দেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের পুরোধা ব্যক্তিত্ব ও সফল নারী উদ্যোক্তা লুনা সামসুদ্দোহার তৃতীয় মৃত্যুবার্ষিকী আজ। মহীয়সী এই নারী ২০২১ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি সিঙ্গাপুরের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় অসংখ্য মানুষকে অশ্রু সাগরে ভাসিয়ে মায়াময় পৃথিবী থেকে বিদায় নেন। বিদূষী, সৃজনশীল ও সংগ্রামী মানুষ হিসেবে তিনি সমাজে যে অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন তা কখনই ভোলার নয়।
বাংলাদেশে ছবি এবং আঙুলের ছাপযুক্ত ভোটার তালিকা প্রণয়ণসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নির্বাচন ব্যবস্থাপনায় অবদান রাখার স্বীকৃতিস্বরুপ লুনা সামসুদ্দোহা মরণোত্তর আন্তর্জাতিক নির্বাচনী পুরস্কার ‘মেরিটোরিয়াস অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড’ লাভ করেছেন। ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর পার্লামেন্টারি স্টাডিজ (আইসিপিএস) এবং পর্তুগিজ জাতীয় নির্বাচন কমিশন গতবছর লিসবনে এই পুরুস্কার প্রদান করে। যা বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে উজ্জ্বল করেছে। সরকারের ই-জিপি সিস্টেমসহ প্রযুক্তিখাতের বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নে তার গুরুত্বপূর্ণ অবদান স্মরণীয় হয়ে থাকবে। সফল উদ্যোক্তা ও অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখার স্বীকৃতি হিসেবে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকের প্রথম নারী চেয়ারম্যান হয়েছিলেন লুনা শামসুদ্দোহা। আজ তিনি স্ব-শরীরে আমাদের মাঝে বেঁচে নেই এটি মহা সত্য কথা কিন্তু তার সংগ্রামী জীবনের মাধ্যমে মানুষের অন্তরে আলোর প্রদীপ হিসেবে থাকবেন চিরকাল।
১৯৫৪ সালের ৪ অক্টোবর মহীয়সী নারী লুনা সামসুদ্দোহা ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি কেবল ব্যবসায়িক সাফল্য নিজেকে আবদ্ধ রাখেননি। কর্মক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ, সেবামূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা এবং ডিজিটাল বাংলাদেশ নির্মাণে একজন একনিষ্ঠ কর্মী হিসেবে নিরলস কাজ করে করে গেছেন সারাজীবন।
বাংলাদেশ উইমেন ইন টেকনোলজি (বিডব্লিউআইটি) সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তিনি। ছিলেন এই সংগঠনের সভাপতি। দোহা টেক নিউ মিডিয়া নামের সফটওয়্যার ফার্মের চেয়ারম্যানও ছিলেন তিনি। ১৯৯২ সালে চ্যালেঞ্জ নিয়ে শুরু করেন প্রযুক্তিখাতের ব্যবসা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা পেশা ছেড়ে নাম লেখান উদ্যোক্তা হওয়ার দৌড়ে। আমৃত্য অবদান রেখেছেন ডিজিটাল বাংলাদেশ নির্মাণ, প্রযুক্তিখাতে দক্ষ কর্মী তৈরি ও নারীর ক্ষমতায়নে।
লুনা সামসুদ্দোহার মধ্যে পেশাজীবিদের দক্ষতার উন্নয়নে কাজ করার তীব্র তাগিদ ছিল সবসময়। জনতা ব্যাংকের চেয়ারম্যান থাকাকালীন সময়ে অর্থনৈতিক সাংবাদিকদের পেশাগত উৎকর্ষ সাধনে এগিয়ে আসেন। অর্থনীতির মতো জটিল বিষয় নিয়ে কাজ করতে হলে সাংবাদিকদের প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ গ্রহণের প্রয়োজনীতা উপলব্ধি করে তিনি ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের (ইআরএফ) নিজস্ব অফিস স্থাপন ও ইআরএফ ইন্সটিটিউট প্রতিষ্ঠায় নিঃস্বার্থভাবে কাজ করে গেছেন। তার এই অবদানে কথা সাংবাদিকরা আজও অন্তর দিয়ে স্মরণ করে।
লুনা শামসুদ্দোহা বাংলাদেশে ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের জন্য ছবি এবং আঙুলের ছাপযুক্ত ভোটার নিবন্ধনে ব্যবহৃত সফটওয়্যার উদ্ভাবনে যুক্ত ছিলেন। লুনার প্রযুক্তিভিত্তিক প্রতিষ্ঠান দোহাটেক নিউ মিডিয়া এই সফটওয়্যার ডেভলপমন্ট এর ক্ষেত্রে পার্টনার ছিল। মাল্টি-বায়োমেট্রিকসহ এই ভোটার নিবন্ধন সফটওয়্যার বিশ্বে প্রথম এবং বর্তমানে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের ব্যবহার হচ্ছে।
