কক্সবাজারে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের দ্রুত প্রত্যাবাসনে মিয়ানমার সরকারকে সম্মত করতে চীন চেষ্টা করবে বলে বাংলাদেশকে আশ্বস্ত করেছে। গতকাল বৃহস্পতিবার সফররত বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কেকিয়াংয়ের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে বেইজিং এ আশ্বাস দিয়েছে।
বৈঠকে চীনের প্রধানমন্ত্রী এই দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা দ্রুত সমাধানে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে একমত পোষণ করে বলেন, এতে কোনো সন্দেহ নেই যে এটা বাংলাদেশের জন্য একটি বড়ো সমস্যা। এ সমস্যা দ্বিপক্ষীয় ভিত্তিতে সমাধানের ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, চীন এক্ষেত্রে সহায়তা করবে। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে পররাষ্ট্রসচিব শহীদুল হক চীনের প্রধানমন্ত্রীকে উদ্ধৃত করে সাংবাদিকদের বলেন, বাংলাদেশ ও মিয়ানমার উভয়ে চীনের বন্ধু। চীন এর আগে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে দুই দেশকে সহায়তা করেছে এবং আমরা আমাদের চেষ্টা অব্যাহত রাখব। চীনের প্রধানমন্ত্রী বলেন, দুই দেশকে আলোচনার মাধ্যমে এই সমস্যার সমাধান বের করতে হবে। চীন তার পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে দুই বার মিয়ানমারে পাঠিয়েছে। আলোচনার মাধ্যমে এ সমস্যার সমাধানে প্রয়োজনে আমরা আবারও পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে মিয়ানমারে পাঠাব।
শহীদুল হক বলেন, বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উন্নয়নের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনে এই অঞ্চলে শান্তি ও স্থিতিশীলতার ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের কারণে এই শান্তি ও স্থিতিশীলতা বিঘ্নিত হচ্ছে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বলেন, যতই সময় যাবে এই সমস্যা ততই বড়ো আকার ধারণ করবে এবং এর একমাত্র সমাধান হচ্ছে রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে প্রত্যাবর্তন।
অর্থনীতি ও বাণিজ্য প্রসঙ্গে চীনের প্রধানমন্ত্রী বলেন, গত বছর বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে বাণিজ্যের পরিমাণ ১৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। জবাবে শেখ হাসিনা বাণিজ্য বৃদ্ধি ও বৈষম্য চীনের পক্ষে উল্লেখ করে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য-বৈষম্য দূর করার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়ে বলেন, চীনের উচিত বাংলাদেশে আরো বেশি বিনিয়োগ করা এবং ফিরতি ক্রয়ের গ্যারান্টিসহ আরো কলকারখানা গড়ে তোলা।
এ প্রসঙ্গে লি কেকিয়াং বলেন, তাঁরা ভারসাম্যহীন বাণিজ্য সম্পর্ক চান না এবং বাণিজ্য-বৈষম্য কমিয়ে আনতে কাজ করবেন বলে আশ্বাস দেন। বর্তমানে ৯৭ শতাংশ বাংলাদেশি পণ্য চীনের বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পাচ্ছে—উল্লেখ করে চীনের প্রধানমন্ত্রী বলেন, তারা বাকি ৩ শতাংশ পণ্যের শুল্কও ছাড় দেওয়ার চেষ্টা করবে।
ভিসা ইস্যু প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশ ‘অন অ্যারাইভাল ভিসা’ ব্যবস্থার আওতায় চীনের নাগরিকদেরকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ভিসা প্রদান করে থাকে। কিন্তু চীন ভ্রমণকারী বাংলাদেশি নাগরিকদের একই সুবিধা দেওয়া হয় না। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, চীন বাংলাদেশি পাসপোর্টধারী বিশেষ ছাত্র ও ব্যবসায়ীদের জন্য ভিসা প্রক্রিয়া সহজ করবে।
অটিজম অ্যান্ড নিউরো-ডেভেলপমেন্ট ডিজঅর্ডারস-এর জাতীয় উপদেষ্টা কমিটির চেয়ারপারসন সায়মা ওয়াজেদ হোসেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন, প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো. শাহরিয়ার আলম ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়বিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি মো. ফারুক খান দুই প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের সময় বাংলাদেশ পক্ষে উপস্থিত ছিলেন।
ঢাকা ও বেইজিংয়ের মধ্যে ৯টি চুক্তি স্বাক্ষর
বাংলাদেশ ও চীন বিভিন্ন ক্ষেত্রে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার অংশ হিসেবে ৯টি চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এর মধ্যে রয়েছে—রোহিঙ্গাদের খাদ্যসহায়তার জন্য এলওসি (লেটার অব এক্সচেঞ্জ) এবং অর্থনৈতিক ও কারিগরি সহযোগিতা, বিনিয়োগ, বিদ্যুত্, সংস্কৃতি এবং পর্যটনসংক্রান্ত চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক।
গতকাল সকালে বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব পিপল-এ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কেকিয়াংয়ের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক শেষে এই চুক্তিগুলো স্বাক্ষরিত হয়।
বৈঠক শেষে দুই নেতার উপস্থিতিতে উভয় দেশের মন্ত্রী এবং সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এতে স্বাক্ষর করেন। পররাষ্ট্রসচিব শহীদুল হক এ কথা জানান।
স্বাক্ষরিত অন্য চুক্তিগুলো হচ্ছে—সাংস্কৃতিক বিনিময় ও পর্যটন কর্মসূচি নিয়ে সমঝোতা স্মারক। ইয়ালু ঝাংবো ও ব্রহ্মপুত্র নদের তথ্য বিনিময়সংক্রান্ত সমঝোতা স্মারক ও তা বাস্তবায়নের পরিকল্পনা। ডিপিডিসির আওতাধীন এলাকায় বিদ্যুত্ ব্যবস্থা সম্প্রসারণ ও শক্তিশালীকরণ নিয়ে ফ্রেমওয়ার্ক এগ্রিমেন্ট। বাংলাদেশ ও চীন সরকারের মধ্যে অর্থনীতি ও কারিগরি সহযোগিতা-বিষয়ক চুক্তি। ইনভেস্টমেন্ট কোঅপারেশন ওয়ার্কিং গ্রুপ প্রতিষ্ঠা নিয়ে সমঝোতা স্মারক। পিজিসিবি প্রকল্পের আওতায় বিদ্যুত্ গ্রিড নেটওয়ার্ক জোরদার প্রকল্পের জন্য ফ্রেমওয়ার্ক এগ্রিমেন্ট। ডিপিডিসির আওতাধীন এলাকায় বিদ্যুত্ ব্যবস্থা সম্প্রসারণ ও শক্তিশালীকরণ নিয়ে গভর্নমেন্ট কনসেশনাল লোন এগ্রিমেন্ট। ডিপিডিসির আওতাধীন এলাকায় বিদ্যুত্ ব্যবস্থা সম্প্রসারণ ও শক্তিশালীকরণ নিয়ে প্রিফারেনশিয়াল বায়ার্স ক্রেডিট লোন এগ্রিমেন্ট।