ভোটের আগে ডিজিটাল বিভ্রান্তি, আড়ালে বাস্তব জনমত

আপডেট : ৩০ জানুয়ারি ২০২৬, ১১:১০

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও সম্ভাব্য গণভোটকে সামনে রেখে বাংলাদেশের রাজনীতি এখন আর শুধু মিটিং-মিছিল, পোস্টার কিংবা নির্বাচনী জনসভায় সীমাবদ্ধ নেই। রাজনীতির একটি বড় অংশ সরে গেছে ডিজিটাল পরিসরে- ফেসবুক টাইমলাইন, ইউটিউব শর্টস, টিকটক ভিডিও এবং এক্স (টুইটার) থ্রেডে। কিন্তু এই ডিজিটাল রাজনীতির সবচেয়ে বড় সংকট হলো, এখানে যা দেখা যায় তার সবটাই বাস্তব নয়। বরং অনেক সময় দৃশ্যমানতাই বাস্তবতার জায়গা দখল করে নেয়। ফলে সোশ্যাল মিডিয়ায় তৈরি হয় এক ধরনের ভ্রান্ত ধারণা, যেখানে গুজব, অপতথ্য ও পরিকল্পিত বিভ্রান্তি মিলেমিশে এক ধরনের “কৃত্রিম জনমত” তৈরি করে।

সাম্প্রতিক সময়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় ঢুকলেই যে চিত্রটি সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে, তা হলো- জামায়াত-শিবিরপন্থী অ্যাকাউন্ট, পেজ ও গ্রুপগুলোর অস্বাভাবিক সক্রিয়তা। পোস্টের পর পোস্ট, মন্তব্যের ঢল, লাইক ও শেয়ারের সংখ্যা দেখে অনেকের মনে প্রশ্ন জাগছে, তাহলে কি ভোটের রাজনীতিতে তারাই এগিয়ে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে প্রথমেই বুঝতে হবে, সোশ্যাল মিডিয়ার চিত্র আর বাস্তব জনমত এক জিনিস নয়।

ডিজিটাল দৃশ্যমানতা বনাম বাস্তব জনমত: সোশ্যাল মিডিয়ার অ্যালগরিদম এমনভাবে কাজ করে, যেখানে ব্যবহারকারী যে ধরনের কনটেন্ট একবার দেখেন, সেটিই বারবার তার সামনে হাজির করা হয়। ফলে অল্প কিছু সংগঠিত কনটেন্টও ব্যবহারকারীর কাছে “সবাই এটাই বলছে” এই ধারণা তৈরি করতে পারে। ধরুন, একজন ব্যবহারকারী একদিন কয়েকটি জামায়াতপন্থী ভিডিও দেখলেন বা পোস্টে ইন্টার‌্যাকশন করলেন। অ্যালগরিদম তখন ধরে নেয়, এটাই তার আগ্রহ। পরের দিন তার টাইমলাইনে এ ধরনের কনটেন্ট আরও বেশি দেখানো হয়। কয়েক দিনের মধ্যেই তার সামনে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বক্তব্যই বারবার ভেসে উঠতে থাকে। এই প্রক্রিয়ায় যে ধারণাটি তৈরি হয়, সেটি জনমত নয়, এটি একটি ‘অ্যালগরিদমিক বাস্তবতা’। বাস্তব ভোটার সমাজের প্রতিফলন নয়, বরং একটি সীমিত ডিজিটাল বলয়ের প্রতিধ্বনি।

সংগঠিত ডিজিটাল নেটওয়ার্ক, স্বতঃস্ফূর্ততা নয়: জামায়াত-শিবিরপন্থী যে তৎপরতা দেখা যাচ্ছে, তা কেবল কিছু সমর্থকের স্বাভাবিক অনলাইন উপস্থিতি নয়। বরং এখানে স্পষ্টভাবে একটি সংগঠিত ডিজিটাল নেটওয়ার্কের লক্ষণ পাওয়া যায়। একই বক্তব্য, একই ভাষা, একই গ্রাফিক্স শুধু আইডি আলাদা। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, একই পোস্ট কয়েক মিনিটের ব্যবধানে শতাধিক আইডি থেকে শেয়ার হচ্ছে। মন্তব্যের ভাষা প্রায় হুবহু, এমনকি বানান ভুলও এক। এটি রাজনৈতিক জনপ্রিয়তার স্বাভাবিক বহিঃপ্রকাশ নয়। এটি একটি সমন্বিত প্রচারণা কৌশল, যাকে বিশেষজ্ঞরা বলেন “ডিজিটাল অর্কেস্ট্রেশন”।