২০১৮ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি জনতা ব্যাংকে দায়িত্ব পাওয়া তিনিই প্রথম নারী যিনি বাংলাদেশের রাষ্ট্রায়াত্ত্ব কোন ব্যাংকের চেয়ারম্যান হয়েছিলেন। তিনি এই দায়িত্ব সততা ও নিষ্ঠার সাথে পালন করে সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে শুরু করে ব্যাংকিংখাতের সব মহলে প্রশংসা কুড়িয়েছেন। অনিয়মের অভিযোগে অধিকাংশ পরিচালনা পর্ষদ যখন সমালোচিত হচ্ছে, তখন দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সততা ও নিষ্ঠার প্রতি তার এই অঙ্গীকার লুনা শামসুদ্দোহাকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
জনতা ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালনের পূর্বে ২০১৬ সালের জুন মাস থেকে জনতা ব্যাংকের পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন। তার আগে ২০০৯ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত রাষ্ট্রায়াত্ত্ব আরেক ব্যাংক-অগ্রণী ব্যাংকেরও পরিচালক হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন। এ ছাড়া তিনি বাংলাদেশ বিজনেস ম্যাগাজিনের প্রতিষ্ঠাতা এবং সুইজারল্যান্ডের গ্লোবাল থট লিডার অন ইনক্লুসিভ গ্রোথের সদস্য ছিলেন।
২০১৩ সালে প্রযুক্তি খাতে নারীদের এগিয়ে নিয়ে যাওয়া ও নারীর ক্ষমতায়নে গ্লোবাল উইমেন ইনভেন্টরস অ্যান্ড ইনোভেটরস নেটওয়ার্ক সম্মাননা লাভ করেন লুনা। দেশের অর্থনীতিতে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি পেয়েছেন বাংলাদেশ বিজনেস অ্যাওয়ার্ড-২০১৭। এ ছাড়া একজন নারী উদ্যোক্তা হিসেবে স্থানীয় সফটওয়্যার শিল্পে নিজের কাজের স্বীকৃতি হিসেবে লুনা শামসুদ্দোহা অনন্যা টপ টেন অ্যাওয়ার্ড লাভ করেন।
ঢাকায় জন্ম নেওয়া লুনা সামসুদ্দোহার বাবার নাম লুৎফার রহমান এবং মায়ের নাম হাসিনা রহমান। তিনি ভিকারুননিসা নুন স্কুল ও কলেজ থেকে এসএসসি এবং হলিক্রস কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ করেন। পরবরর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন।
১৯৮৫ সালে দ্য এক্সিকিউটিভ সেন্টারের ব্যবস্থাপনা সহযোগী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন লুনা সামসুদ্দোহা। পরবর্তীতে তিনি ব্রিটিশ কাউন্সিলে ইংরেজি ভাষার শিক্ষক হিসেবে কাজ শুরু করেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটে ইংরেজি ভাষার শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। তিনি ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি এবং এসএমই ফাউন্ডেশনের পরিচালক ছিলেন।
তার প্রতিষ্ঠান দোহাটেক নিউ মিডিয়া সফটওয়্যার ও সিস্টেম ডেভলপমেন্টের কাজ করে। এ প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ,যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, জার্মানি, ভুটান, মালদ্বীপ, সুইজারল্যান্ড সহ বিভিন্ন দেশের বেসরকারি সংস্থা, সরকারি প্রতিষ্ঠান ও করপোরেশনের জন্য সফটওয়্যার সলিউশন দিয়ে আসছে। প্রতিষ্ঠানটির অন্যতম গ্রাহকদের মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ সরকার, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, বিশ্ব ব্যাংক, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, যুক্তরাষ্ট্রের পোস্টাল সার্ভিস ইত্যাদি প্রতিষ্ঠান। এ ছাড়াও দোহাটেক নিউ মিডিয়া ডিজিটাল সার্টিফিকেট প্রদান করার জন্য নির্বাচিত একটি প্রতিষ্ঠান।
লুনা সামসুদ্দোহারর স্বামী ব্যবসায়ী একেএম সামসুদ্দোহা বাংলাদেশের খ্যাতনামা একজন ব্যবসায়ী। প্রযুক্তিখাতের উদ্যোক্তা হিসেবে দেশের সীমানা পেরিয়ে বিদেশেও তিনি সুনাম অর্জন করেছেন। এই দম্পতির একমাত্র সন্তান রিম সামসুদ্দোহা। ২০২১ সালের এই দিনে তিনি মায়াময় পৃথিবী থেকে প্রয়াত হন। আজ এই উদারচেতা স্বপ্নবান মানুষটির আত্বার শান্তি কামনা করছি এবং তার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করি।
লেখক: সাংবাদিক ও সাবেক সাধারণ সম্পাদক, ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ)