় একজন তো রীতিমতো বলেই বসলেন, জেমস হচ্ছে ইভ টিজিং-এর জনক, তার ‘দুষ্ট ছেলের দল’ গানের লিরিক ‘সুন্দরী মেয়ে দেখে বাজাই শিস’, এই গানের ভক্তরাই এখন ইভ টিজিং করে। একজন জেমস-ভক্ত হিসেবে কথাটা শুনে বেশ খারাপ লেগেছিল, কিন্তু তর্কে যেতে পারিনি কারণ গানের লাইনটাই এমন।
১৯৭৮ সালের দিকে খুরশীদ আলমের জনপ্রিয় গান ‘চুমকি চলেছে একা পথে/সঙ্গী হলে দোষ কি তাতে’ গানটি গেয়ে দূর থেকে মেয়েদের পিছু নিত ছেলেরা। পরে যখন ২০০২ সালে পান্থ কানাই গানটি রিমিক্স করে আবার বাজারে ছাড়েন, তখন টিজাররা তা ইভ টিজিং করার ‘লাইসেন্সড সঙ’ হিসেবে গ্রহণ করে। এখন আর দূর থেকে পিছু নেয় না, একবারে ঝাঁপিয়ে পড়ে!
২০১৬ সালের দিকে পয়লা বৈশাখ নিয়ে কালজয়ী গান ‘মেলায় যাই রে’র একটি লাইন নিয়ে বেশ বিতর্ক উঠেছিল। ‘বখাটে ছেলেদের ভিড়ে ললনাদের রেহাই নাই’ বাক্যের ‘বখাটে’ শব্দ পরিবর্তনের দাবিও উঠেছিল। পরবর্তীসময়ে গানটির রচয়িতা ও গায়ক মাকসুদুল হক লিখেছিলেন, ‘‘... ১৯৮৮ সালে গানটি লেখার সময় এই শব্দ ব্যবহার করতে বাধ্য হয়েছিলাম। কারণ, ভদ্র ভাষায় এই সব কুলাঙ্গার দানবদের শনাক্ত করতে এরচেয়ে ‘শক্ত গালি’ আমার কাছে ছিল না।’’ পরে তিনি এই গানের লাইন অপরিবর্তিত রেখে একটা কাউন্টার ক্যাম্পেইনের কথা বলেন, ‘ললনারা দৌড়ান দিলে, বখাটেদের রেহাই নাই’।
একবার মোহাম্মদপুরে দেখলাম, দুই ছাত্রী বড়ো রাস্তা ছেড়ে স্কুলের গলিতে ঢুকতেই ভেসে এল, ‘কী করে তোকে বলব, তুই যে আমার...।’ লম্বা চুল, শুকনো চেহারার উঠতি যুবক দুই ছাত্রীর উদ্দেশে ছুড়ে দিয়েছে বাংলা ছবির এই গানের কলি। মাথা নিচু করে পা চালিয়ে স্কুলে ঢুকে পড়ল দুই ছাত্রী। বর্তমানে এসব উপেক্ষা করেই স্কুল-কলেজে যাতায়াত করতে হয় মেয়েদের। মাঝে মধ্যে সহ্যের সীমা ছাড়ায় এই রোমিওরা।
আমাদের দেশের অধিকাংশ মেয়েই লজ্জাবতী এবং রক্ষণশীল মনের। তারা সচরাচর আগ বাড়িয়ে ছেলেদের কাছে আসে না। তাই প্রেম নিবেদনের দায়িত্বটি ছেলেদের ঘাড়েই পড়ে। ধরুন, আমি আজ কাউকে রাস্তায় দাঁড় করিয়ে প্রেম নিবেদন করলাম। এটা সাধারণ ইভ টিজিং বলতে পারেন। এখন এটা ইভ-এর ওপর নির্ভর করছে সে এটাকে টিজিং বলবে নাকি প্রেম নিবেদন বলবে। এখানে ইভ-এর মানসিক বোধ যেমন গুরুত্বপূর্ণ, ঠিক তেমনি গুরুত্বপূর্ণ ছেলেটির প্রেম নিবেদন প্রক্রিয়াটি কতটা সভ্যতা কিংবা অসভ্যতার পর্যায়ে রয়েছে।
বলতে পারেন, ইভ টিজিং তো আরো নানাবিধ উপায়ে করা হতে পারে, তবে উদাহরণ কেন শুধু গানের? কারণ, প্রথমত, টিজাররা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে গানই ব্যবহার করে। অশ্লীল কবিতা, গল্প এবং উক্তিও অবশ্য তাদের শেখানো হয় ঠিকই, তবে তার ব্যবহার ওরা একটু কমই করে। দ্বিতীয়ত, গানের আবেদন তরুণদের ওপর বেশ প্রবল। খেয়াল করলে দেখবেন, একজন নিরক্ষর মানুষও একটি কঠিন গান মুখস্থ করে ফেলতে পারেন অনায়াসে। শুধু তাই নয়, অন্যান্য বিষয়ের চেয়ে গানই তরুণেরা বেশি সময় ধরে মনে রাখেন এবং চর্চা করেন। এমনকি খুঁজে খুঁজে তারা টিজার গানগুলো বের করেন। তাই গানের কথা তরুণদের জন্য বেশ গুরুত্বপূর্ণ এবং তাদের মধ্যে গভীর ব্যঞ্জনা সৃষ্টি করে।
কোনো শিল্পীর গাওয়া গান বা কোনো গীতিকারের লেখা গান ইভ টিজারদের মুখে মুখে থাকুক এটা কোনো গায়ক বা গীতিকারের নিশ্চয়ই কাম্য হতে পারে না। তাই গান গাওয়া, লেখা এবং বাজারজাতকরণের ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া উচিত। এখানেই উপসংহার টানতে চেয়েছিলাম, কিন্তু হঠাৎ মনে হলো, বিষয়টি একান্ত ব্যক্তিগত বলে এই লেখা কারো কারো কাছে গুরুত্বহীন বলে মনে হতে পারে। আসলে কিন্তু তা নয়, আমাদের মনে রাখতে হবে, এই সমাজ কিন্তু আপনার বা আমার ‘ব্যক্তিগত’ কর্মকাণ্ডেরই সমন্বিত রূপ। সুতরাং, মানুষের জন্য সুস্থ বিনোদন ও মানসিক শান্তির মাধ্যম হয়ে থাকুক গানের জগৎ।