অদৃশ্য কর্মী, দৃশ্যমান প্রভাব: এই প্রচারণার বড় একটি অংশ জুড়ে আছে বট ও ফেক আইডি। বিশ্বজুড়ে নির্বাচন ও গণভোটকে প্রভাবিত করতে বট ব্যবহারের উদাহরণ রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, ব্রাজিল, ভারতসহ বহু দেশে। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। সাধারণভাবে এসব আইডির কিছু মিল পাওয়া যায় তা হলো- ব্যক্তিগত জীবনের ছবি বা পোস্ট নেই, বন্ধু সংখ্যা অস্বাভাবিক, দিনে অসংখ্য রাজনৈতিক মন্তব্য, মন্তব্যগুলো আবেগী, আক্রমণাত্মক ও প্রায় একই ভাষায় লেখা এবং আইডিগুলো গভীর রাত বা নির্দিষ্ট সময়েই বেশি সক্রিয় থাকে। এই আইডিগুলো বাস্তব ভোটার নয়। কিন্তু তারা বাস্তব ভোটারের মানসিকতায় প্রভাব ফেলে। সমস্যাটা এখানেই।
কী ধরনের গুজব ছড়ানো হচ্ছে: সাম্প্রতিক সময়ে ছড়ানো গুজবগুলোর দিকে তাকালে কয়েকটি স্পষ্ট ধারা দেখা যায়। এক. ভুয়া ‘গোপন জরিপ’ - দাবি করা হয় ভেতরের জরিপে জামায়াত এগিয়ে। কিন্তু সেই জরিপের উৎস, পদ্ধতি বা নমুনা কিছুই প্রকাশ করা হয় না। দুই. ধর্মীয় আবেগ উসকে দেওয়া- নির্বাচনকে ‘ইসলাম বনাম কুফর’ বা ‘ইমান বনাম নাস্তিকতা’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। তিন. ভুয়া নিউজ কার্ড- পরিচিত গণমাধ্যমের লোগো ব্যবহার করে বানানো ছবি, যেখানে এমন বক্তব্য যুক্ত করা হয় যা সংশ্লিষ্ট গণমাধ্যম কখনো প্রকাশই করেনি। চার. এআই দিয়ে তৈরি কনটেন্ট- তরুণ ভোটার বা সাধারণ মানুষ সেজে বক্তব্য দেওয়া ভিডিও, যার বাস্তবে কোনো অস্তিত্ব নেই।

এই গুজবগুলো কাজ করে কারণ এগুলো তথ্য নয়, আবেগের ওপর দাঁড়িয়ে। কেন এই ভ্রান্ত ধারণা তৈরি করা হচ্ছে? এই প্রশ্নের পেছনে রয়েছে দুইটি বড় কারণ। প্রথমত, ব্যান্ডওয়াগন ইফেক্ট অর্থাৎ মানুষ সাধারণত বিজয়ীর পাশে দাঁড়াতে চায়। সেই প্রবণতাকে কাজে লাগানো। দ্বিতীয়ত, নির্বাচন-পরবর্তী অস্থিতিশীলতার প্রস্তুতি, মানে ভোটের ফল পছন্দ না হলে তখন বলা যাবে “জনমত তো আমাদের পক্ষেই ছিল”।

