এই ভার কে বহন করিবেন?

আগামীকাল মঙ্গলবার হইতে ঢাকা-বুড়িমারী রুটে চালু হইতেছে নূতন ট্রেন সার্ভিস। ইহার মাধ্যমে সহজেই যাওয়া যাইবে পশ্চিমবঙ্গের দার্জিলিং ও ভুটান। খবরটি নিঃসন্দেহে আনন্দদায়ক। লালমনি এক্সপ্রেস ট্রেনটি লালমনিরহাট পর্যন্ত গেলেও বুড়িমারী স্থলবন্দর পৌঁছাইতে অবশিষ্ট প্রায় ১০০ কিলোমিটার যাইতে হয় সড়কপথে। ইহার জন্য সময় লাগে প্রায় তিন ঘণ্টা। এখন বাণিজ্যিকভাবে সরাসরি ঢাকা-বুড়িমারী ট্রেন সার্ভিস চালু হইলে লালমনিরহাট হইতে বুড়িমারী যাইতে সময় লাগিবে মাত্র পৌনে এক ঘণ্টা। এই ট্রেন সার্ভিস গুরুত্বপূর্ণ এই কারণে যে, ইহার মাধ্যমে আঞ্চলিক কানেকটিভিটির পথ সম্প্রসারিত হইবে। বাংলাদেশ, ভারত ও ভুটানের মধ্যে বৃদ্ধি পাইবে আঞ্চলিক ব্যবসায়-বাণিজ্য। ইহাতে বিকশিত হইবে ত্রিদেশীয় পর্যটনশিল্পও। এখানকার ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব ও সম্ভাবনার কথা বহুল আলোচিত। তাই এমন উদ্যোগকে আমরা সাধুবাদ জানাই।

এই কানেকটিভিটির মাধ্যমে আমরা অভ্যন্তরীণভাবে যেমন উপকৃত হইব, তেমনি প্রতিবেশী দুইটি দেশের মানুষও লাভবান হইবেন; কিন্তু এই ট্রেন সার্ভিস কি লাভজনক হইবে? লাভজনক না হউক, যদি সমান সমানও হয়, তাহাতে কাহারো আপত্তি থাকিবার কথা নহে। তবে লোকসান দিয়া খুব বেশি দিন কোনো কিছু চালানো যায় না। কেননা ইতিপূর্বেকার অভিজ্ঞতা কোনো কোনো ক্ষেত্রে সুখকর হয় নাই। বিভিন্ন রুটে রেললাইন যখন চালু হয়, তখন তাহা সর্বমহলে প্রশংসিত হয়; কিন্তু তাহার পর অভিযোগ আসিতে থাকে যে, পর্যাপ্ত যাত্রী পাওয়া যায় না বা দুর্নীতি, অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনায় তাহা অব্যাহতভাবে লোকসান গুনিতেছে। তাহা হইলে এই লোকসানের অর্থটা কোথা হইতে আসিবে? এই ভার কে বহন করিবেন?

আমাদের দেশে বিশ্বব্যাংকসহ বিভিন্ন দাতা সংস্থা অলাভজনক রেললাইন বন্ধ করিবার জন্য প্রস্তাব দেন। তাহার পরিপ্রেক্ষিতে বিভিন্ন রুটের রেললাইন বন্ধ হইয়া যায়। তাহার পর রাজনৈতিক বিবেচনায় ও জনগণের যাতায়াতের সুবিধার্থে আবার চালু করা হয়। পুনরায় চালু হইলেও অনেক ক্ষেত্রে তাহা লাভের মুখ দেখে নাই। বিভিন্ন অলাভজনক সরকারি শিল্প-কলকারখানার ক্ষেত্রেও এমনটি ঘটিয়াছে। দেখা যায়, সেই সকল প্রতিষ্ঠান যখন বন্ধ করা হয়, তখন ইহার জন্য প্রদান করা হয় ক্ষতিপূরণ; কিন্তু আবার চালুর ফলে তাহা লাভজনক না হওয়ায় দেশ দ্বিগুণ ক্ষতির শিকার হয়। সরকারি প্রতিষ্ঠান নানা অব্যবস্থাপনার কারণে ডুবিতে বসিলেও এই সমস্যার সমাধান করা হয় কদাচিত্। ইহাতে কাহারো কাহারো হয়তো লাভ হয়; কিন্তু সামগ্রিকভাবে দেশ ও জাতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যাহারা লোকসান দিয়া হইলেও এইরূপ প্রতিষ্ঠান বহাল রাখিবার পক্ষপাতী, তাহারা প্রায়শ জনগণেরই দোহাই দেন এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহের নানা সমালোচনা করিয়া থাকেন। কেননা লাভ করা ছাড়া বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের  অস্তিত্ব রক্ষা করা কঠিন; কিন্তু আমাদের প্রশ্ন হইল, সরকারি প্রতিষ্ঠানের লোকসানের অর্থের বিহিত হইবে কীভাবে? এমনটি যদি হয় যে, পাঁচটি কোম্পানির মধ্যে তিনটি লাভজনক, বাকি দুইটির ক্ষতি পোষাইয়া লইতে সক্ষম, তাহা হইলে তাহাতে সমস্যা নাই; কিন্তু যদি এমন হয় সকলটিতেই ক্ষতি আর ক্ষতি, তাহা হইলে ট্রেন সার্ভিস কেন, কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠানেরই এইভাবে বত্সরের পর বত্সর লোকসান দেওয়ার কোনো অর্থ হইতে পারে না।

এইদিকে জনগুরুত্বপূর্ণ কোনো খাতের লোকসানও বত্সরের পর বত্সর বহন করা যাইতে পারে যদি রাষ্ট্রের আয়ব্যয় সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়। দেখা যাইতেছে, রাজস্ব আদায়ে এনবিআর তাহার লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করিতে পারিতেছে না। ঘাটতির কারণে বার্ষিক উন্নয়নমূলক বাজেট বারংবার কাটছাঁট করিতে হয়। একাধিক বার কাটাকাটির কারণে মহান সংসদে সম্মানিত সংসদ সদস্যগণ কোন বাজেটের উপর আলোচনা করিবেন তাহারই হদিস খুঁজিয়া পান না। এমতাবস্থায় সরকারি প্রতিষ্ঠানের লোকসান যে শেষ পর্যন্ত জনগণের স্কন্ধেই চাপিয়া যায়, তাহা বুঝিতে আমাদের অসুবিধা হয় না; কিন্তু শিক্ষাদীক্ষা ও আর্থিক সচ্ছলতা না আসা পর্যন্ত অধিকাংশ নাগরিকের পক্ষে ইহা হয়তো উপলব্ধি করা সহজ নহে। তবে তাহারা যখন বুঝিবেন, তাহারা কলুর বলদের মতো রাষ্ট্রের লোকসান বহন করিয়া বেড়াইতেছেন ক্রমাগতভাবে, তখন তাহারা প্রতিবাদী না হইয়া পারিবেন না। 

আমরা আবারও বলি, এখন কানেকটিভিটির যুগ। কানেকটিভিটি রক্ষায় এবং জনগণের স্বার্থে প্রয়োজনে আমরা সকল কিছু করিতে রাজি; কিন্তু এমন কাজে জাতীয় অর্থ ব্যয় করা সংগত নহে, যাহার কারণে দিন শেষে জনগণকেই ক্ষতির বোঝা বহিয়া বেড়াইতে হয়।