রিজার্ভ-সংকট কাটবে কী করে

বেশ কিছু দিন ধরেই দেশের অর্থনীতিতে বৈদেশিক মুদ্রা, বিশেষ করে মার্কিন ডলারের সংকট বিরাজ করছে। বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের স্ফীতি ক্রমশ কমছে। বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের পরিমাণ একপর্যায়ে ৪৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছিল, যা ছিল সার্ক দেশগুলোর মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বৈদেশিক রিজার্ভ। সেখান থেকে রিজার্ভ কমতে কমতে বর্তমানে ২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের নিচে নেমে এসেছে। পরিস্থিতির যেভাবে অবনতি ঘটছে, তাতে বলা যায় ভবিষ্যতে বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ আরো কমবে। অর্থনীতির জন্য হুমকির সৃষ্টি করতে পারে। একটি দেশের জন্য কী পরিমাণ রিজার্ভ থাকা জরুরি, তার কোনো সঠিক পরিমাপ নেই। দেশটির অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও উন্নয়নপ্রচেষ্টার নিরিখে বৈদেশিক মুদ্রার পরিমাণ নিরূপিত হয়ে থাকে। তবে অর্থনীতিবিদগণ মনে করেন, কোনো দেশের তিন মাসের আমদানি ব্যয় মেটানোর মতো বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ থাকলে তাকে স্বস্তিদায়ক রিজার্ভ বলা যেতে পারে। সে হিসেবে বাংলাদেশের বর্তমান বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ দিয়ে চার থেকে পাঁচ মাসের আমদানি ব্যয় মেটানো যেতে পারে।

এ অবস্থা রাতারাতি সৃষ্টি হয়নি। যখন রেকর্ড পরিমাণ বৈদেশিক রিজার্ভ সৃষ্টি হয়েছিল তখনই কিছু প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন ছিল, যাতে রিজার্ভ কখনোই কমে না যায়। কিন্তু সময়মতো উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি বলে বর্তমান রিজার্ভ-সংকটের সৃষ্টি হয়েছে।

বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সবচেয়ে বড় সূত্র হচ্ছে, পণ্য রপ্তানি আয়। কোনো কারণে যদি পণ্য রপ্তানি আয়ের মন্থর গতি সৃষ্টি হয় এবং পাশাপাশি আমদানি ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়, তাহলে বৈদেশিক মুদ্রাসংকট দেখা দেবে, এটাই স্বাভাবিক। দেশের রপ্তানি আয়ের ক্ষেত্রে ধীর গতি প্রত্যক্ষ করা গেলেও আমদানি ব্যয়ের প্রবণতা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গিয়েছিল। বৈদেশিক মুদ্রার চলমান ক্রাইসিস মোকাবিলার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক ১২২টি বিলাসজাত পণ্যের একটি তালিকা প্রণয়ন করে তা আমদানি নিরুত্সাহিত করা হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল লেনদেনের ভারসাম্যকে অনুকূল অবস্থায় নিয়ে আসা। আন্তর্জাতিক বাজারে সৃষ্ট বিভিন্ন সংকটের কারণে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় কমে যায়। প্রত্যাশা মোতাবেক রপ্তানি আয় হচ্ছে না। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের প্রধান খাত পণ্য রপ্তানি এবং ব্যয়ের শীর্ষ খাত আমদানি পরস্পর বিপরীত মুখি অবস্থানে ধাবমান থাকার কারণে বৈদেশিক মুদ্রাসংকট তীব্রতর হয়েছে। পণ্য রপ্তানিকারকদের অনেকেই স্থানীয় মুদ্রা টাকার ব্যাপক অবমূল্যায়নের আশায় অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রা দ্রুততম সময়ের মধ্যে দেশে প্রত্যাবর্তন করাচ্ছেন না। তারা এই আয় বিদেশেই ধরে রাখছেন।

