দেশে নিয়মিত বিরতি দিয়ে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে। কখনো কখনো ঘাতকরা ধরা পড়ছে, কখনো আবার পড়ছে না। কোনো কোনো হত্যাকাণ্ড নিয়ে ব্যাপক আলাপ-আলোচনা হয়, গণমাধ্যমে নানা ধরনের খবর-মন্তব্য প্রকাশিত হয়। আবার কোনো কোনোটি তেমন আলোচনায় আসে না। সম্প্রতি বরগুনায় এক যুবককে তার স্ত্রীর সামনে কুপিয়ে হত্যা করার বিষয়টি টক অব দ্য কান্ট্রিতে পরিণত হলেও প্রায় একই সময় ঠাকুরগাঁয়ে একজন নার্সকে হত্যার ঘটনাটি তেমন সাড়া জাগাতে পারেনি। যে কোনো হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়, অপরাধী যে-ই হোক না কেন তাকে ছাড়া হবে না। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই অপরাধীরা ‘ছাড়’ পেয়ে যায় এবং ধারাবাহিকভাবে অপরাধ সংঘটিত হতেই থাকে। মানুষ একধরনের উদ্বেগ-উত্কণ্ঠার মধ্যে সময় কাটায়। নিজের ওপর কখন কোন বিপদ নেমে আসে, সেই দুশ্চিন্তায় থাকে। মানুষের জীবনের নিরাপত্তা বিধানের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা যেমন করা সম্ভব হয়নি, তেমনি অপরাধ সংঘটিত হলে অপরাধীকে দ্রুত আইনের আওতায় এনে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার অবস্থাও দেশে তৈরি হয়নি।
বরগুনার রিফাত শরীফ হত্যার ঘটনায় অন্যতম অভিযুক্ত সাব্বির আহম্মেদ ওরফে নয়ন বন্ড ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়েছে। আরেক অভিযুক্ত রিফাত ফারাজীও গ্রেফতার হয়েছে। তার পরিণতিও নয়ন বন্ডের মতোই হবে কি না, সে প্রশ্ন উঠছে। নয়ন বন্ডের মৃত্যুতে অনেকেই স্বস্তি প্রকাশ করছেন, খুনির উপযুক্ত শাস্তি হয়েছে বলে মনে করছেন। আবার কেউ কেউ এভাবে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকে অপরাধ দমনে সহায়ক না হয়ে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার প্রতি চ্যালেঞ্জ বলেও মনে করছেন। রিফাত শরীফকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে প্রকাশ্যে অনেকের সামনে। তার স্ত্রী খুনিদের বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন, কিন্তু সফল হননি। সংগঠিত খুনি চক্রকে যদি সম্মিলিতভাবে বাধা দেওয়া হতো, তাহলে হয়তো রিফাতকে অসহায়ভাবে জীবন দিতে হতো না। কিন্তু আমাদের সামাজিক মূল্যবোধের চরম অবক্ষয় ঘটেছে। আমরা একসঙ্গে থেকেও প্রকৃত অর্থে বিচ্ছিন্ন। কারো বিপদে কেউ এগিয়ে আসতে চাই না। একজনের পাশে দাঁড়িয়ে নিজের বিপদ ডেকে আনার পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। দেশে আইনের শাসনের ঘাটতি আছে বলে ব্যাপকভাবে মনে করা হয়। এখন বাধ্য হয়ে সবাই শক্তের ভক্ত হয়ে পড়ছেন। বরগুনার ঘটনা তার একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
রিফাত শরীফ হত্যার পর প্রধান দুই ঘাতক নয়ন বন্ড ও রিফাত ফারাজী সম্পর্কে যেসব তথ্য গণমাধ্যমে প্রকাশিত হচ্ছে, তা ভয়াবহ এবং পিলে চমকে দেওয়ার মতো। এই দুজনের দুষ্কর্মের কথা এলাকাবাসীর যেমন অজানা নয়, তেমনি থানা-পুলিশেরও জানা। তাদের দুজনের বিরুদ্ধেই একাধিক মামলা আছে। পুলিশ তাদের গ্রেফতার করলেও তারা কিছুদিন পর ছাড়া পেয়ে যায়। তাদের খুঁটির জোর কোথায়? কে বা কারা তাদের প্রশ্রয়দাতা? সাধারণভাবে এটা মনে করা হয় যে, ক্ষমতাসীনদের পক্ষপুটে না থাকলে দুর্বৃত্তি করা যায় না। খবর বের হয়েছে, রিফাত ফারাজী বরগুনা জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান দেলোয়ার হোসেনের আত্মীয়। তার সহযোগিতায়ই কি বরগুনায় বন্ড ০০৭ বাহিনী গড়ে উঠেছে? বিষয়টি কোনোভাবেই ধামাচাপা না দিয়ে তদন্ত হওয়া দরকার। এটা এখন বের হওয়া জরুরি যে, কাদের প্রশ্রয়ে বা মদদে দেশের বিভিন্ন স্থানে গড়ে উঠছে মাস্তান বাহিনী, যাদের স্বেচ্ছাচারিতার কারণে সাধারণ মানুষের জীবন অতিষ্ঠ হয়ে পড়ছে?
