ঐতিহ্যবাহী স্থাপনাগুলি কেন নষ্ট হয়?

আমরা উন্নত বিশ্বের ঐতিহ্যময় স্থাপনা দর্শনে অভিভূত হই, সেই সকল ঐতিহ্য সংরক্ষণের কলাকৌশল ও গুরুত্ব দেখিয়া মুগ্ধ হই, কিন্তু নিজের দেশের ঐতিহ্যময় স্থাপনাকে বহু ক্ষেত্রে চরমভাবে অবহেলা করিয়া থাকি। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, পুরান ঢাকায় মোগল স্থাপত্যের অনন্য নিদর্শন ছোট কাটরার কথা। কিছুদিন পূর্বে একটি জাতীয় দৈনিকে ক্যাপশন ছবি ছাপা হয় এই ছোট কাটরা লইয়া। শায়েস্তা খানের আমলে ইহা নির্মিত হইয়াছিল প্রশাসনিক কাজের জন্য। সেই আলোকচিত্রটিতে দেখা গিয়াছে, পুরান ঢাকার চকবাজারে সোয়ারীঘাট এলাকায় অবস্থিত তিনতলা এই স্থাপনাটির নাজুক ও ভঙ্গুর কাঠের সিঁড়ি ব্যবহার করিতেছেন খেলনা ও প্রেসের শ্রমিকেরা। এইভাবে দখলদারদের কবলে পড়িয়া ক্রমশ নষ্ট হইতেছে এই অসাধারণ স্থাপনাটি।

অথচ মোগল ঐতিহ্যের এক গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন এই ধরনের কাটরা। ছোট কাটরার পাশাপাশি বড় কাটরাও বহুলাংশে নষ্ট হইয়াছে। মোগল রাজধানী ঢাকার চকবাজারের দক্ষিণে বুড়িগঙ্গা নদীর পাড়ে বড় কাটরার অবস্থান। মধ্য এশিয়ার ক্যারাভান সরাইয়ের ঐতিহ্য অনুসরণে নির্মিত বড় কাটরা দারুণভাবে সুরক্ষিত এবং মোগল রাজকীয় স্থাপত্যরীতির সকল বৈশিষ্ট্যের উপস্থিতি ইহাতে বিদ্যমান; অথচ বড় কাটরা ইতিমধ্যে যথেষ্ট ক্ষতিগ্রস্ত হইয়াছে এবং সামগ্রিকভাবে ধ্বংসের মুখে পতিত হইয়াছে। বিভিন্ন কারণে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ কর্তৃক ভবনটি সংরক্ষণ করা সম্ভব হয় নাই বলিয়া ইতিপূর্বে পত্রপত্রিকায় সংবাদ প্রকাশিত হইয়াছে। যাহারা দেশের বাহিরে, বিশেষ করিয়া ইউরোপের বিভিন্ন শহরে ঘুরিয়াছেন, তাহারা দেখিয়াছেন সেইখানে পুরাতন নির্মাণশৈলী বজায় রাখিয়াই শহর সাজানো হইয়াছে। ইহাতে ইউরোপের বিভিন্ন শহরের সৌন্দর্য যেমন বৃদ্ধি পাইয়াছে, তেমনি বজায় থাকিয়াছে ঐতিহ্য ও নিজস্বতা। ইহার পাশাপাশি আমরা একটিবার পুরান ঢাকার কথা ভাবিলে দুঃখ পাইতে হয়। সেইখানে এখনো টিকিয়া রহিয়াছে লালবাগের কেল্লা, ছোট কাটরা, বড় কাটরাসহ নানা স্থাপনা। শাঁখারীবাজার হইতে শুরু করিয়া তাঁতীবাজার, বানিয়ানগরে এখনো দেখা যায় অনেক পুরাতন মোগল আমলের বাড়িঘর। দুঃখজনকভাবে এই সকল পুরাতন নির্মাণশৈলীর স্থাপনা কমিয়া আসিয়াছে। বহু স্থানেই এই সকল ঐতিহ্যময় স্থাপনা ভাঙিয়া বহুতল ভবন গড়িয়া উঠিয়াছে। অন্যদিকে এই সকল ঐতিহ্যবাহী বাড়িঘরের মধ্যেই তৈরি হইয়াছে বিভিন্ন কলকারখানা। বিশেষ করিয়া সূত্রাপুর, নারিন্দা, ওয়ারী, ধোলাইখালসহ বিভিন্ন এলাকায় যত্রতত্র গড়িয়া উঠিয়াছে ছোটখাটো ওয়ার্কশপ। অনেক জায়গায় আবার পুরাতন ঐতিহ্যবাহী ঘরবাড়ির মধ্যেই চলিতেছে নানা কাজকারবার। ফলে শ্রমিক ও কারখানার বর্জ্যে ক্ষতি হইতেছে প্রাচীন এই সকল স্থাপনা। এমনিতেই বাংলাদেশে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত ও আর্দ্রতা অধিক থাকার কারণেও এই সকল পুরাতন ভবন দ্রুত নষ্ট হয়। সুতরাং ঐতিহ্যবাহী এই সকল স্থাপনা সংরক্ষণ করিতে প্রয়োজন যথাযথ সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ। এই প্রসঙ্গে আমরা স্মরণ করিতে পারি, ঢাকার সন্নিকটে সোনারগাঁওয়ে অবস্থিত ঐতিহাসিক পানাম নগরীর কথা। ত্রয়োদশ শতাব্দীর শেষের দিকে গড়িয়া উঠা সুলতানি আমলের এই রাজধানী শহরটি বাংলার এক অপার ঐতিহ্য। একটিমাত্র সড়কের দুই পাশ ঘিরিয়া গড়িয়া উঠিয়াছিল পানাম নগরী। সড়কের পাশের প্রায় সকল বাড়ির নির্মাণশৈলী একই রকমের। এই সকল ভবন নির্মাণ করা হইয়াছিল ইট, সুরকি ও চুন দিয়া। কোনো লৌহজাতীয় কিছু ব্যবহার করা হয় নাই। সেই ঐতিহ্যবাহী পানাম নগরীও এখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। একদিকে মানুষের দখলদারি, অন্যদিকে সরকারি দায়িত্বশীল বিভাগগুলির উদাসীনতা।

কিন্তু ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা যে পর্যটনশিল্পের এক দারুণ উত্স—তাহার প্রমাণ ইউরোপ ও উন্নত মুসলিম বিশ্ব। এমনকি প্রতিবেশী ভারতে মোগল স্থাপত্যশৈলীর অনন্য নিদর্শন তাজমহল রক্ষার মাধ্যমে ভারত  প্রতি বত্সর লক্ষ লক্ষ পর্যটককে সেই দেশে টানিতেছে। ইহার বাহিরে শত শত ঐতিহ্যবাহী স্থাপনাকে তাহারা গুরুত্বের সহিত সংরক্ষণ ও রক্ষা করিয়া থাকে। বাংলাদেশেও মোগল নির্মাণশৈলী বাঁচাইতে সংশ্লিষ্ট সকল বিভাগকে উদ্যোগী হইতে হইবে। ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে ভালোবাসিবার পাশাপাশি দেশপ্রেমও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ঐতিহ্যময় স্থাপনার মাধ্যমে পর্যটনশিল্পই শুধু বিকশিত হয় না, দেশকেও তাহা গৌরবান্বিত করে।