এছাড়া অবৈধ পথে আমাদের দেশ থেকে বৈদেশিক মুদ্রা বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে। গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইনটিগ্রিটি (জিএফআই) কয়েক বছর আগে তাদের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছিল, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের আড়ালে প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে ৬৪ হাজার কোটি টাকা পাচার হচ্ছে। উত্তরকালে এই পাচারের পরিমাণ নিশ্চিতভাবেই আরো বেড়েছে। বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের ক্ষেত্রে এখনো শীর্ষস্থান দখল করে আছে তৈরি পোশাক। বিভিন্ন পরিসংখ্যান থেকে প্রতীয়মান হয়েছে যে, বাংলাদেশ যে তৈরি পোশাক রপ্তানির মাধ্যমে যে বৈদেশিক মুদ্রা আয় করে, তার ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশই এই খাতের কাঁচামাল, ক্যাপিটাল মেশিনারিজ এবং মধ্যবর্তী পণ্য আমদানিতে পুনরায় বিদেশে চলে যায়। ফলে জাতীয় অর্থনীতিতে এই খাতের মূল্য সংযোজনের হার ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশ। যে ৪২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় হয়েছে তৈরি পোশাক খাত থেকে, তার মধ্যে জাতীয় অর্থনীতিতে মূল্যসংযোজিত হয়েছে মাত্র ২৮/২৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। তৈরি পোশাক শিল্পের সব কাঁচামাল স্থানীয়ভাবে উত্পাদন করা না গেলেও কোনো কোনো কাঁচামাল তো স্থানীয়ভাবে উত্পাদন ও জোগান দেওয়া সম্ভব বলে মনে করি।

বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্পে প্রচুর সংখ্যক বিদেশি কর্মরত রয়েছেন। এরা কোম্পানির মাঝারি এবং শীর্ষ পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করেন। উদ্যোক্তাদের অনেকেরই ধারণা, স্থানীয়ভাবে শিক্ষা অর্জনকারীদের পক্ষে বিদেশিদের মতো দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করা সম্ভব নয়। অথচ স্থানীয়ভাবে যারা কারিগরি বিদ্যা বা অন্যান্য ক্ষেত্রে শিক্ষার্জন করেছেন, তাদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণদানের মাধ্যমে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কাজে নিয়োগ করা যেতে পারে।

বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্যের অসংগতিও প্রত্যাশিত মাত্রায় বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করছে। বাংলাদেশ থেকে অন্তত ২০০টি পণ্য রপ্তানি করা হয়। এর মধ্যে তৈরি পোশাক থেকে অর্জিত হয় ৮৫ শতাংশের মতো রপ্তানি আয়। আমাদের শীর্ষ রপ্তানি পণ্যটি আমদানিনির্ভর কাঁচামাল ও ক্যাপিটাল মেশিনারিজ নির্ভর। ফলে জাতীয় অর্থনীতিতে এই খাতের মূল্য সংযোজনের হার তুলনামূলকভাবে কম। একসময় বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্যের শীর্ষে ছিল পাট ও পাটজাত পণ্য। কিন্তু কালের বিবর্তনে পাটের সেই সোনালি অতীত এখন আর বিদ্যমান নেই। বাংলাদেশ পাটপণ্যের বহুমুখিকরণে কোনো সাফল্য দেখাতে পারেনি। ফলে আন্তর্জাতিক বাজার আমাদের হাতছাড়া হয়ে গেছে। পাট, চা চামড়ার মতো প্রায় শতভাগ স্থানীয় কাঁচামালনির্ভর পণ্য রপ্তানি বাড়ানো গেলে উপার্জিত বৈদেশিক মুদ্রার প্রায় পুরোটাই জাতীয় অর্থনীতিতে মূল্য সংযোজন করতে পারত। বাংলাদেশের আন্তজর্জাতিক বাণিজ্যের একটি মারাত্মক সীমাবদ্ধতা হচ্ছে, আমরা যেসব দেশে অধিক পরিমাণে পণ্য রপ্তানি করি, সেই সব দেশ থেকে আমদানি করি তুলনামূলকভাবে সামান্য কিছু পণ্য। আবার যেসব দেশ থেকে বেশি পরিমাণ পণ্য আমদানি করি, সেখানে আমাদের রপ্তানির ভলিউম খুবই কম। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের এই অসংগতি আমাদের বাণিজ্য সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে চলেছে। শুধু আইন করে পণ্য আমদানি কমানো যাবে না। কারণ বাজারে যে পণ্যের চাহিদা থাকবে, সেই পণ্য কোনো না কোনোভাবে আমদানি হবেই। তাই আমদানিপ্রবণতা কমানোর জন্য আমদানি বিকল্প পণ্য স্থানীয়ভাবে উত্পাদনের ব্যবস্থা করতে হবে। ভোক্তা যদি স্থানীয়ভাবে উত্পাদিত উন্নত মানের বিকল্প পণ্য পায়, তাহলে তা কোনোভাবেই বিদেশি পণ্যের প্রতি আকৃষ্ট হবে না। শিল্পে ব্যবহার্য যেসব কাঁচামাল বা মধ্যবর্তী পণ্য স্থানীয়ভাবে উত্পাদন করা সম্ভব নয়, শুধু সেই সব পণ্যই আমদানি অনুমতি দেওয়া যেতে পারে।  