রিফাত শরীফের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ায় দেশব্যাপী প্রবল প্রতিক্রিয়া হয়। কেউ কেউ দুর্বৃত্তদের ধরে ক্রসফায়ারে দেওয়ার দাবিও করেন। এটা আসলে মানুষের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। বিচারহীনতার সংস্কৃতির প্রতি স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিবাদ। যদি অপরাধীর বিচার যথাযথ প্রক্রিয়ায় দ্রততম সময়ে হতো, তাহলে কেউ বিচারবহির্ভূত হত্যার দাবি তুলত বলে মনে হয় না। বিচারবহির্ভূত হত্যা অপরাধ দমনে সহায়ক হলে পৃথিবীতে আইন-আদালতের প্রয়োজন হতো না।
আমরা চাই অপরাধীর আইনানুগ শাস্তি হোক এবং একই সঙ্গে অপরাধেরও মূলোত্পাটন হোক। তবে নয়ন বন্ডকে গ্রেপ্তার করে জানা উচিত ছিল, কে বা কারা তাকে এমন বেপরোয়া করে তুলেছিল। পেছনের গডফাদারদের নাম আড়ালে রাখার জন্যই নয়ন বন্ডকে বন্দুকযুদ্ধে নিহত দেখানো হলো বলে কেউ যদি অভিযোগ করেন, তাহলে তা মিথ্যা প্রমাণ করা যাবে কি? অপরাধীকে আইনের আওতায় এনে দ্রুততম সময়ে বিচার করে উপযুক্ত শাস্তি দেওয়ার ব্যবস্থা যদি কার্যকর করতে না পারা যায়, তাহলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে না। পেছনের ক্ষমতাধরদের আড়ালে রাখলে এক নয়ন বন্ড মরলে আরেক বন্ড তৈরি করতে সময় লাগবে না। এতে সাময়িক উপশম পাওয়া যেতে পারে, তার বেশি কিছু নয়। নয়ন বন্ডরা যাতে তৈরি হতে না পারে, সেই পরিস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে।
পুলিশ বা অন্য কোনো বাহিনীকে আইনশৃঙ্খলার ব্যাপারে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। তাদের অস্বচ্ছতা নিয়েও তো নানা প্রশ্ন আছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই হয়তো চিহ্নিত ‘অপরাধী’রাই মারা পড়ছে। ফলে মানুষ এ ধরনের হত্যাকাণ্ডের প্রতি একধরনের নীরব সমর্থন দিয়ে আসছে। কিন্তু বিনা বিচারে কাউকে হত্যা করাটা সমর্থনযোগ্য নয় এ কারণে যে এতে করে নির্দোষ মানুষও এর শিকার হতে পারে। ব্যক্তিগত শত্রুতার বশে কেউ পুলিশ বা অন্য বাহিনীকে ব্যবহার করে খুনের ঘটনা ঘটাতে পারে। নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের ঘটনা এর জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত। বিনা বিচারে হত্যা এবং হত্যাকারীদের রেহাই দেওয়া—দুটোই অপরাধ।
আমাদের দেশের প্রচলিত আইন ও বিচারব্যবস্থায় ত্রুটি-দুর্বলতা রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই ন্যায়বিচার পাওয়া একেবারেই সাধারণ মানুষের জন্য দুরূহ হয়ে পড়ে। আইনের ফাঁকফোকর গলিয়ে অপরাধীরা পার পেয়ে যায়। আবার নিরপরাধ ব্যক্তিদেরও কখনো কখনো নিগৃহীত হতে হয়। তাছাড়া রাজনৈতিক প্রভাবও আমাদের দেশে অপরাধপ্রবণতা বৃদ্ধির একটি বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অপরাধীরা রাজনৈতিক দলের পরিচয়েই অপরাধ সংঘটিত করে। থানার পুলিশও রাজনৈতিক প্রভাববলয়ের বাইরে যেতে পারে না। পুলিশ প্রশাসন ক্ষমতাসীনদের নিয়ন্ত্রণমুক্ত না হলে তারা তাদের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা অনুযায়ী অপরাধীদের ধরতে পারে না। একজন প্রকৃত অপরাধীকে পুলিশ গ্রেপ্তার করলেও রাজনৈতিক চাপে তাকে ছেড়ে দেওয়ার ঘটনা অহরহ ঘটছে।
আমরা চাই মানুষের বেঁচে থাকার অধিকার নিশ্চিত করা হোক। আমরা চাই দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হোক। ক্ষমতাসীনদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে দেশের কোথাও যেন নয়ন বন্ডদের মতো দুর্বৃত্ত তৈরি হতে না পারে। অপরাধ দমনে আইনি ব্যবস্থায় যদি কোনো দুর্বলতা থাকে, তাহলে সেগুলো দূর করা হোক।
n লেখক : প্রবীণ সাংবাদিক