সেকালের ইফতার

সিলেটের ঐতিহ্য ‘পুড়ির বাড়ি ইফতারি’

রমজান মাসে সিলেট অঞ্চলে ‘পুড়ির (মেয়ে) বাড়ি ইফতারি’ পাঠানো অতি পুরোনো সামাজিক একটি রেওয়াজ। এটা বহু বছর ধরে চলে আসছে। ধনী-গরিব প্রায় সব মুসলিম পরিবারে রমজান এলেই মা-বাবাদের তাগিদ শুরু হয় ‘পুড়ির বাড়ি ইফতারি’ পাঠানোর। চলে নানা প্রস্তুতি। সামর্থ্য অনুযায়ী ইফতার প্রস্তুত করে পাঠানো হয় ‘পুড়ির’ বাড়ি।

বিশিষ্ট প্রবন্ধিক, গবেষক ও প্রবীণ সাংবাদিক আবদুল হামিদ মানিক বলেন, ‘রমজানে মেয়ের বাড়িতে ইফতারি পাঠানোর রীতি বেশ পুরোনো। দুই পক্ষই এই ইফতার উপভোগ করত। নানা আয়োজনে এই ইফতার পাঠনো ছিল মর্যাদার অনুষঙ্গ এবং এই অঞ্চলের ঐতিহ্যও বটে। বর্তমানে দ্রব্যমূল্যের চাপে এই প্রচলন কমে যাচ্ছে। তবে একেবারে বিলুপ্তও হয়নি।’

সাধারণত মোরগ পোলাও, কোরমা, আখনি, মিষ্টি-নিমকি, জিলাপি, খাজা, বাকরখানি, চানাভুনা, পিঁয়াজু, ফিরনি, হরেক পদের পিঠা, মৌসুমি ফলে ভরা টুকরিসহ নানা ইফতারি নিয়ে শালা-শালিরা দুলাভাইয়ের (পুড়ির বাড়ি) বাড়িতে হাজির হত। সেই বাড়িতে তখন পাড়া-প্রতিবেশীকেও দাওয়াত করা হতো। এখানেই শেষ নয়, দুলাভাইয়ের জন্য পাঞ্জাবি আর বোনের জন্য শাড়ি, এমনকি বিয়াই-বিয়াইনকেও পাঞ্জাবি ও শাড়ি দেওয়া হতো। আবার শালা-শালিরাও ফেরার সময় দুলাভাইয়ের কাছ থেকে বড় অঙ্কের গিফট নিয়ে ফিরত। অবস্থাপন্ন পরিবারের জন্য এটি আনন্দের ব্যাপার হলেও স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য এটি কষ্টদায়ক ছিল। অনেকেই লোকলজ্জার ভয়ে এই রীতি পালন করেছেন বা আজো করা হচ্ছে। কিন্তু আজকাল বাস্তবতার নিরিখে ‘পুড়ির বাড়ি ইফতারি’ পাঠানো নিয়ে মতভেদ শুরু হয়েছে। অনেকেই মনে করেন, এই ব্যয়বহুল সামাজিক প্রথা পরিহার হওয়া প্রয়োজন। আবার অনেকেই যুক্তি দিয়ে বলেন, এই রীতি সামর্থ্য অনুযায়ী আত্মীয়তার বন্ধনকে আরো সুদৃঢ় করে।

এদিকে রমজানের প্রথম দিনে সুনামগঞ্জের প্রবাসী অধ্যুষিত জগন্নাথপুর উপজেলায় বেশ কয়েকটি রেস্টুরেন্টে প্রতি বছরের মতো এবারও দেড় হাজার থেকে ৫ হাজার টাকার মধ্যে ইফতারির থাল সাজানো হয়, যা ‘পুড়ির বাড়ির ইফতারি’ হিসেবে বিক্রি হয়। একজন রেস্টুরেন্টের মালিক জানালেন, প্রথম দিন ১০০ থাল বিক্রি হয়েছে।

কেমন ছিল সেকালের ইফতার: আগে সিলেট অঞ্চলে বাহারি ইফতারির প্রচলন না থাকলেও সেই ইফতারি ছিল স্বাস্থ্যসম্মত। সেকালে ইফতার কেমন ছিল তা নিয়ে সিলেটের প্রবীণ কয়েক জন বিশিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে আলাপকালে তারা ইত্তেফাককে বলেন, তখন মানুষ স্বাস্থ্যসচেতন ছিল। তারা সারা দিন রোজার পর ইফতারে বেছে নিতেন সাধারণত পেটের পীড়ায় ভুগতে হয় না এমন খাদ্য। তবে একেবারে যে মুখরোচক খাদ্যের প্রচলন ছিল না তা নয়। তা ছিল খুব কম। 

৮০ বছর ছুঁই ছুঁই বিশিষ্ট আইনজীবী ও কলামিস্ট হোসেন তওফিক চৌধূরী বলেন, গ্রামাঞ্চল ও শহুরে ইফতারের মধ্যে পার্থক্য ছিল। তা ছিল অর্থনৈতিক ও রুচিভেদে। তবে সব ক্ষেত্রেই নরম খিচুড়ি, খেজুর, চানা, নানা ধরনের বড়ার  প্রচলন ছিল। মাঝেমধ্যে চইপিঠা, ক্ষির, চালের রুটি, ফিরনি  ইফতারের ফর্দে ঠাঁই পেত। লেবু ও তোকমার শরবত, মৌসুমি ফল থাকেত মানুষের সামর্থ্যভেদে। অবস্থাপন্ন ঘরে বিভিন্ন পদের সঙ্গে পরোটা, সেমাই, ঘিয়ে মাখা খিচুড়ি থাকত। তিনি বলেন, গ্রামাঞ্চলে সাধারণত ঢেলা খিচুড়ি বা গরম ভাতের প্রচলন ছিল। অনেকেই ইফতার করতেন সামান্য খেজুর বা চানা দিয়ে। নামাজ শেষে ভাত পছন্দ করতেন নানা প্রকার শাক, তিল-তিসির গুঁড়া দিয়ে। চালের নানা ধরনের পিঠার আইটেম থাকত মাঝেমধ্যে। শুকনো নালিয়াপাতা ও শুকনো মরিচ ভেজে এর মিশ্রণ সুগন্ধি ভাতের সঙ্গে অত্যন্ত মজাদার আইটেম। 

সিলেট নগরীর সুবিদবাজার এলাকার অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা নাসিরুল আমিন বলেন, ৫০-এর দশকে সিলেটের বিভিন্ন প্রান্তে রমজানে ভাতের জাউ ছিল অতি প্রিয়। এর সঙ্গে মেথি, কালোজিরার ভর্তা। কখনো এর সঙ্গে সামান্য খাটি ঘিয়ের মিশ্রণ। চানা, বড়া যা-ই থাকুক, জাউভাত চা-ই—এমনি ছিল রমজানে ইফতারের চাহিদা। মুরব্বিরা মনে করেন, সারা দিন রোজার পর ভাতের জাউ পেটের জন্য খুব উপকারী। আজকাল  জাউ তেমনভাবে তৈরি করা হয় না।