অর্থনীতিবিদদের অনেকেই মনে করছেন, প্রবাসী বাংলাদেশিরা ঠিকই রেমিট্যান্স দেশে প্রেরণ করছেন, তবে তা বৈধ চ্যানেলে না এসে ‘হুন্ডি’র’ মাধ্যমে আসছে। ফলে আহরিত বৈদেশিক মুদ্রা বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভে যুক্ত হচ্ছে না। বাংলাদেশে বর্তমানে বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময়ের ক্ষেত্রে অন্তত চারটি রেট চালু আছে। এই পরিস্থিতিতে প্রবাসী বাংলাদেশিরা প্রেরিত রেমিট্যান্সের বিপরীতে স্থানীয় মুদ্রায় বেশি অর্থ পাবার আশায় হুন্ডির মাধ্যমে রেমিট্যান্স প্রেরণ করছেন। হুন্ডি ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি মার্কিন ডলারের বিনিময় হার বাজারভিত্তিক করা দরকার। মার্কিন ডলারের বিনিময় হার বাজারভিত্তিক করার পাশাপাশি প্রেরিত রেমিট্যান্সের ওপর নগদ আর্থিক প্রণোদনা অব্যাহত রাখলে প্রবাসী বাংলাদেশিরা বৈধ চ্যানেলে রেমিট্যান্স প্রেরণে আগ্রহী হয়ে উঠতেন।

বাংলাদেশ প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেল আমদানি করে থাকে। স্থানীয়ভাবে জ্বালানি তেলের প্রচুর অপচয় হয়। জ্বালানি তেল আমাদের আমদানি করতেই হবে। কিন্তু কোনোভাবেই যেন জ্বালানি তেলের অপচয় না হয় তা নিশ্চিত করতে হবে। দেশে উন্নয়ন কার্যক্রম চলছে বেশ দ্রুত গতিতেই। কিন্তু সব উন্নয়ন প্রকল্পই জাতীয় বিবেচনায় অগ্রাধিকার পাবার যোগ্য নয়। যেসব প্রকল্প কম জনগুরুত্বপূর্ণ, সেগুলো স্থাগিত অথবা বিলম্বিত করা যেতে পারে। প্রকল্প গ্রহণে আরো সতর্ক হতে হবে।

প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে অনেকেই বিদেশে চিকিত্সার জন্য গমন করেন। অথচ দেশেই উন্নত চিকিত্সা হতে পারে। যারা চিকিত্সা পেশায় নিয়োজিত আছেন, তাদের মন-মানসিকতার পরিবর্তন করতে হবে। তারা যদি একজন রোগীর সঙ্গে ভালো ব্যবহার করেন, তাহলে রোগীরা বিদেশে চিকিত্সার জন্য যাবার প্রয়োজন তেমন একটা অনুভব করবেন না। বাংলাদেশ বিদেশ থেকে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ মেডিসিন আমদানি করে থাকে। কিন্তু পাশাপাশি বাংলাদেশ বিশ্বের ১০০টিরও বেশি দেশে মেডিসিন রপ্তানি করে। যেসব মেডিসিন আমদানি করা হয়, উদ্যোগ নিলে তার অনেকগুলোই স্থানীয়ভাবে উত্পাদন করা সম্ভব, এবং কিছু রোগের  ওষুধ এখন দেশে উত্পন্ন হচ্ছে।

বর্তমান ক্রাইসিস মুহূর্তে বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ-সংকট কাটানোর জন্য উদ্যোগ নিতে হবে। একইসঙ্গে ভবিষ্যতে যাতে বৈদেশিক মুদ্রার আয় বাড়ানো যায় এবং একইসঙ্গে ব্যয় কমানো যায়, তার জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। কোনো ক্রাইসিসই ক্রাইসিস নয়, যদি তা সঠিক পথে সমাধান করা যায়। আমাদের সে লক্ষ্যেই অগ্রসর হতে হবে।

লেখক: সাবেক পরিচালক, বিএসটিআই ও বিশিষ্ট শিল্প উদ্যোক্তা

অনুলিখন: এম এ খালেক