প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর :শিক্ষা ও গবেষণায় অগ্রগতি

অর্থনীতি ও সমরশক্তিতে আমূল বদলে যাওয়া গণচীনের গল্প মোটামুটি সবারই জানা। চীনের এই উত্থান বিশ্বজুড়ে যেমন আলোড়ন সৃষ্টি করে, তেমনি পিছিয়ে থাকা উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর জন্য রোল মডেল। ১৯৭৫ সালে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার বহু আগেই বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের যোগাযোগ অনেক গভীরে গ্রোথিত। ঐতিহাসিকদের মতে, এই বন্ধন প্রায় দুই হাজার বছরের অধিক। প্রাচীন ‘সিল্ক রুট’ বাংলাদেশকে চীনের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করে; যাসিয়ান (পূর্বে ছাংআন) থেকে সিনজিয়াং হয়ে আফগানিস্তান ও ভারতের পর বাংলাদেশের সঙ্গে সংযুক্ত করেছিল। এর আগে আরো একটি ‘সিল্ক রুট’-এর সন্ধান পাওয়া যায়; যা দক্ষিণ চীনের কুনমিং থেকে মিয়ানমারের (বার্মা) মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্ত হয়। ব্যবসা-বাণিজ্যসহ সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান ঘটে এই সংযুক্তির মধ্য দিয়ে। বাংলাদেশ ও চীনের জনগণকে যুদ্ধ ও দারিদ্র্যের কষ্ট সহ্য করতে হয়েছে। এমনকি, দুই দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের জন্য লড়াইও করতে হয়েছে। চীনা নেতৃত্বের দূরদর্শিতা, সময়োপযোগী পরিকল্পনা গণচীনকে আজ বিশ্বদরবারে প্রতিষ্ঠিত শক্তিতে রূপ দিয়েছে। অন্যদিকে, জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রজ্ঞা ও সাহসী নেতৃত্বে এবং উদীয়মান অর্থনীতির দেশ হিসেবে বাংলাদেশও বিশ্বমঞ্চে সমাদৃত। স্বাধীনতার পর থেকে দেশের মানুষ কঠোর পরিশ্রম করে দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করেছে। দেশের প্রবৃদ্ধিও সন্তোষজনকভাবে এগিয়ে চলেছে। চীন, বাংলাদেশের বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য বন্ধু এবং অংশীদার হিসেবে ব্যবসা-বাণিজ্য, কৃষি, শিল্প, প্রতিরক্ষা, শিক্ষা, সংস্কৃতিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতার ধারা অব্যাহত রেখেছে। আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলা যায়, পূর্ব দিকে তাকালে একটি শক্তিশালী হাত বাংলাদেশের দিকে প্রসারিত রয়েছে। অন্যদিকে, দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনৈতিক কৌশলগত কারণেও বাংলাদেশের  প্রয়োজনীয়তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চীনের কাছে।

বাংলাদেশের তরুণদের কাছে পশ্চিমা দেশগুলোয় পড়াশোনা রীতিমতো স্বপ্নের মতো। চীনা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক ও গবেষক হিসেবে এ কথা দাবি করতে পারি যে তরুণদের ঐ ধারণায় এরই মধ্যে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটেছে। বর্তমানে চীনের শিক্ষাক্ষেত্রে আমূল পরিবর্তন এসেছে, যা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের শিক্ষক, গবেষক ও শিক্ষার্থীদের মনোযোগ আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে। গণচীনের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বিশ্বের প্রখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকেও টক্কর দিচ্ছে এখন; গবেষণায় বিশ্ব র্যাঙ্কিংয়ে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক প্রতিষ্ঠান এগিয়ে থাকছে দেশটির। এতেও চীনারা সন্তুষ্ট নয়। শিক্ষার ক্ষেত্রে বিপ্লব ঘটিয়ে শীর্ষস্থান দখলে হাজার হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দিচ্ছে চীন সরকার। শিক্ষা, গবেষণা, চিকিত্সা, বিজ্ঞানসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিদেশি মেধাবীদের আকৃষ্ট করতে অব্যাহত রেখেছে সরকারিসহ বিভিন্ন ক্যাটাগরির বৃক্তি। অসংখ্য বাংলাদেশি শিক্ষক-শিক্ষার্থী, গবেষক, চিকিত্সক চীনে অধ্যয়নের পাশাপাশি গবেষণার কাজে নিয়োজিত  রয়েছেন।

