‘শিল্পীরাতো একটু অভিমানী হয়। অনেক কিছু নিয়েই হয়তো তার মধ্যে অভিমান ছিল, হয়তো আমরা ধরতে পারিনি,’ প্রয়াত রবীন্দ্র সংগীতশিল্পী সাদি মহম্মদকে নিয়ে কথাগুলো বলছিলেন নৃত্যশিল্পী ও তার পারিবারিক বন্ধু শামীম আরা নিপা। বেশ কিছুদিন ধরে সাদি মহম্মদ মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিলেন। বিশেষ করে গত বছরে তার মা এবং বোনের মৃত্যুর পর তার মধ্যে আত্মহত্যার বিষয়টি প্রবল হয়ে ওঠে। কাজের স্বীকৃতি পাননি বলেও অভিমান ছিল সাদি মহম্মদের।
গত বুধবার (১৩ মার্চ) সন্ধ্যায় নিজ বাড়িতে ঝুলন্ত অবস্থায় শিল্পী সাদি মহম্মদের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। বরেণ্য এই শিল্পীর মৃত্যুর কারণ হিসেবে বিষণ্নতায় ভোগার বিষয়টিই বারবার সামনে আসছে।
ঝলমলে দুনিয়ার মানুষ যারা, তারা কেন আত্মহত্যা করেন? দর্শক ও সাধারণ মানুষের মনে প্রায়ই এ প্রশ্ন আসে। সম্প্রতি সাদি মুহম্মদের আত্মহত্যার ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দেয় বিগত দিনের প্রয়াত শিল্পীদের কথা। কিছুদিন আগে টিভি অভিনেত্রী হুমায়রা হিমুর আত্মহত্যায় শোবিজ তারকাদের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া হয়েছে। এছাড়াও ডলি আনোয়ার, নাট্য অভিনেত্রী ডালিয়া রহমান, মিতা নূর, সিনেমার সুপার হিরো সালমান শাহ, জনপ্রিয় ‘ধারাবাহিক এইসব দিনরাত্রি’র টুনি চরিত্রের অভিনেত্রী, জনপ্রিয় মডেল তিন্নি যারা জনপ্রিয়তার শীর্ষে থেকেও কোথাও যেন তাদের ব্যক্তি জীবনে নানান সমস্যায় জড়িত ছিলেন। দর্শকরা পর্দায় ঐসব শিল্পীর অভিনয় দেখে মুগ্ধ হতেন ঠিকই কিন্তু যিনি দর্শকদের আনন্দ দিচ্ছেন ঠিক তার উল্টো চিত্র মিলতো তাদের ব্যক্তি বা পারিবারিক জীবনে।
তারকা হওয়া যত না কঠিন ঠিক তার উল্টো চিত্র ইমেজ ধরে রাখা। সিনেমা বা ছোট পর্দা যাই বলি না কেন একজন অভিনেতা বা অভিনেত্রী যখন তাদের সাবলীল অভিনয় দিয়ে শীর্ষে পৌঁছে যান সেই সময়টা শিল্পীদের জীবনে ভয়ঙ্কর সময়। জনপ্রিয়তা বা অর্থ যখন স্রোতের মতো আসতে থাকে সেই সময় অনেকেই খেই হারিয়ে ফেলেন।
নদীতে যেমন জোয়ার-ভাটা রয়েছে তেমনি শিল্পীদের জীবনেও উত্থান-পতন রয়েছে। শীর্ষে থাকা কোনো শিল্পী যখন হঠাত্ জনপ্রিয়তার শূণ্য কোঠায় পৌঁছায় সেই সময় অনেকেই দিশাহারা হয়ে পড়েন। তারকাদের জীবন সাধারণ মানুষের জীবন থেকে বেশ আলাদা হয়ে থাকে। রঙিন এই দুনিয়ায় হাঁটতে পারার আনন্দের সঙ্গে মিশে রয়েছে চরম হতাশাও। সেই সঙ্গে তাদের মানসিক চাপতো রয়েছেই।
মনোবিদরা বলছেন, শিল্পীরা পেশাগত কারণেই অনেকটা বেশি আবেগী হয়ে থাকেন। যার কারণে কোনো সমস্যায় পড়লে তারকারা তা থেকে বেরিয়ে আসার মানসিক শক্তি হারিয়ে ফেলেন। হতাশা চরমভাবে তাকে ঘিরে ধরলেই বেছে নেন আত্মহত্যার পথ। তবে তার মানে এই নয়, আত্মহত্যার সঙ্গে নির্দিষ্ট পেশার কোনও সম্পর্ক আছে। সব পেশারই কিছু নিজস্ব চাপ থাকে। তাছাড়া প্রতিটি আত্মহত্যার আখ্যান, তার গড়ে ওঠার কাহিনি, তার কার্যকারণ ভিন্ন এবং সেটি সেই ব্যক্তির নিজস্ব যাপন ইতিহাসের মধ্যে নিহিত থাকে। এ সমস্যা থেকে বেরিয়ে আসার পথ সার্বক্ষণিক নিজেকে সচল থাকার ব্যবস্থা করা। এছাড়া ব্যক্তিজীবনে মন খুলে সব কথা বলা যায় এমন মানুষ বা বন্ধু, শুভাকাঙ্ক্ষি খুঁজে পেতে হবে। যাদের আবেগের সুরক্ষা বলয়ে এমন সিদ্ধান্ত নিতে বিরত থাকবে হতাশাগ্রস্তরা।
সাধারণ মানুষগুলো হয়তো জীবন সম্পর্কে ধারণা না পেয়ে বা জীবনযুদ্ধে টিকতে না পেরে আত্মহত্যার মতো ভয়ঙ্কর পথ বেছে নেয়। কিন্তু মিডিয়ার আলোঝলমলে জীবনে যাদের পা পড়েছে; যারা অনেকের অনুকরণীয় বা অনুসরণীয়; তাদের স্বেচ্ছামৃত্যু সমাজে খুব বড় প্রভাব ফেলে। এটি নিশ্চয়ই জীবদ্দশায় সবারই বোঝা উচিত।