নিজের উপর বিশ্বাস রাখিতে হইবে

আমরা বিশ্বে কঠিন অনেক পরিবর্তনের মধ্য দিয়া যাইতেছি। স্বাভাবিকভাবেই বিশ্বব্যাপী নানান জাতিগোষ্ঠীর ও ব্যক্তিপর্যায়েও মানসিক চাপ বাড়িতেছে। মানসিক চাপ এমন একটি কঠিন অবস্থা—যাহা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাইলে তাহার নানা রকমের খারাপ লক্ষণ সমাজ সংসারে দেখা যায়। ব্যক্তি পর্যায়ে মানসিক চাপ আমাদের শরীরকে ভিতরে ভিতরে ধসাইয়া দিতে পারে। ইহা এক অর্থে নীরব ঘাতক। দিন যত যাইতেছে, ততই যেন আধুনিক জীবনের সঙ্গে মানসিক চাপ ওতপ্রোতভাবে জড়াইয়া যাইতেছে। বিশ্বময় এত অশান্তি, এত যুদ্ধ-বিগ্রহ, ঘরে-বাহিরে, পথে-পথে, পদে-পদে এত সমস্যা যে, মনে হইতে পারে—এই সময়ের মানুষরা যেন ইহকালেই দোজখের রিহার্সেল করিতেছে। এই ক্ষেত্রে নিভৃতে নিরিবিলি আয়নার সামনে দাঁড়াইয়া নিজেকে এই প্রশ্ন করা যাইতে পারে—এত স্ট্রেস বা মানসিক চাপ লইয়া বাঁচা যায় কী করিয়া? সমস্যার তো শেষ নাই। অবস্থা এমন যে, যায় দিন ভালো আসে দিন খারাপ। কিন্তু তাহার পরও কথা আছে। কথাটি হইল—অনেক জ্ঞানীগুণীর মতে, আধুনিক জীবনে স্ট্রেস বা মানসিক চাপ হইল আমাদের কর্মের চালিকাশক্তি। অর্থাত্ মানসিক চাপ হইল ঘানি। আর সেই ঘানি আমাদের ভিতর হইতে নিংড়াইয়া কর্মরস বাহির করে। এই জন্য আধুনিক জীবনটা যেন অনেকটা প্রেশার কুকারের মতো—যাহাতে অল্প খরচে ও স্বল্প সময়ে কার্য হাসিল করা হয়। কিন্তু সেই প্রেশার কখনোসখনো ভয়ংকর বিপদও ডাকিয়া আনে। আমরা দেখিতেছি, পৃথিবীর দিকে দিকে যুদ্ধ যেন প্রতিদিন অস্থিরতার নূতন ইতিহাস রচনা করিয়া চলিতেছে। সেই অস্থিরতায় বিশ্বের সকল দেশেরই সকল শ্রেণির মানুষের মধ্যেই অল্পবিস্তর মানসিক সমস্যা দেখা দিয়াছে। বাংলাদেশও উহার বাহিরে নহে। তরুণরা যেহেতু স্বপ্নের কারিগর হয়, তাহাদের সম্মুখে পড়িয়া থাকে দীর্ঘ জীবন। সেই কারণে জীবনের নিয়মে তাহাদের উদ্বেগ-উত্কণ্ঠাও অধিক থাকে।

জগতে বিভিন্ন সময়ে এই ধরনের সংকটাপন্ন অবস্থা তৈরি হইয়াছে। এমনকি বিখ্যাত মণীষীরাও জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে প্রবল মানসিক চাপে পিষ্ট হইয়াছেন। এই অবস্থায় সবচাইতে জরুরি বিষয় হইল—প্রথম নিজেকে জানা। প্রকৃত আত্মোপলব্ধি থাকিলে প্রবল মানসিক চাপের একটি ‘সেফটি ভাল্ব’ তৈরি হইয়া যায়, প্রেশার কুকারের মতো। তাহাতে ভয়ংকর বিপদ হইতে বাঁচা যায়। উদ্বেগের ক্ষেত্রে উইনস্টন চার্চিল বলিয়াছেন, ‘যখন আমি আমার সমস্ত উদ্বেগের দিকে ফিরিয়া তাকাই, তখন আমার সেই বৃদ্ধের গল্পটি মনে পড়ে যে তাহার মৃত্যুশয্যায় বলিয়াছিলেন যে,—তাহার জীবন দুশ্চিন্তাজনিত কষ্টে জর্জরিত ছিল, যেইসকল দুশ্চিন্তার প্রায় কোনোটাই কখনো ঘটে নাই।’ লেবাননের কবি খলিল জিবরান মনে করিতেন, ‘আমাদের উদ্বেগ ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করিয়া আসে না, বরং আসে ইহাকে নিয়ন্ত্রণ করিবার প্রচেষ্টা হিসাবে।’ এই ক্ষত্রে অত্যন্ত তাত্পর্যপূর্ণ উক্তিটি করিয়াছে হ্যারি পটারের স্রষ্টা জে কে রাউলিং। তিনি স্পষ্ট করিয়া বলিয়াছেন, ‘কোনো কিছুতে ব্যর্থ না হইয়া বাঁচিয়া থাকা অসম্ভব।’

সুতরাং ব্যর্থতা জীবনেরই অংশ। ইহারও মূল্য রহিয়াছে। যখন মনে হয়, টানেলের শেষ প্রান্তেও কোনো আলো নাই—তখন অবশ্যই জানিতে হইবে যে, ইহা শতভাগ মিথ্যা। কারণ, আমরা কখনোই আমাদের ‘ভবিষ্যৎ’ জানি না। ভবিষ্যতের বিষয় সম্পর্কে কেবল মহান সৃষ্টিকর্তা জানেন। আল্লাহ ছাড়া ভবিষ্যতের বিষয়ে কেহ কিছু জানেন না। আমরা যাহা যেইভাবে ভাবি না কেন—তাহা কখনোই সেইভাবে হয় না। অতীতেও হয় নাই, ভবিষ্যতেও হয় নাই। সুতরাং টানেলের শেষ প্রান্তে অবশ্যই আলো রহিয়াছে। শুধু প্রশ্নটা হইল, টানেলটা কতখানি লম্বা এবং আপনি সেই লম্বা টানেল পাড়ি দিতে ক্লান্ত হইয়া পড়িতেছেন কি না, কিংবা ভয় পাইতেছেন কি না। এই ক্ষেত্রে সবচাইতে সহজ ভাবনা হইল—টানেলের পথ লইয়া ভাবিয়া দেখিবার দরকার নাই, কখনো না কখনো আলো তো আসিয়া পড়িবেই—এই বিশ্বাস রাখিয়া আগাইয়া যাওয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ। আর সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব হইয়া বুদ্ধিমানের কাজ না করিয়া হতাশ হওয়া সবচাইতে বড় নির্বুদ্ধিতা। অতএব, নিজের উপর বিশ্বাস রাখিতে হইবে।