সবকিছুর পেছনে মূল চালিকাশক্তি অর্থ। অর্থায়ন প্রক্রিয়া বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে উত্কৃষ্ট মানের গবেষণায় আগ্রহী করে তোলে। শিক্ষা ও গবেষণার ক্ষেত্রে চীনের এই উত্থান হঠাত্ করে নয়। লন্ডনভিত্তিক সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্টের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে বিশ্বের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নীত করতে ১৯৯৫ সাল থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ অব্যাহত রেখেছে চীনা সরকার। একজন শিক্ষক হিসেবে দাবি করতে পারি, চীনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাডেমিক গবেষণায় নিয়োজিত ব্যক্তিদের যথেষ্ট প্রণোদনার ব্যবস্থা রয়েছে। মোদ্দাকথা হলো, শিক্ষার ক্ষেত্রে বিপ্লব ঘটাতে এবং বিশ্বের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়ের কাতারে চীনা বিশ্ববিদ্যালগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করতে যা প্রয়োজন, চীন সরকার তাই-ই  করছে। যে কোনো দেশ ও জাতির উন্নয়ন, অগ্রগতি যা-ই বলি না কেন, শিক্ষাই একমাত্র মাধ্যম। একটি প্রজন্ম বিশ্বদরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর সাহস পায় একমাত্র প্রায়োগিক ও উপযোগী শিক্ষার মাধ্যমে। সম্প্রতি প্রকাশিত বিশ্ববিদ্যালয়ের র্যাংকিংয়ে বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ই তালিকার সন্তোষজনক অবস্থানে নেই। এসব বিষয় আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার বাস্তব চিত্রগুলো চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও একজন বাংলাদেশি হিসেবে আমাকে লজ্জায় মাথা নোয়াতে হয়। সুতরাং, ভবিষ্যত্ প্রজন্ম, দেশের সমৃদ্ধি-অগ্রগতি এবং সর্বোপরি সত্যিকার  ‘সোনার বাংলা’ রূপায়ণে কালবিলম্ব না করে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষাব্যবস্থা ঢেলে সাজানো দরকার বলে মনে করি। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে গবেষণা ও প্রায়োগিক উপযোগী করতে হবে, যাতে অভ্যন্তরীণ শ্রমবাজারের ঘাটতি পূরণ করে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সুযোগ বৃদ্ধি করে। বর্তমান বাস্তবতায় শিক্ষা, গবেষণা অব্যাহতভাবে পিছিয়ে থাকলে দেশীয় খাতগুলো বিদেশিদের দখলে চলে যাবে বলে অনুমেয়। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে সার্বক্ষণিক সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রবণতা অনুসরণ করতে হবে; আর এভাবেই হালনাগাদ করতে হবে পাঠক্রম ও শিক্ষকদের দক্ষতা। এছাড়া, শিক্ষা খাতের মৌলিক পরিবর্তনে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বিরাট ভূমিকা রাখতে পারে। সে ক্ষেত্রে চীন হতে পারে আমাদের অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত।

কর্মমুখী শিক্ষায় চীন অদ্বিতীয়। ইতিমধ্যে শিক্ষাক্ষেত্রে চীনের বৈল্পবিক পরিবর্তনগুলো সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা হয়েছে। চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ প্রকল্প অনেক অর্থায়ন করছে শিক্ষার্থীদের। ইউজিসি, বঙ্গবন্ধু শিক্ষা ও গবেষণা ফেলোশিপ এই বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ প্রকল্প অথবা চায়না সায়েন্স ফাউন্ডেশনের (এনএসআফসি) সঙ্গে যৌথ ও দ্বিপাক্ষিক চুক্তির আওতায় দীর্ঘমেয়াদি কৌশল প্রণয়ন সময়োপযোগী বলে মনে করি। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে আমরা যদি উচ্চশিক্ষা বা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান উন্নয়নে চীনের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ শুরু করি, তাহলে সেদিন হয়তো বেশি দূরে নেই, যেদিন আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে শীর্ষে অবস্থান করে নিতে পারবে। এছাড়া, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত বাংলাদেশি শিক্ষক, গবেষকদের দেশীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে সংযুক্তির পাশাপাশি যথাযথ সম্মান দিয়ে দেশে ফিরে আসার প্রস্তাব দেওয়া যেতে পারে; যা বাংলাদেশের শিক্ষাক্ষেত্রে একটি অবিস্মরণীয় উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হবে বলে বিশ্বাস করি।

বঙ্গবন্ধুর কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জুলাইয়ের ১ তারিখে চীন সফরে গিয়েছেন। ২০১৬ সালে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বাংলাদেশ সফরের অগ্রগতি পর্যালোচনায় এবং দেশটির ডায়ানে অনুষ্ঠিতব্য ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের গ্রীষ্মকালীন বৈঠকে অংশ নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তার এই সফরে শিক্ষা ও গবেষণা বিনিময়সহ বাংলাদেশের শিক্ষা খাতের অগ্রগতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করি।

n লেখক :শিক্ষক