সোশ্যাল মিডিয়ার বাইরে বাস্তবতা কী: সোশ্যাল মিডিয়ার এই উচ্চকণ্ঠ চিত্র মাঠের বাস্তবতার সঙ্গে মিলছে কি না, সেটিই মূল প্রশ্ন। বাংলাদেশের ভোটের রাজনীতিতে শক্তি নির্ধারিত হয় কয়েকটি বাস্তব সূচকে। মাঠপর্যায়ের সংগঠন, গ্রাম-মফস্বলে উপস্থিতি, ভোটার উপস্থিতি এবং অতীত নির্বাচনের ফল। এইসবের কোনো ক্ষেত্রেই জামায়াত কখনো প্রধান রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। গ্রামবাংলা, শ্রমজীবী শ্রেণি, নারী ভোটার কিংবা মফস্বল অঞ্চলে তাদের প্রভাব সীমিত। সোশ্যাল মিডিয়ায় যারা সবচেয়ে বেশি সরব, তারা মূলত শহুরে বা প্রবাসী নেটওয়ার্ক, সংগঠিত আদর্শিক কর্মী কিংবা বট ও ফেইক অ্যাকাউন্ট। ফেসবুকের লাইক ব্যালট বাক্সে পড়ে না, এই বাস্তবতা এখনও বদলায়নি।

গণভোটে গুজব কেন আরও বিপজ্জনক: গণভোটে পরিস্থিতি আরও সংবেদনশীল। কারণ এখানে মানুষ দল নয়, সরাসরি একটি সিদ্ধান্তে ভোট দেয়। আর এই সিদ্ধান্ত যদি ভ্রান্ত তথ্য বা আবেগী গুজবের ওপর দাঁড়ায়, তাহলে পুরো প্রক্রিয়ার ওপর আস্থা নষ্ট হয়। ধর্মীয় ভয়, ষড়যন্ত্রমূলক ভাষা কিংবা ভুয়া তথ্য খুব দ্রুত ছড়ায়। কিন্তু সেগুলো সংশোধনের সুযোগ থাকে খুবই কম। এক্ষেত্রে একটি গুজব শুধু একজন ভোটারকে বিভ্রান্ত করে না, এটি গণতন্ত্রের ভিত্তিকেই দুর্বল করে দেয়।

গণমাধ্যম ও নাগরিকের দায়িত্ব: এই বাস্তবতায় গণমাধ্যমের দায়িত্ব শুধু খবর প্রকাশ নয়। সাংবাদিককে এখন মাঠের পাশাপাশি টাইমলাইনেও রিপোর্টার হতে হবে। কোনটা তথ্য, কোনটা অপতথ্য, সেটা আলাদা করে দেখানোর দায়িত্ব আরও বেড়েছে। একই সঙ্গে নাগরিকের দায়ও আছে। শেয়ার করার আগে উৎস যাচাই করা, আবেগী পোস্টে সন্দেহ করা এবং অজানা আইডির তথ্য বিশ্বাস না করা এগুলো এখন নাগরিক দায়িত্বের অংশ।

শেষ কথা বলবে ব্যালট: সোশ্যাল মিডিয়া শক্তিশালী, কিন্তু সর্বশক্তিমান নয়। নির্বাচন এখনও হয় ব্যালট বাক্সে, মানুষের হাতে। বট আইডি ভোট দেয় না, ফেক প্রোফাইল ব্যালট ছোঁয় না। টাইমলাইনে ঝড় উঠতেই পারে। কিন্তু ঝড় আর ভোট এক জিনিস নয়। শেষ পর্যন্ত ইতিহাস বলে- ডিজিটাল শব্দ যত বড়ই হোক, বাস্তব ভোটারই শেষ কথা বলে। গ্রামবাংলা, মফস্বল, শ্রমজীবী শ্রেণি, নারী ভোটার এইসব বড় ভোট ব্যাংকগুলোতে জামায়াতের প্রভাব সীমিত। সোশ্যাল মিডিয়ায় যারা সবচেয়ে বেশি সরব, তারা মূলত- শহুরে বা প্রবাসী নেটওয়ার্ক, সংগঠিত আদর্শিক কর্মী অথবা বট ও ফেইক অ্যাকাউন্ট। মনে রাখতে হবে, সামাজিক মাধ্যমে টাইমলাইনের শব্দ কখনোই মাঠের আওয়াজ নয়।

লেখক: রাজনীতি ও নির্বাচন বিষয়ক সম্পাদক, দৈনিক ইত্তেফাক।

ইত্তেফাক/এএইচপি